শাখাওয়াত হোসেন সোহান, রাজবাড়ী
প্রকাশ : ২৯ জানুয়ারি ২০২৫ ১৩:৫৮ পিএম
আপডেট : ২৯ জানুয়ারি ২০২৫ ১৫:৫৯ পিএম
সাবেক মেয়র নজরুল মন্ডল। ছবি: সংগৃহীত
সামান্য এনজিও কর্মী থেকে এখন শত কোটি টাকার মালিক রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ পৌরসভার সদ্য পদচ্যুত মেয়র ও পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. নজরুল ইসলাম মন্ডল। গড়ে তুলেছেন সম্পদের পাহাড়। চলেন রাজকীয় হালে। এ যেন পেয়েছেন আলাদিনের চেরাগ। রাতারাতি বদলে গেছে তার সব।
২০০৩ সালে পায়াক্ট নামের একটি এনজিওতে পিআর অর্গানাইজার হিসেবে মাত্র ১৫০০ টাকা বেতনে চাকরি শুরু করেন। গত ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যোগ দেন। রাতারাতি বদলে যায় তার কপাল। অল্প দিনেই গড়ে তোলেন সম্পদের পাহাড়। গোয়ালন্দ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি প্রয়াত নুরু মণ্ডলের হাত ধরেই নজরুলের উত্থান ঘটে।
নুরু মন্ডল তেমন পড়াশোনা না জানার কারণে তার অবর্তমানে যেকোনো কর্মসূচিতে কথা বলতেন নজরুল মণ্ডল। নুরু মন্ডল মারা যাওয়ার পর এলাকার পুরো নিয়ন্ত্রণ নেয় নজরুল। পরে নজরুল মন্ডল হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ায় তার স্ত্রী কাকলী নজরুল হন পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি। পরে স্ত্রীকে পদত্যাগ করিয়ে ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব নেন নজরুল। সামান্য কয়েক বছরের মধ্যেই ভাঙা ঘর পরিবর্তন হয়ে যায়। তার জরাজীর্ণ পৈতৃক বাড়ি নদীতে ভেঙে গেলে গোয়ালন্দ পৌর শহরে প্রধান সড়কের পাশে নতুন জায়গা কিনে গড়ে তুলেছেন আলিশান বাড়ি। বুলেটপ্রুপ গাড়িতে চলাচল করেন। নজরুলের বর্তমান বাড়িটির মূল্য কয়েক কোটি টাকা। তার স্ত্রীর চলাচলের জন্য ব্যবহৃত গাড়িটির দামও কোটি টাকা। নজরুলের রয়েছে ১৫০ বিঘার মতো জমি। ৫০ বিঘার ওপর রয়েছে বালুর চাতাল। পরিবার নিয়ে থাকেন ঢাকায়। মেয়র হওয়ার পর থেকে পৌরসভার সকল টেন্ডারের নিয়ন্ত্রণ করেন নজরুল নিজেই। পৌরসভায় চাকরির নামে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি টাকা। পৌরসভার কাজ নিতে হলে ১৬ পারসেন্ট কমিশন দিতে হতো। পৌরসভার বিভিন্ন কাজের জন্য জমি ক্রয় করার কথা বলে হাতিয়ে নিয়েছেন লাখ লাখ টাকা। নজরুল মন্ডলের চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে বিআইডব্লিউটিএ’র কোনো কর্মকর্তা প্রতিবাদ করলে তাকে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে হেনস্তা করাসহ বদলি করিয়ে দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। ইতোমধ্যেই তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন ফরিদপুর সমন্বিত আঞ্চলিক কার্যালয় অনুসন্ধান করে মামলা করেছে।
দৌলতদিয়া ফেরি ঘাটের নিজস্ব বাহিনী গঠন
দৌলতদিয়া ফেরি ঘাটের পরিবহন সেক্টরকে চাঁদাবাজির আখড়া বানিয়ে তোলেন নজরুল মন্ডল। ঘাটের নিয়ন্ত্রণ রাখতে নিজস্ব বলয় গড়ে তোলেন। তাদের দিয়ে ঘাটের মূল নিয়ন্ত্রণ করেন নজরুলের আপন ভাই মোস্তফা মণ্ডল। পারাপারের উদ্দেশে ঘাটে আসা পরিবহনের চালকরা নিজের হাতে ফেরির টিকিট কাটতে পারতো না। নজরুলের লোকজন টিকিট কেটে দিতো। ফলে টিকিটের নির্দিষ্ট মূল্য থেকে বেশি টাকা গুনতে হতো গাড়ি চালকদের। প্রতিদিন এ ঘাট থেকেই লাখ লাখ টাকা অবৈধভাবে আয় করে আসছিল নজরুল চক্র। এ টাকার ভাগ চলে যেত সাবেক নৌ-পরিবহন মন্ত্রী শাহজাহান খান, রাজবাড়ীর কয়েকজন প্রভাবশালী এমপি, রাজনীতিবিদ ও বিআইডব্লিউটিএ’র কর্মকর্তাদের পকেটে। এভাবেই নজরুল মণ্ডলের বাহিনীর কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার সব পরিবহন। এছাড়াও মৌসুমী ফলের গাড়ি থেকে ২ হাজার টাকা। গরুবাহী গাড়ি থেকে ৫-৬ শত টাকা। মাছের গাড়ি থেকে ২৫শত টাকা করে হাতিয়ে নেয়। দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌপথের নাব্যতা ঠিক রাখতে প্রায় সারা বছর বিআইডব্লিউটিএ’র ড্রেজিং কার্যক্রম চলে। সেখান থেকে তেল লোপাট করে নজরুলের লোকজন লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। চলাচলকারী ফেরির তেল চুরিও তার নিয়ন্ত্রণে হতো।
নজরুলের বিরুদ্ধে একাধিক হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ
