বিপন্ন তিস্তা
নিয়ন দুলাল, লালমনিরহাট
প্রকাশ : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১০:৫৩ এএম
একসময়ের প্রমত্তা তিস্তায় পানি নেই। অনেক জায়গায় শুধু ধু-ধু বালুচর। সম্প্রতি তোলা। প্রবা ফটো
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের জনপদের জীবনরেখা বলা হয় তিস্তা নদীকে। একটা সময় এ নদীতে ছিল উত্তাল ঢেউ আর দুকূল ছাপানো জলরাশি, ছিল পালতোলা নৌকা, বক-গাঙচিল আর জলজ নানা প্রাণিকূলের সমাহার। এ নদীর দুই কূল ঘিরে যুগ যুগ ধরে গড়ে উঠেছে সভ্যতা, যেখানে প্রকৃতি আপন রঙে এঁকেছিল সবুজের জলছবি। সেই প্রমত্তা তিস্তা আজ শুধু ধু-ধু বালুচর। অভিন্ন নদী হলেও উজানে প্রতিবেশী ভারতের একের পর জলবিদ্যুৎ প্রকল্প আর গজলডোবায় বাঁধ নির্মাণে এ নদীর উচ্ছল গতিকে রোধ করে দেওয়া হয়েছে।
পূনর্ভবা, আত্রাই আর করতোয়ার মিলিত তিন স্রোত বা ত্রিস্রোতা কালক্রমে নাম ধারণ করেছে তিস্তা। সেই তিস্তার বুকে ভারতীয় অংশে টইটুম্বুর পানি থাকলেও একতরফা পানি প্রত্যাহারের কারণে এর বাংলাদেশ অংশ যেন এখন মরা খাল। ফলে অস্তিত্ব সংকটে এ অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য, হুমকিতে পরিবেশ। আর এ নদীর জলরাশির ওপর নির্ভর করা লাখো মানুষের জীবন আজ বিপন্ন।
পানি বণ্টনে ভারতের একঘেয়েমি, অনৈতিক সময়ক্ষেপণ আর হঠকারিতায় তিস্তা তীরবর্তী ও আশপাশের প্রকৃতি এখন রুক্ষ। অন্যদিকে বর্ষায় ভারত বন্যা নিয়ন্ত্রণে গজলডোবার সব গেট খুলে দিলে পানির চাপে দুই তীরে সাধারণের বসতভিটাসহ বিলীন হয় ফসলি জমি। ভাঙনের শিকার হয়ে প্রতিবছর নিঃস্ব হয় কয়েক হাজার পরিবার।
প্রায় ৫ কিলোমিটার প্রশস্ত তিস্তা শুকিয়ে বর্তমানে ১৫ থেকে ২০ মিটারের এক মরা খালে রূপ নিয়েছে। এর কোথাও কোমরপানি, কোথাওবা হাঁটুপানি। তাতে নৌকা চালানোই দায়। মাইলের পর মাইল ধু-ধু বালুচর পায়ে হেঁটে মূল ভূখণ্ডে আসতে হয় চরাঞ্চলের মানুষকে। তিস্তাপারের মানুষ বলছে, কয়েক বছর আগেও শুষ্ক মৌসুমেও তিস্তায় ছিল বিপুল স্রোতধারা। মূলত তিস্তার পানি কমতে শুরু করে ২০০৮ সালের পর থেকে, যা এখন নেমে এসেছে প্রায় শূন্যের কোঠায়। নদী শুকিয়ে যাওয়ায় মৎস্যজীবীরা তাদের বাপ-দাদার পুরোনো পেশা ছেড়ে এখন দিনমজুর কিংবা গ্রাম ছেড়ে শহরে গিয়ে হয়েছেন ছিন্নমূল। ছোট ছোট খেয়াখাট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চরাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা একেবারে অচল হয়ে পড়েছে। হারিয়ে গেছে রঙিন পালের নৌকা আর সেই চিরচেনা ভাওয়াইয়ার সুর।
কৃষিকাজে সেচ স্বাভাবিক রাখতে যে পানি দরকার, নদীতে তা নেই। এমনকি নদীর অস্তিত্ব রক্ষার পানিটুকুও এখন পাওয়া যাচ্ছে না। তিস্তার পানিপ্রবাহ এ যাবৎকালের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। ফলে হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মতে, তিস্তায় প্রয়োজনমতো পানি এলে দেশের উত্তরাঞ্চলের এক বৃহৎ অংশের আর্থসামাজিক অবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব হতো। একদিকে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা হতো, তেমনি শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার আশপাশের নদীগুলোয় সার্বক্ষণিক পানি পেলে কৃষকরা খুব সহজেই ও কম খরচে সেচ সুবিধা পেত। বাড়ত খাদ্য উৎপাদন। এ ছাড়া নদীতে পানি না থাকায় বিলুপ্ত হচ্ছে অনেক দেশীয় মাছ, পাখিসহ নানা প্রাণী। হুমকিতে রয়েছে এখানকার বাস্তুতন্ত্র তথা জীববৈচিত্র্য।
ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় তিস্তা ও আশপাশের এলাকায় পরিবেশগত মারাত্মক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। মরে যাচ্ছে নদীর তীরে বনায়নের জন্য রোপণ করা বড় ছোট গাছ। তলদেশে অজস্র নুড়ি, বালি আর পলি পড়ে তিস্তার বুকে শুকনো মৌসুমে তৈরি হয়েছে উত্তপ্ত বালুর স্তূপ। অপরদিকে তিস্তার শাখা-প্রশাখাগুলো পানির অভাবে মরে যাওয়ায় পরিবেশের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে, ক্রমশ মরুকরণের দিকে এগোচ্ছে উত্তরাঞ্চল।
এ অঞ্চলের কৃষি, মৎস্য, যোগাযোগ, জীববৈচিত্র্য আর বিপুল আর্থিক সংস্থানের আধার যে নদী সেই তিস্তার পানি বণ্টন যেন এখন মরীচিকা। ফলে প্রকৃতির কোলে সৃষ্ট এককালের স্রোতস্বিনী পাহাড়ি কন্যা তিস্তা এখন মানুষের হাতে মৃত্যুই যেন তার অমোঘ নিয়তি।
ভারতের সিকিম রাজ্যের হিমালয়ের চিতামু হ্রদ থেকে যার উৎপত্তি, সেই প্রমত্তা তিস্তার বিস্তীর্ণ বুক যেন এখন বালুময় বিরানভূমি। সেচ সুবিধা ছাড়াই এ নদী বাঁচাতে ৫ হাজার কিউসেক পানি প্রয়োজন হলেও বর্তমানে তা উজান থেকে আসছে ৬০০ থেকে ৮০০ কিউসেক। বিপর্যয় ঠেকাতে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি তাই সময়ের দাবি বলে জানায় স্থানীয়রা।