রায়হানুল ইসলাম আকন্দ, শ্রীপুর (গাজীপুর)
প্রকাশ : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১৩:১৯ পিএম
গাজীপুর সাফারি পার্ক। ছবি : সংগৃহীত
গাছ কেটে পাচার, অবহেলায় প্রাণীর অস্বাভাবিক মৃত্যু, রাজস্ব ফাঁকিসহ নানা অভিযোগ উঠেছে গাজীপুর সাফারি পার্কের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে। এ ব্যাপারে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি দর্শনার্থীদের।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সম্প্রতি সাফারি পার্ক থেকে একটি নীল গাই সীমানা প্রাচীর টপকে পালিয়ে যায়। অভিযোগ রয়েছে, রাতের অন্ধকারে গাছ কাটার সময় গাছ পড়ার বিকট শব্দে নীল গাইটি ভয়ে সীমানা প্রাচীর টপকে বাইরে চলে যায়। প্রাণীটিকে শ্রীপুরের বিভিন্ন এলাকায় ঘোরাফেরা করতে দেখা গেলেও পার্ক কর্তৃপক্ষ সেটি আটক করতে ব্যর্থ হয়েছে।
এদিকে, গত ৫ আগস্টের পর পার্কটির বিভিন্ন প্রকল্প ইজারা না দেওয়ায় এর সৌন্দর্যে ঘাটতি দেখা দিয়েছে বলে অভিযোগ দর্শনার্থীদের।
পার্ক সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ সালে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার মাউনা ইউনিয়নে তিন হাজার ৬৯০ একর জায়গা নিয়ে গড়ে তোলা হয় গাজীপুর সাফারি পার্ক। ২০২১ সালের ২৭ ডিসেম্বর পার্কে একটি সিংহ ও একটি ওয়াইল্ডবিস্ট মারা যায়। ২০২২ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে ১১টি জেব্রা, একটি বাঘ ও একটি সিংহের মৃত্যু হয়। ২০২৩ সালের ২০ অক্টোবর পার্কে একটি জিরাফ মারা যায়। এতে পার্কে পুরুষ জিরাফের অভাবে প্রজনন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। ২০২১ সালে তিনটি ক্যাঙ্গারু মারা যাওয়ার পর থেকে ক্যাঙ্গারুশূন্য হয়ে পড়ে পার্কটি। অভিযোগ রয়েছে, অবহেলার কারণেই এসব মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
সম্প্রতি সরেজমিন পার্কে গিয়ে জানা যায়, ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তার নিজস্ব লোক দিয়ে মূল ফটকের বাইরে ইজারাবিহীন দোকান বসিয়ে টাকা উত্তোলন করছেন। বিকাল ৪টার দিকে দেখা যায় কোর সাফারি পার্কে দায়িত্বরত ফরেস্টার হারুন, আশরাফুল ইসলাম এবং সুমন বড়ুয়া দর্শনার্থীদের কাছ থেকে ১৫০ টাকা নিয়ে টিকিট না দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করাচ্ছেন। পার্কের পূর্ব পাশেও ইজারাবিহীন দুটি দোকান বসানো হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পার্কের কয়েক কর্মচারী ও স্থানীয়রা জানায়, পার্কের কচ্ছপ বেষ্টনীর দক্ষিণ পাশে এবং ঝুলন্ত সেতুর পশ্চিম পাশ থেকে একাধিক আকাশমনি গাছসহ বিভিন্ন প্রকার গাছ রাতের অন্ধকারে কেটে অন্যত্র পাচার করা হয়েছে। তারা জানান, পার্কে প্রবেশের ডান পাশে নিয়মনীতি না মেনে একাধিক দোকান বসিয়েছেন পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম।
ম্যাকাউ পাখিশালার দায়িত্বে থাকা রোকন উদ্দিন দর্শনার্থীদের শরীরে, কাঁধে এবং হাতে ম্যাকাউ পাখি বসিয়ে সেলফি তুললে ওইসব দর্শনার্থীর কাছ থেকে জনপ্রতি ৩০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত নিয়ে থাকেন। অথচ দর্শনার্থীদের শরীরে বা কাঁধে তুলে দেওয়ার কোনো নিয়ম নেই।
বিকাল ৪টার পর থকে কোর সাফারি পার্কে প্রবেশের ক্ষেত্রেও রয়েছে অনিয়ম। দর্শনার্থী সেখানে প্রবেশের সময় টিকিটের মূল্য রেখে টিকিট না দিয়েই কোর সাফারি পার্কে প্রবেশের অনুমতি দেয়। প্রতি টিকিটের মূল্য ১৫০ টাকা। বিকাল ৫টার পর কোর সাফারি পার্কে দর্শনার্থী প্রবেশের অনুমতি না থাকলেও রফিকুলের নির্দেশে অনিয়ম করে বিশেষ সুবিধার বিনিময়ে দর্শনার্থী প্রবেশ করানো হয়।
পার্কের বিভিন্ন স্থান সংস্কার না করায় হারাতে বসেছে দর্শকদের আকর্ষণ ও নিজস্ব জৌলুস। রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পার্কের এসব অনিয়ম, দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য দাবি জানিয়েছেন পার্কে বেড়াতে আসা পর্যটক, দর্শনার্থী ও স্থানীয়রা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ১৫ জানুয়ারি বেলা সাড়ে ১১টার দিকে পার্কের ভেতর থেকে পিকআপ ভ্যানে করে গাছ কেটে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে স্থানীয় নতুন বাজার এলাকার একটি স-মিলে বিক্রি করার সময় জনতা হাতেনাতে আটক হন।।
স্থানীয়রা জানান, সন্ধ্যার পর পার্ক থেকে পিকআপ ভর্তি গাছ পাচার হয়। কর্মচারীরা অভিযোগ করেন, ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম ও তার কিছু সহযোগী গাছ পাচারে ইন্ধন দিচ্ছেন। গত প্রায় এক মাস আগে পার্কের ভেতর থেকে একটি নীল গাই সীমানা প্রাচীর টপকে বাইরে চলে যায়। ওই নীল গাইটি শ্রীপুরের আশপাশের বনে দেখা গেলেও পার্ক কর্তৃপক্ষ নীল গাইটি উদ্ধারে কোনো তৎপরতা দেখায়নি। এ ছাড়া নিজের আত্মীয় আলামিনকে চুক্তিভিত্তিক পার্কের গাড়িচালক পদে নিয়োগ দেন এসিএফ রফিকুল ইসলাম।
গাজীপুর সাফারি পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) রফিকুল ইসলাম কোর সাফারি পার্কে টিকিট ছাড়া প্রবেশের কথা স্বীকার করলেও ভেতর থেকে গাছ কেটে বিক্রি করার কথা অস্বীকার করেন। পার্কের গাছগুলো দরপত্রের মাধ্যমে বিক্রি হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। পার্কে তার কোনো আত্মীয় নেই। এলাকার কিছু গরিব ছেলেকে কাজ দেওয়া হয়েছে। অন্য অভিযোগগুলো তিনি অস্বীকার করেন।
এ ব্যাপারে প্রধান বন কর্মকর্তা (সিসিএফ) আমির হোসেন চৌধুরী বলেন, অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো অভিযোগ পাইনি। তার পরও আপনাদের (সাংবাদিক) মাধ্যমে যেহেতু বিষয়গুলো জানতে পেরেছি, বিভাগীয় বন কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেব তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য।