মাদারীপুর সংবাদদাতা
প্রকাশ : ০২ ডিসেম্বর ২০২২ ১৪:৫২ পিএম
আপডেট : ০৩ ডিসেম্বর ২০২২ ১৪:৩৫ পিএম
মাদারীপুর পৌরসভার বর্জ্য এভাবে ফেলা হয় প্রধান সড়কের পাশে। ছবি : প্রবা
মাদারীপুর পৌরসভার দৈনিক প্রায় ৩৫ টন বর্জ্য ফেলার জন্য নিজস্ব কোনো ভাগাড় বা ডাম্পিং স্টেশন নেই। এ কারণে দুই বছরের বেশি সময় ধরে এসব বর্জ্য মস্তফাপুর ইউনিয়নের বড়মেহের এলাকার ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের পাশে ফেলা হচ্ছে। এতে ওই এলাকার ৫ শতাধিক পরিবার রোজ দুর্গন্ধ সহ্য করে বসবাস করছে। একই সঙ্গে পথচারী ও যানবাহনের যাত্রীদেরও দুর্গন্ধ সহ্য করতে হচ্ছে।
এদিকে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের পাশে ময়লা-আবর্জনার বিশাল স্তূপ গড়ে ওঠায় প্রায়ই ঘটছে ছোটবড় দুর্ঘটনা। গত এক বছরে এ এলাকায় চারজনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
স্থানীয়রা বলছেন, ময়লার স্তূপ পেট্রোল দিয়ে পোড়ালে পুরো সড়ক ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায়। ফলে মোটরসাইকেল আরোহীরা সামনে চোখে দেখতে না পেয়ে প্রায়ই দুর্ঘটনার শিকার হন।
মাদারীপুর পৌরসভা সূত্র জানায়, প্রতিদিন পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ডে প্রায় ৩৫ টন বর্জ্য হয়। বিপুল পরিমাণ এ বর্জ্য ফেলার জন্য পৌরসভার নিজস্ব জমি না থাকায় ভাগাড় বা ডাম্পিং স্টেশন করা সম্ভব হয়নি। পাঁচ বছর আগে মাদারীপুর শহরের প্রবেশমুখ শেখ হাসিনা মহাসড়কের খাগদী বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ফেলা হতো পৌরসভার সব বর্জ্য। দুর্গন্ধ চারপাশ ছড়িয়ে পড়ায় স্থানীয় লোকজনের চাপের মুখে পড়েন পৌর মেয়র। বছর দুই পরে খাগদী এলাকায় ময়লা ফেলা বন্ধ করে পৌর এলাকার পাশের খোয়াজপুর ইউনিয়নের পুরাতন ফেরিঘাট এলাকায় একটি খোলা জায়গা দুই বছরের জন্য ২ লাখ টাকায় ভাড়া নেয় পৌরসভা। কিন্তু দুই মাস ময়লা-আবর্জনা ফেলার পর সেখানেও ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা পৌর মেয়রকে বাধা দিলে ওই স্থানেও পৌরসভার বর্জ্য ফেলা বন্ধ হয়ে যায়।
সবশেষ দুই বছর ধরে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের মস্তফাপুর ইউনিয়নের বড়মেহের এলাকায় পৌর মেয়র খালিদ হোসেনের নিজস্ব ৩ একর জমির কিছু অংশে ময়লা ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বর্তমানে মহাসড়কের ২০০ মিটার অংশ ঘেঁষে পৌরসভার বর্জ্য ফেলা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার সরেজমিন বড়মেহের এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের ২৪ ফুট চওড়ার মধ্যে দেড় থেকে দুই ফুট চলে গেছে ময়লার দখলে। মহাসড়কের ২০০ মিটার অংশ নাকে-মুখে হাত চেপে, নিঃশ্বাস বন্ধ করে পথচারী ও যাত্রীরা পারাপার হচ্ছেন। দুর্গন্ধ বাতাসের সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশে। বিশাল ময়লার স্তূপে তীব্র দুর্গন্ধ থাকায় সবচেয়ে দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে মস্তফাপুর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তত ৫ শতাধিক পরিবার। এ ছাড়া ময়লার স্তূপের দক্ষিণ পাশেই রয়েছে একটি মাদরাসা ও এতিমখানা। এখানকার শিক্ষার্থীদের পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে দুর্গন্ধে। এ স্তূপের দক্ষিণ পাশে দুটি মসজিদ, পশ্চিম পাড়ে বড় পুকুর পাড় মসজিদ ও উত্তর পাড়ে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ লিমিটেড নামে একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
