পটুয়াখালীর কলাপাড়া
কলাপাড়া (পটুয়াখালী) প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১১:৩৯ এএম
পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় রাজনৈতিক ছত্রছায়া বেপরোয়া হয়ে উঠেছে সংঘবদ্ধ ভাঙ্গারি চোরাই চক্রের সদস্যরা। প্রবা ফটো
পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় রাজনৈতিক ছত্রছায়া ও ব্যবসায়িক অংশীদারত্বে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে সংঘবদ্ধ ভাঙ্গারি চোরাই চক্রের সদস্যরা। বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ সরকারি, বেসরকারি বিভিন্ন মেগা প্রকল্পের কাজে ব্যবহৃত স্টিল, তামা, লোহা, স্ক্রাপসহ নানান কিছু অনেকটা ফ্রি স্টাইলে চোরাইপথে বিক্রি করছে চক্রটি। চক্রটি এতই বেপরোয়াÑ এক রাতেই গায়েব করে ফেলেছে এলজিইডির একটি আয়রন ব্রিজ। এসব চোরাই ভাঙ্গারি মালামাল হাত বদলে বিক্রি হচ্ছে ভাঙ্গারি দোকানগুলোয়, যা ট্রাকযোগে চলে যাচ্ছে বরিশাল, খুলনা, যশোরসহ ঢাকার শ্যামপুর, মেঘনার পাড়, কাঁচপুর এলাকায়। অভিযোগ রয়েছে, ৫ আগস্টের আগে ভাঙ্গারি ব্যবসা চলত স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীর কথায়। বর্তমানে যার নিয়ন্ত্রণ বিএনপির নেতাকর্মীর হাতে।
সম্প্রতি বিদ্যুৎকেন্দ্রে চুরির ঘটনায় কর্তৃপক্ষ বিএনপি নেতাকর্মীর নামে কলাপাড়া থানায় লোকদেখানো একটি মামলা করেছে মাত্র। কিন্তু এলজিইডির আয়রন ব্রিজ গায়েবের ঘটনায় অদ্যাবধি আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এলজিইডির পক্ষ থেকে বলা হয়, ব্রিজটি নির্মাণ শেষে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে, এটি এখন তাদের সম্পত্তি। আর ইউপি চেয়ারম্যানের বক্তব্য, দেশের পরিস্থিতি ভালো না, এ নিয়ে কারও সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করতে চাই না।
সূত্র জানায়, গত দেড় দশক ধরে রাজনৈতিক দলের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে চলছে অবৈধ ভাঙ্গারি বাণিজ্য। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের একাধিক নেতাকর্মী জড়িয়ে পড়েছেন এ ব্যবসায়। বিদ্যুৎ প্লান্টের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও ভাঙ্গারি বাণিজ্যে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। লোহা, টিন, স্টিল, তামা, সোলার প্যানেল, বিদ্যুৎ ট্রান্সমিটার, ব্যাটারি, টিউবওয়েলের হাতল, টিউবওয়েল ভাঙ্গারি চক্রটি পাচার করে আসছে। এভাবে অবৈধ বাণিজ্যে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে চক্রটি। মোটা অঙ্কের কমিশন পাচ্ছে রাজনৈতিক দলের স্থানীয় শীর্ষ নেতারা ও প্রশাসন।
সূত্র আরও জানায়, উপজেলার বিভিন্ন স্থানে দেড় শতাধিক ছোটবড় ভাঙ্গারি মালামাল ক্রয়-বিক্রয়ের দোকান রয়েছে। কিবরিয়া, অপু মেম্বার, জাকির মুসল্লি, হালিম গাজী, ওয়াসিম, জালাল, খালেকের মতো প্রভাবশালী ভাঙ্গারি ব্যবসায়ীর মালিকানাধীন দোকানে রয়েছে শত শত দাদন দেওয়া গাওয়াল বা হকার। যারা নতুন হাঁড়িপাতিল নিয়ে বাড়ি বাড়ি বিক্রিসহ পুরোনো ভাঙ্গারি মালামাল কেনেন। এ ছাড়াও বিদ্যুৎ প্লান্টসহ মেগা প্রকল্পের মালামাল চোরাইপথে ক্রয়-বিক্রয় চলছে রাজনৈতিক কানেকশনে। এসব চোরাই মাল ক্রয়ের পর ট্রাকে চলে যাচ্ছে বড় মহাজনদের কাছে।
