ফল আমদানি
হুমায়ুন মাসুদ, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১১:২৮ এএম
আপডেট : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১১:৩১ এএম
ছবি : সংগৃহীত
‘ছেলে-মেয়ে আপেল খেতে পছন্দ করে, আগে প্রতি সপ্তাহে এক/দুই কেজি আপেল কিনতাম। কিন্তু এখন সেটি সম্ভব হয় না। এখন এক সপ্তাহে কিনলে পরের দুই সপ্তাহ আর কেনা হয় না।’ ফল কেনার বিষয়ে এমনটাই জানালেন চট্টগ্রাম নগরীর ঈদগাঁ এলাকার বাসিন্দা বাকিবিল্লাহ। প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, গত কয়েক বছর বিদেশি ফলের দাম অনেক বেড়েছে। এখন আর আগের মতো কেনা হয় না। আগে প্রতি মাসে কয়েক কেজি আপেল কিনতাম। এখন মাসে সর্বোচ্চ এক বা দুই কেজি কিনি। ছোট ছেলেমেয়ে না থাকলে হয়তো এটাও কেনা হতো না। এত দাম দিয়ে কে ফল খাবে?
দাম বেড়ে যাওয়ায় বাকিবিল্লাহর মতো অনেকে ফল কেনা কমিয়ে দিয়েছেন, যার প্রভাব পড়েছে ফল আমদানিতে। দাম বৃদ্ধির কারণে বাজারে আমদানি করা ফলের চাহিদা কমে যাওয়ায় বছর বছর কমছে ফল আমদানি। খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, গত ৫ বছরের ব্যবধানে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর দিয়ে আপেল আমদানি কমেছে প্রায় ৪১ শতাংশ।
শুধু আপেল নয়, একই সময়ে এই বন্দর দিয়ে অন্যান্য ফল আমদানিও কমেছে। ফল আমদানির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত ৫ বছরে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর দিয়ে বিভিন্ন ফল আমদানি কমেছে প্রায় ১৯ শতাংশ। ২০১৯-২০ অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আপেল, কমলা, মাল্টা, আঙ্গুর, আম, নাশপাতি, ড্রাগনসহ বিভিন্ন ধরনের ৪ লাখ ১৭ হাজার ৩৬৫ মেট্রিক টন ফল আমদানি হয়। সেখানে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ফল আমদানি হয়েছে ৩ লাখ ৩৯ হাজার ৮৯৪ মেট্রিক টন।
বাজারে চাহিদা কমে যাওয়াই শুধু নয়, ফল আমদানি কমে যাওয়ার পেছনে ডলার সংকটের কারণে পর্যাপ্ত এলসি করতে না পারা এবং শুল্ককর বৃদ্ধিকে দায়ী করছেন আমদানিকারকরা। তারা বলছেন, ডলার সংকটের কারণে গত কয়েক বছর ধরে চাহিদামতো এলসি খুলতে পারেননি তারা। অন্যদিকে ফল আমদানি নিরুৎসাহিত করতে ২০২২ সালে শুল্ককর বাড়ায় সরকার। এ কারণে ফল আমদানিতে আগের চেয়ে ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ খরচ বেড়েছে। পাশাপাশি শুল্ককর বৃদ্ধির কারণে ফল আমদানি কমিয়ে দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। যে কারণে এখন বছর বছর কমছে ফল আমদানি। আগের বছরের তুলনায় ২০২৩-২৪ অর্থবছর চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর দিয়ে ফল আমদানি কমেছে ৪৬ হাজার ৫১৬ মেট্রিক টন।
উদ্ভিদ সংঘ নিরোধ (চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর) কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯-২০ অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আপেল, কমলা, মাল্টা, আঙ্গুর, আম, নাশপাতি, ড্রাগনসহ বিভিন্ন ধরনের ৪ লাখ ১৭ হাজার ৩৬৫ মেট্রিক টন ফল আমদানি হয়। সেখানে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ফল আমদানি হয়েছে ৩ লাখ ৩৯ হাজার ৮৯৪ মেট্রিক টন। এই হিসাবে ৫ বছরের ব্যবধানে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর দিয়ে বিভিন্ন ধরনের ফল আমদানি কমেছে ৭৭ হাজার ৪৭১ মেট্রিক টন বা ১৮ দশমিক ৫৬ শতাংশ।