ময়লার স্তূপ থেকে ২০ মিটার দূরেই রাজমিস্ত্রি দেলোয়ার ব্যাপারী ও তার স্ত্রী নূর নাহার বেগম বসবাস করেন। দুই বছরের বেশি সময় ধরে এ দুর্গন্ধ সহ্য করে আসছেন তারা।
দেলোয়ার ব্যাপারী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমার জমিতে তিনজন ভাড়াটে ছিলেন। এখন একজনও নাই। দুর্গন্ধের যন্ত্রণায় সবাই চলে যান। নিজের বাড়িঘর বিধায় আমরা অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করে এখানে টিকে আছি। মুক্তি চাই আমরা। এখানে দূর থেকে আইসা কেউ এক দিনও থাকতে পারবে না। আমাদের এ কষ্ট সবাই খালি দেহে কিন্তু কেউ তো আর ময়লাগুলা সরাইয়া নেয় না।’
বড়মেহের এলাকার মো. জাহিদুল আলম বলেন, ‘লোকালয়ের মধ্যে ময়লা ফেলা বন্ধ করতে আমরা এক বছর আগে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। কিন্তু কোনো লাভ হয় নাই। এলাকার লোকজন একবার পৌরসভার ময়লার গাড়ি ভাঙচুর করে আগুন ধরিয়া দেয়। তবু তারা এখানেই ময়লা ফেলে পুরো পরিবেশটা নষ্ট করে দিছে।’
মাদারীপুর পৌরসভার বর্জ্য এভাবে ফেলা হয় প্রধান সড়কের পাশে। ছবি : প্রবা
মস্তফাপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. হাবিব হাওলাদার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘মাঝেমধ্যেই ময়লার ভাগাড়ে পেট্রোল দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। তখন ব্যস্ততম রাস্তাটি ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায়। আর এ সময় দুর্ঘটনা বেশি ঘটে। এ পর্যন্ত এখানে চারজন দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। আর ছোটবড় দুর্ঘটনা প্রায়ই কমবেশি ঘটে।’
যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলায় মস্তফাপুরের শিশু ও বৃদ্ধরা শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন বলে জানান দুর্গন্ধের শিকার বাসিন্দারা। এ সম্পর্কে পৌরসভার চিকিৎসা কর্মকর্তা হরষিত বিশ্বাস বলেন, ‘খোলা স্থানে বর্জ্য ফেলার ফলে ওই এলাকার মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্যঝুঁকির প্রভাব পড়ছে। পরিবেশ দূষণ হচ্ছে। ওই এলাকায় মশামাছির উপদ্রব বাড়ছে। এসবের কারণে ব্যাকটেরিয়া ছড়িয়ে শিশু ও বৃদ্ধরা শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।’
মাদারীপুর পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা খন্দকার আবু আহমদ ফিরোজ ইলিয়াস প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘পৌর বর্জ্য ফেলার জন্য আমাদের নিজস্ব কোনো জমি নেই। পৌরসভার মধ্যে ও আশপাশে যেখানেই ময়লা ফেলি না কেন স্থানীয়দের তোপের মুখে পড়ে সরে আসতে হচ্ছে। তাহলে পৌর ময়লা আমরা কোথায় ফেলব? এ কারণে পৌর মেয়র তার নিজের কেনা জমিতে বাধ্য হয়ে ময়লা ফেলছেন। যদিও সেটা ইউনিয়নের মধ্যে। সেখানের মানুষও দুর্গন্ধে দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। তারা প্রায়ই আমাদের ময়লার গাড়ি বাধা দেন।’