এদিকে আলোচনায় আসে গত বছরের অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহে উপজেলার চম্পাপুর ইউনিয়নের মাছুয়াখালী গ্রামের কৃষ্ণপুর খালের ওপর এলজিইডি নির্মিত ৪০ মিটার দৈর্ঘ্যের ৩ মিটার প্রস্থ আয়রন ব্রিজ রাতের আঁধারে চুরি হওয়ার ঘটনা। স্থানীয়রা জানান, ব্রিজটি মাছুয়াখালী ও কৃষ্ণপুর গ্রামের মানুষের চলাচলে ব্যবহৃত হতো। একই স্থানে এলজিইডি একটি গার্ডার ব্রিজ নির্মাণ করায় এটি গত কয়েক বছর ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল। মাত্র দুই থেকে তিন রাতের মধ্যে প্রায় আড়াই হাজার কেজি ওজনের ব্রিজটির লোহার অ্যাঙ্গেল, ফিশপ্লেট, স্ক্রাপ, স্ক্রুসহ ব্রিজের লোহার মালামাল কেটে নিয়ে যায় চোর চক্র। ঘটনার পর মাছুয়াখালী গ্রামের বাসিন্দাদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে এলজিইডি কর্তৃপক্ষ পরিদর্শনে এলেও এ বিষয়ে কোনো আইনি পদক্ষেপ নেয়নি।
এছাড়াও ধানখালী ইউনিয়নের গিলাতলায় তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সীমানা প্রাচীরের নিচে সুড়ঙ্গ কেটে চোরাই মালামাল পাচার হচ্ছে নিয়মিতই। গিলাতলা স্পট থেকে ভাঙ্গারি ব্যবসায়ীদের গোডাউনে চলে যায় এসব চোরাই মালামাল। এখানে দুটি টিনের ঘর তৈরি করে চোরাই মালামাল গোডাউনে সংরক্ষণ হচ্ছে।
এ বিষয়ে ভাঙ্গারি ব্যবসায়ী অপু জানান, গিলাতলা থেকে এক গাড়ি ভাঙ্গারি মাল এনেছি। ধানখালীর লোন্দায় ৫টি ও নোমোরহাট বাজারে ভাঙ্গারির অনেক দোকান খুলে প্রকাশ্যে মালামাল বেচাকেনা হচ্ছে।
আরেক ভাঙ্গারি ব্যবসায়ী কিবরিয়া বলেন, আমার বাড়ি গোপালগঞ্জ। আমি চোরাই ব্যবসা করি না, কাগজপত্র থাকলে মাল কিনি, নতুবা কিনি না। এ ব্যবসায় এখন আর লাভ নেই। নেতাদের সঙ্গে নিয়ে ব্যবসা করতে হচ্ছে। মেম্বার চলে গেছে। আমিও ভাবছি চলে যাব।
আয়রন ব্রিজ চুরির বিষয়ে চম্পাপুর ইউপি চেয়ারম্যান বাবুল মাস্টার বলেন, ব্রিজের মালামাল কেটে নিয়ে কারা বিক্রি করেছে তা সবাই জানে। দেশের পরিস্থিতি ভালো না, এ বিষয়ে আইনি পদক্ষেপ নিয়ে কারও সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করতে চাই না।
এলজিইডির উপজেলা প্রকৌশলী মো. সাদিক বলেন, আয়রন ব্রিজটি অনেক আগেই ইউনিয়ন পরিষদকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। চুরির বিষয়ে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
কলাপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জুয়েল ইসলাম বলেন, ‘ভাঙ্গারির চোরাই মাল ট্রাকে পাচার করার সময় আগে অনেক মাল জব্দ করা হয়েছে। মামলাও হয়েছে। বেশ কয়েকজনকে বিভিন্ন সময়ে আটকও করা হয়েছে। বিদ্যুৎ প্লান্টের মালামাল চুরির ঘটনায়ও মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। সুনির্দিষ্ট তথ্য কিংবা অভিযোগ পেলে আরও তল্লাশি, চোরাই মালামাল উদ্ধারসহ জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালনো হবে।’
কলাপাড়া ইউএনও রবিউল ইসলাম বলেন, আয়রন ব্রিজ রাতের আঁধারে চুরি হয়ে যাওয়ার পর এলজিইডি এবং সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের চেয়ারম্যানকে আইনি পদক্ষেপ নিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এদিকে বিএনপির ছত্রছায়ায় ভাঙ্গারি চোরাই চক্রের দৌরাত্ম্যের অভিযোগের বিষয়ে দলটির স্থানীয় এক দায়িত্বশীল নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, গত ১৫ বছর ধরে এ ব্যবসার মূল্য লভ্যাংশ শতকরা ৫ ভাগ হারে নিয়েছেন আওয়ামী লীগের স্থানীয় এমপি। তখন তাদের নেতাকর্মীরা সামলাত এসব, ফলে কিছু জানাজানি হয়নি। এখন আমাদের নেতাকর্মী এ নিয়ে ঠোকাঠুকি করায় আওয়াজ ছড়িয়ে পড়েছে।
এই নেতা আরও দাবি করেন, মোটা অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করেই বৈধভাবে ব্যবসা করছেন তারা।