ময়মনসিংহের শিক্ষাব্যবস্থা
শফিক সরকার, ময়মনসিংহ
প্রকাশ : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১৮:৫২ পিএম
ময়মনসিংহের চরাঞ্চলের ঝাপারকান্ধা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
ময়মনসিংহের একটি গ্রামের নাম ঝাপারকান্দা। এটি শহর থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরে। চরাঞ্চলের এ গ্রামে একটি মাত্র সরকারি স্কুল আছে। এটি চারবার ব্রহ্মপুত্র নদে ভেঙেছে। সর্বশেষ ২০১৬ সালে ভাঙনের কবলে পড়ে। ভাঙন থেকে অর্ধকিলোমিটার দূরে একটি ছোট টিনের ঘরে স্কুলটির পাঠদান চলছে।
৮ বছরেও এর কোনো ভবন তৈরি হয়নি। স্কুলের জন্য জমি পর্যন্ত একোয়ার করা হয়নি। শিক্ষকরা মনে চাইলে আসেন, মন না চাইলে আসেন না। ঢিমেতালে চলছে স্কুলের শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা।
চরাঞ্চলের বেশিরভাগ স্কুলের হাল ঝাপারকান্দা গ্রামের স্কুলটির মতো। শিক্ষকরা ঠিকমতো আসেন না। এতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার মান নেমে গেছে। শিক্ষকরা খেয়ালখুশিমতো স্কুলে আসায় শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিও কম। এটির প্রতি নজরও দেওয়া হয় না। চরাঞ্চলের স্কুলগুলোর বেহাল দশার প্রতি উপজেলা শিক্ষা অফিসেরও দৃষ্টি নেই। নেই নিয়মিত স্কুল পরিদর্শন। স্কুলের শিক্ষক ও শিক্ষা অফিস যেন গায়ে হাওয়া দিয়ে চলছে। চরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা রসাতলে ডুবতে বসেছে। এতে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। দায় নেই। জেলা সদর থেকে চরাঞ্চলের দূরত্ব প্রায় ৪০ কিলোমিটার। যোগাযোগ অবকাঠামোও তেমন ভালো নয়। কিন্তু চরাঞ্চলের মানুষ মনে করে, তাদের সন্তাদের প্রতি শিক্ষক ও শিক্ষা অফিসের নজর দেওয়া দরকার। শিক্ষকরা ঘরে বসে থাকবে, কিন্তু স্কুলে আসবে নাÑ তাদের বিরুদ্ধে শিক্ষা অফিস যদি কোনো ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে স্কুলগুলোর অবস্থা আরও বেহাল দশায় পড়বে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ময়মনসিংহ সদর উপজেলায় সরকারি স্কুল রয়েছে ১৮৫টি। তার মধ্যে ২৭টি রয়েছে চরাঞ্চলে। এসব স্কুল ব্রহ্মপুত্র নদীর দুই পাশের বোররচর, পরানগঞ্জ অষ্টধর ও কুষ্টিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে। বৈঠামারি, মধুমারি ও ঝাপারকান্দা বিদ্যালয় নদে ভেঙেছে একাধিকবার। কিন্তু নদে ভাঙার পর সময় অনেক গড়িয়েছে, কিন্তু সেখানে নতুন ভবন ও জমি অধিগ্রহণের কোনো উদ্যোগ নেয়নি শিক্ষা বিভাগ। এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা যেমন কম তেমনি শিক্ষকরাও ঠিকঠাকমতো উপস্থিত থাকেন না। হাজির না থাকলেও জবাবদিহি করতে হয় না তাদের।
সম্প্রতি সরেজমিন অষ্টধর ইউনিয়নের ঝাপারকান্দা সরকারি স্কুলটি দেখার সুযোগ হয়েছে প্রতিদিনের বাংলাদেশ প্রতিবেদকের। বেলা ৩টায় স্কুলের ছোট এক অফিসকক্ষের সামনে পাওয়া যায় বিদ্যাপীঠের এক সহকারী শিক্ষক এসএম মাহমুদ হাসান ও একজন নাইট গার্ডকে। আরেক সহকারী শিক্ষক রেবেকা নাজনীন স্কুলছুটির এক ঘণ্টা আগেই চলে যান। এদিকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক তাহমিনা আক্তার আছেন ছুটিতে। অর্থাৎ ওই দিন মাত্র দুজন শিক্ষক দিয়ে চলছিল স্কুলটি।
সহকারী শিক্ষক হাসান জানান, এই স্কুলে শিক্ষকের পদ রয়েছে ছয়জনের। সেখানে তারা আছেন তিনজন। এই তিন শিক্ষক দিয়ে চলছে বিদ্যালয়টি। তিনি বলেন, ‘একদিকে বই নেই, অন্যদিকে ঘনঘন মাদ্রাসা হওয়ায় শিক্ষার্থী কমে গেছে।’
মোবাইল ফোনে স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক তাহমিনা আক্তার বলেন, ‘এই বিদ্যালয়টি চারবার নদে ভেঙেছে। পরবর্তী সময়ে নদের পাড়ে স্থানীয় ইউপি সদস্যের সহযেগিতায় ছোট একটি টিনের ঘর বানিয়ে এটি চালু রাখা হয়েছে। এরপর দীর্ঘদিনেও এখানে নতুন বিল্ডিং করার কথা ভাবা হয়নি। এমনকি বিদ্যালয়ের জমি পর্যন্ত অধিগ্রহণ করা হয়নি। এভাবে ছোট টিনের ঘরে বিদ্যালয়টি চলছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘পদ শূন্য থাকলেও শহর থেকে অনেক দূরে হওয়ায় এই বিদ্যালয়ে কোনো শিক্ষক আসতে চায় না।’
এলাকার বাসিন্দা জামাল উদ্দিন বলেন, ‘নদে ভাঙা বিদ্যালয়ে নেই ভবন, নেই শিক্ষার্থী। সেই সঙ্গে নেই শিক্ষা অফিস থেকে কোনো তদারকি। শিক্ষকরা মন চাইলে আসে, আবার মন চাইলে চলে যায়। এ ছাড়া জেলা শহর থেকে অনেক দূর বলে কেউ আসতে চায় না।’ তিনি বলেন, ‘এভাবেই চলছে স্কুলটি।’
এ রকম চিত্র পাওয়া গেছে মধুমারি ও বৈঠামারি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের। অর্থাৎ চরাঞ্চলের ২৭ বিদ্যালয়ের চিত্র একই ধরনের। এ বিষয়ে সদর উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মনিকা পারভিন বলেন, ‘চরাঞ্চলের ভিন্ন স্কুলের নতুন ভবনের একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। জমি অধিগ্রহণের সমস্যা থাকায় কোনো কোনো স্কুলের নতুন ভবন করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে চরাঞ্চলের স্কুলগুলোতে শিক্ষকরা যেতে আপত্তি করেন। এর পরেও শিক্ষার মান বাড়াতে প্রচেষ্টার কমতি নেই।’