বগুড়া অফিস ও সারিয়াকান্দি (বগুড়া) প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১৭:৫৩ পিএম
বগুড়ার যমুনা ও বাঙ্গালী নদীতে বৈদ্যুতিক শক দিয়ে মাছ শিকার করছে একটি অসাধু চক্র। ছবিতে বৈদ্যুতিক শকে মাছ শিকারে যাওয়ার আগে কয়েকজন ব্যক্তিকে প্রস্তুতি নিতে দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি সারিয়াকান্দি উপজেলার মথুরাপাড়া ঘাটে।
বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে যমুনা ও বাঙ্গালী নদীতে বৈদ্যুতিক শক দিয়ে মাছ শিকার করা হচ্ছে। কম সময়ে বেশি মাছের আশায় একশ্রেণির অসাধু জেলে বৈদ্যুতিক তার যুক্ত বিশেষ ধরনের জালি দিয়ে এ কাজ করছেন বলে জানা গেছে। এতে মৎস্য সম্পদসহ জীববৈচিত্র্য হুমকিতে পড়েছে।
সারিয়াকান্দি মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, যমুনা নদীতে প্রায় সব প্রজাতির মাছই মেলে। তবে ছোট মাছের মধ্যে বাঁশপাতারি, বৈরালি, বেলে, রিঠা, গলদা চিংড়িই বেশি পাওয়া যায়। আর বড় মাছের মধ্যে ৫ থেকে ১০ কেজি ওজনের পাঙাশ, বাগাড়, বোয়াল, ভেউশ এবং ইলিশও মেলে। অন্যদিকে পাশের বাঙ্গালী নদীতে রানী বউ, ভাঙনা বাটা, কালবাউশ এবং ঘাউড়া মাছ বেশি পাওয়া যায়। এ ছাড়া বর্ষাকালে অতিবৃষ্টিজনিত বন্যার কারণে পুকুরগুলোতে চাষ করা বিভিন্ন প্রজাতির মাছও পাওয়া যায়। ওই দুই নদীতে প্রায় তিন হাজার জেলে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে।
স্থানীয়রা জানায়, বৈদ্যুতিক শকে নদীতে থাকা মাছের পোনা, ডিম এমনকি সাপ এবং ব্যাঙসহ নানা ধরনের কীটপতঙ্গও মারা পড়ছে। ফলে যমুনা এবং বাঙ্গালী নদীতে মাছের উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি জীববৈচিত্র্যও হুমকির মুখে পড়েছে।
উপজেলার হিন্দুকান্দি গ্রামের বাসিন্দা আফজাল হোসেন বলেন, একশ্রেণির মানুষ রিকশা অথবা ইজিবাইকে ব্যবহৃত ব্যাটারির সঙ্গে একটি ইনভার্টার (ব্যাটারির নির্ধারিত ভোল্টকে কয়েকগুণ বাড়ানোর যন্ত্র) যুক্ত করে বিদ্যুৎপ্রবাহ তৈরির মাধ্যমে যমুনা এবং বাঙ্গালী নদীতে মাছ শিকার করছে। প্রায় তিন বছর আগে প্রথম এই প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। তারপর থেকে দিন দিন ওই ধরনের শিকারির তৎপরতা বেড়েই চলেছে। তিনি মাছ শিকারের পদ্ধতি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, ব্যাটারি ও ইনভার্টার থেকে দুটি তার বের করে একটি পানিতে ফেলে দেওয়া হয়েছে আর অন্যটি একটি জালির সঙ্গে যুক্ত করা হয়। বিদ্যুতায়িত ওই জালি যখন নদীর পানিতে ফেলা হচ্ছে তখন ৫ থেকে ৭ ফুট দূরত্বের মধ্যে থাকা মাছ কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ভেসে ওঠে। ভেসে ওঠা সেই মাছগুলো পরে জালি দিয়ে নৌকায় তোলা হয়। ওই পদ্ধতিতে মাছ শিকারের সাপ, ব্যাঙও মারা পড়ছে।
মথুরাপাড়া এলাকার জেলে সয়ফুল হাওলাদার আক্ষেপ করে বলেন, ‘পানি কমে যাওয়া যমুনা নদীতে এমনিতেই মাছ কমেছে। তার ওপর এখন এই কারেন্ট জ্যালারা আসার পর আমরা আর মাছই পাচ্ছি না। কারণ ওরা ক্যারেন্ট দিয়ে নিমেষেই ছোট-বড় সব মাছ মারছে।’
সুবল হাওলাদার নামে অপর জেলে বলেন, যমুনা নদীর উজানে হাসপানাপাড়া থেকে ভাটিতে চন্দনবাইশা পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকায় গভীর রাতে বৈদ্যুতিক শক দিয়ে মাছ মারা হচ্ছে। তারা গভীর রাতে মাছ ধরতে নৌকা নিয়ে নদীতে নামে আর ভোরে বাড়ি ফেরে। এভাবে চলতে থাকলে আগামীতে নদীতে কোনো মাছই থাকবে না। যদি এদের ধরা না হয় তাহলে আমাদের বেঁচে থাকাই কঠিন হয়ে যাবে।’
মৎস্য দপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, বৈদ্যুতিক শক দিয়ে নিধন করা মাছ দ্রুত পচে যায় বলে তা মানবস্বাস্থ্যের জন্যও ক্ষতিকর। বৈদ্যুতিক শক দিয়ে মাছ শিকারকারীদের শনাক্ত করা যাচ্ছে না বলে কোনো ব্যবস্থাও গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে না উল্লেখ করে মৎস্য দপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, জলবায়ু পরিবর্তন এবং গতিপথ পরিবর্তনসহ নানা কারণে এমনিতেই নদীতে মাছের উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে। এরই মধ্যে বৈদ্যুতিক শক শিকারের কারণে পোনামাছ মরে যাওয়ায় মাছের উৎপাদন আরও কমতে শুরু করেছে। ২০২৩ সালে যমুনা এবং বাঙ্গালী নদীতে ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ১ হাজার ৫ মেট্রিক টন মাছ পাওয়া গিয়েছিল। ২০২৪ সালের উৎপাদনের হিসাব এখনও করা হয়নি। তবে কর্মকর্তাদের ধারণা, এক বছরের ব্যবধানে মাছের উৎপাদন গড়ে ৩০ শতাংশ কমতে পারে।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মুরশিদা খাতুন বলেন, ‘আমি সম্প্রতি এখানে যোগদান করেছি। বিষয়টি জানার পর অভিযুক্ত শিকারিদের আটকে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয়দেরও সচেতন করা হয়েছে।’ বৈদ্যুতিক শক দিয়ে মাছ শিকারের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে তিনি বলেন, পানি বিদ্যুতায়িত করার কারণে মাছের সঙ্গে সঙ্গে বিচরণরত সাপ এবং ব্যাঙসহ অন্যান্য কীটপতঙ্গও মারা পড়ছে। শক থেকে মাছসহ কোনো জলজ প্রাণী বেঁচে গেলেও প্রজননক্ষমতা নষ্ট হয়। ফলে আমাদের জীববৈচিত্র্যই হুমকির মুখে পড়ছে। তা ছাড়া বৈদ্যুতিক শক দিয়ে নিধন করা মাছ মানবস্বাস্থ্যের জন্যও ক্ষতিকর। কারণ এতে তাৎক্ষণিক পচন প্রক্রিয়া শুরু হয়।