শুধু ২০১৯-২০ অর্থবছরের তুলনায় ফল আমদানি কমেছে তা নয়, ফল আমদানির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়Ñ ২০২০-২১ অর্থবছর, ২০২১-২২ অর্থবছর এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরের তুলনায়ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আমদানি কমছে। ২০২০-২১ অর্থবছরের তুলনায় আমদানি কমেছে ৬৬ হাজার ৮৮১ মেট্রিক টন বা প্রায় ১৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ। ২০২১-২২ অর্থবছরের তুলনায় আমদানি কমেছে ১ লাখ ৪০ হাজার ৩১৯ মেট্রিক টন বা প্রায় ২৯ দশমিক ২২ শতাংশ এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরের তুলনায় আমদানি কমেছে ৪৬ হাজার ৫১৬ মেট্রিক টন বা প্রায় ১৩ দশমিক ৬৮ শতাংশ।
একই সময়ে (৫ বছরের ব্যবধানে) আপেল আমদানি কমেছে প্রায় ৪১ শতাংশ। ২০১৯-২০ অর্থবছরে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর দিয়ে আপেল আমদানি হয় ২ লাখ ৪৫ হাজার ৭৭৬ মেট্রিক টন। সেখানে ২০২৩-২৪ অর্থবছর আপেল আমদানি হয় ১ লাখ ৪৪ হাজার ৯৫১ মেট্রিক টন। অন্যদিকে নাশপাতি আমদানি কমেছে প্রায় ২২ দশমিক ১২ শতাংশ। ২০১৯-২০ অর্থবছরে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর দিয়ে নাশপাতি আমদানি হয় ১২ হাজার ৩৯৫ মেট্রিক টন। সেখানে ২০২৩-২৪ অর্থবছর নাশপাতি আমদানি হয় ৯ হাজার ৬৫৩ মেট্রিক টন।
এদিকে আপেল এবং নাশপাতি আমদানি কমলে বিপরীত চিত্র দেখা গেছে অন্যান্য ফল আমদানিতে। ফল আমদানির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ৫ বছরের ব্যবধানে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর দিয়ে কমলা, আঙ্গুর এবং আনার আমদানি বেড়েছে। এর মধ্যে কমলা আমদানি বেড়েছে ১৪ শতাংশ বা ১৯ হাজার ১৫৩ মেট্রিক টন, আনার আমদানি বেড়েছে ৩৭১ শতাংশ বা ১৪১ মেট্রিক টন এবং আঙ্গুর আমদানি বেড়েছে ২৮ দশমিক ৪৭ শতাংশ বা ৬ হাজার ৬২৪ মেট্রিক টন।
উদ্ভিদ সংঘ নিরোধ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯-২০ অর্থবছরে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর দিয়ে কমলা আমদানি হয় ১ লাখ ৩৫ হাজার ৪১১ মেট্রিক টন। সেখানে ২০২৩-২৪ অর্থবছর কমলা আমদানি হয় ১ লাখ ৫৪ হাজার ৫৬৪ মেট্রিক টন। অন্যদিকে ২০১৯-২০ অর্থবছরে আঙ্গুর আমদানি হয় ২৩ হাজার ২৬৪ মেট্রিক টন। সেখানে ২০২৩-২৪ অর্থবছর আঙ্গুর আমদানি হয় ২৯ হাজার ৮৮৮ মেট্রিক টন। এ ছাড়া ৫ বছর আগে ২০১৯-২০ অর্থবছরে আনার আমদানি হয় মাত্র ৩৮ মেট্রিক টন। সেখানে গত অর্থবছর চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর দিয়ে আনার আমদানি হয়েছে ১৭৯ মেট্রিক টন।
ফল আমদানি কমে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইমপোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক ও চট্টগ্রাম ফল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ তৌহিদুল আলম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, করোনা মহামারির পর থেকেই ফলের ব্যবসা ভালো যাচ্ছে না। মহামারির ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে না উঠতে ডলার সংকটের কারণে ২০২২ সালে ফল আমদানিতে শুল্ককর বাড়িয়ে দেয় সরকার। মূলত তখন থেকেই ফল আমদানি কমতে শুরু করেছে। এখন সরকার আবার শুল্ককর বাড়িয়ে দিয়েছে। আগামীতে ফল আমদানি আরও কমবে। সরকার শুল্ককর না কমালে রমজানের বাজারে বিদেশি ফলের সংকট তৈরি হবে। কারণ এত টাকা খরচ করে কেউ ফল আমদানি করতে চাইবে না।
তিনি আরও বলেন, শুল্ককর বাড়ানোর পর ইতোমধ্যে অনেকে ফল আমদানি কমিয়ে দিয়েছেন। আগে যিনি মাসে ১০ থেকে ১২ কন্টেইনার ফল আমদানি করতেন, এখন তিনি আমদানি করছেন দুই থেকে তিন কন্টেইনার। রমজানের আগে ফল আমদানি কমে গেলে বাজারে ফলের সরবরাহ কমবে। তখন বাজারে আমদানি করা ফলের দাম বেড়ে যাবে।