রাজু আহমেদ, রাজশাহী
প্রকাশ : ৩০ জানুয়ারি ২০২৫ ১০:২৬ এএম
রাজশাহীতে অবাধে চলছে পাখি শিকার। প্রবা ফটো
রাজশাহীর বিভিন্ন উপজেলায় ফসলের মাঠ, জলাধারসহ বিস্তীর্ণ পদ্মার চরে অবাধে পাখি শিকার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ফাঁকা মাঠ, ফসলের ক্ষেত ও খেজুর রসের হাঁড়ির সঙ্গে অভিনব কায়দায় বিষটোপ দিয়ে চলছে পাখি শিকার। বিষটোপ খেয়ে মারা যাওয়া পাখিগুলো জবাই করে শিকারিরা বিক্রি করছেন বিভিন্ন স্থানে।
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যমতে, ধান, গম, ডালজাতীয় ফসল কাটার পর ফসলের ক্ষেতে সাদা বক, ঘুঘু, চড়ুইপাখি, ডাহুক, গো-শালিক, দোয়েল, ফিঙ্গেসহ বিভিন্ন জাতের পাখি খাবারের সন্ধানে ফসলের মাটিতে ছুটে আসে। এ ছাড়া ফসলের গায়ে লেগে থাকা কীটপতঙ্গ পাখিদের উপযোগী খাবার। পোকামাকড় ও বিভিন্ন কীটপতঙ্গ খেয়ে তারা নিজেদের জীবন রক্ষার পাশাপাশি বিনামূল্যে কৃষকের উপকার করে থাকে। তবে একশ্রেণির পাখি শিকারি ফসলের ক্ষেতে পতঙ্গের ভেতর বিষাক্ত কীটনাশক ঢুকিয়ে ছেড়ে দেয়। বিষ মাখানো সেই পোকাগুলো খেয়ে পাখিরা মাটিতে ঢলে পড়ে। এর পর পাখিগুলো ধরে কাছে রাখা ব্লেড বা ছুরি দিয়ে জবাই করে। দিনের পাশাপাশি সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চক্রটি এভাবে পাখি নিধনে ব্যস্ত থাকে।
চারঘাট উপজেলার নিমপাড়া ইউনিয়নের বাসিন্দারা জানান, এলাকার কয়েকটি সিন্ডিকেট দেদারছে বিষটোপ দিয়ে পাখি নিধন চালাচ্ছে। দিনের বেলায় এসব পাখি শিকারির দৌরাত্ম্য কম দেখা গেলেও রাতের অন্ধকারে তারা পাখি শিকার করতে বের হয়। দীর্ঘদিন ধরে বিষটোপ দিয়ে পাখি নিধন করছে অসাধু চক্র। চক্রটি ছোট ছোট মাছ ও গমের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে তা ছড়িয়ে রাখে ধান বা ফসলের ক্ষেত বা উন্মুক্ত মাঠে। সেই বিষাক্ত টোপ খাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই মৃত্যুকোলে ঢলে পড়ে অসহায় পাখিগুলো।
পাখি শিকারি সাদ্দাম, সাব্বির, খালিদসহ একাধিক শিকারির দাবি, তারা শখের বশে পাখি শিকার করেন। তাদের দেওয়া তথ্য মতে, আরও অনেকেই তাদের মতো পাখি শিকার করেন।
পাখিপ্রেমী শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘একসময় কাক, শালিক, বক, চড়ুই, দোয়েল সব সময় দেখা যেত। তাদের কিচিরমিচির ডাক কানে আসত। এখন শহরের পাশাপাশি গ্রামেও পাখির সংখ্যা কমে এসেছে, যা আমাদের সবার জন্য দুশ্চিন্তার বিষয়। ১৯৬০ সালের পর চীনে দুর্ভিক্ষের জন্য যে কয়টি অনুষঙ্গকে দায়ী করা হয়ে থাকে তার মধ্যে অন্যতম ওই সময় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ফসলের ক্ষেত থেকে পাখি নিধন।’ তিনি বলেন, ‘বন্য প্রাণী আইন অনুযায়ী, গ্রামের অনেক মানুষ এখনও জানে না যে, পাখি শিকার দণ্ডনীয় অপরাধ। তারা আশপাশের চরে দলবদ্ধ হয়ে পাখি শিকার করতে যান। এই চিত্র প্রতিবছরের। এ ছাড়া আরেকটি চক্র আছে, যারা বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে বাবুই, চড়ুই ও শালিক পাখি শিকার করে ও তা বস্তায় করে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে।’
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইমার্জেন্সি বিভাগের ইএমও ডা. শংকর কে বিশ্বাস বলেন, ‘বিষ মাখানো মাংস বা খাবার মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। এতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মৃত্যুঝুঁকি থাকে। কাজেই এ ধরনের খাবার বর্জন করাই শ্রেয়।’
কৃষি কর্মকর্তা আল মামুন হাসান বলেন, ‘ফসলের জন্য ক্ষতিকর পোকামাকড় দমনে ক্ষেতে পাখিদের বসার জন্য পাচিংয়ের পরামর্শ প্রদান করা হয়। বাঁশের কঞ্চি, গাছের ডাল বা বাঁশের জটা প্রভৃতি খাড়াভাবে জমিতে পুঁতে পাখি বসার কিংবা আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়। ওই কঞ্চিতে পাখি এসে বসে ক্ষেতের ক্ষতিকর পোকামাকড় ধরে খায়। এতে কৃষকের কীটনাশক ব্যবহার কম হয়, ফসলও ভালো হয়। তবে নির্বিচারে পাখি হত্যা হলে কৃষকের ফসলের জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।’
সামাজিক বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রফিকুজ্জামান শাহ্ বলেন, ‘পাখি শিকার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং দণ্ডনীয় অপরাধ। সামাজিক সচেতনতা ও বন বিভাগের তৎপরতায় মানুষের মাঝে এই প্রবণতা আগের চেয়ে অনেক কমে এসেছে। তার পরও কিছু দুষ্কৃতকারী পরিযায়ী পাখিসহ ফসলের জন্য উপকারী এমন অনেক পাখি নিধনের চেষ্টা করছে। তাদের ধরতে উপজেলা পর্যায়ে আমাদের ভ্রাম্যমাণ দল কাজ করছে। সঙ্গে রয়েছে পুলিশ বা নৌ-পুলিশের দল। এমন কাউকে পেলে আমরা সঙ্গে সঙ্গে আটক করে প্রচলিত আইনে মামলা দিয়ে জেলহাজতে পাঠাচ্ছি।