২০১৪ সালে টেন্ডারবাজি নিয়ে বিরোধের জেরে গোয়ালন্দ কামরুল ইসলাম ডিগ্রি কলেজের সামনে ছাত্রলীগ নেতা জাহাঙ্গীর হোসেন খুন হন। অভিযোগ রয়েছে ওই খুন নজরুলের মদদে হয়। খুনিদের পালিয়ে যেতেও সহায়তা করেন তিনি। ২০১৯ সালের অক্টোবরে উপজেলার দেবগ্রাম ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে রেজাউল মোল্লা ওরফে আবু ডাক্তার নামে এক আওয়ামী লীগ কর্মীর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে নজরুল মন্ডল গ্রেপ্তার হয়। এ সময় তাকে উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক থেকে বহিষ্কার করা হয়। দৌলতদিয়া যৌনপল্লী নিয়ন্ত্রণ রয়েছে নজরুলের লোকজনের বিরুদ্ধে। পল্লীতে আসা সাধারণ মানুষকে অস্ত্র ধরে সর্বস্ব কেড়ে নেয় তারা। এ ধরনের বহু সন্ত্রাসী কার্যকলাপের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত নজরুল মন্ডলের লোকজন। পতিতালয়ের প্রভাবশালী বাড়িওয়ালী লিপি আত্মহত্যার মূল কারণ নজরুল মন্ডল বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে ওই সময়ে বিষয়টি ব্যাপক আলোচিত হলেও সব ম্যানেজ করে বিনা ময়না তদন্তে লাশ দাফন করে ঘটনা ধামাচাপা দেয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অন্তত ২০টি হত্যার হদিস মেলেনি
গত কয়েক বছরে দৌলতদিয়া ফেরি ঘাট সহ উপজেলা এলাকায় অন্তত ২০টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এরমধ্যে বেশিরভাগ হত্যাকান্ডেরই কোনো প্রমাণ মেলেনি। এখানে মাদক কারবারিসহ বিভিন্ন কাজে আসা অনেক ব্যবসায়ীকে তাদের টাকা মালামাল রেখে মেরে ফেলা হয়েছে। কিছুদিন পরে অনেকের লাশ পদ্মা নদীতে পাওয়া গেছে। তবে কে বা কারা এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে তার কোনো হদিস মেলেনি আজ পর্যন্ত। এসব হত্যাকাণ্ডের সঙ্গেও প্রভাবশালী চক্রগুলোর হাত থাকতে পারে বলে স্থানীয়দের ধারণা।
দৌলতদিয়া পোড়াভিটা ও যৌনপল্লীর মাদক নিয়ন্ত্রণ
দেশের সর্ববৃহৎ যৌনপল্লীতে অন্তত ৪ হাজার যৌনকর্মীর বসবাস। পাশেই মাদকের হাটখ্যাত পোড়াভিটা। এখানে প্রকাশ্যে লাখ লাখ টাকার মাদক সেবন, বিক্রি চলে। অভিযোগ রয়েছে নজরুল মন্ডল ও তার লোকজন এসব মাদকস্পট নিয়ন্ত্রণ করে। এখান থেকে প্রতি মাসে মোটা অংকের ভাগ পান তিনি।
আওয়ামী লীগের পদ বাগাতে কৌশল
নজরুল মন্ডল উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক থেকে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তারের পর বহিষ্কার হয়। জেলে থাকা অবস্থায় গোয়ালন্দ পৌর আওয়ামী লীগের সম্মেলন। তাকে পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি করার প্রস্তাব জেলা আওয়ামী লীগ থেকে দেওয়া হয়। কিন্তু যুবলীগ থেকে বহিষ্কারের কারণে তখন সেটা আর করা যায়নি। এর পরিবর্তে জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা নজরুল মন্ডলের স্ত্রী কাকলী নজরুলকে সভাপতি হিসেবে মনোনীত করেন। যদিও এ পদ পাওয়ার আগে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে তেমন সম্পৃক্ততা ছিল না কাকলী মণ্ডলের। স্ত্রী সভাপতি হওয়ার পর ওই হত্যা মামলায় জেল থেকে জামিনে বের হন নজরুল মন্ডল। পরে পৌর আওয়ামী লীগের ১নম্বর সহ-সভাপতি পদে বসানো হয় নজরুলকে। কিছুদিন যেতে না যেতেই তার স্ত্রী কাকলী মন্ডল সভাপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এরপর থেকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পান নজরুল মন্ডল। এরপর থেকেই আর তাকে পেছনে তাকাতে হয়নি।
দৌলতদিয়া ঘাটের নিয়ন্ত্রণ রাখতে আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে সখ্যতা
দৌলতদিয়া ঘাটের নিয়ন্ত্রণসহ চাঁদাবাজি এবং রাজনীতিতে তার প্রভাব ঠিক রাখতে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের বাসায় নিয়মিত পাঠাতেন পদ্মা নদীর বড় বড় মাছ। ঘাট দিয়ে গেলেই ফুলের ডালা আর বড় মাছ নিয়ে দাড়িয়ে থাকতেন। এ ভাবেই প্রভাবশালী নেতাদের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলে তার কাজ বাগিয়ে নেন।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থীদের ওপর নজরুল মন্ডলের নেতৃত্বে হামলা চালানো হয়। ওই সময়ে কেউ তার প্রতিবাদ করতে পারেনি।
গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশত্যাগের পর নজরুল মন্ডল গা ঢাকা দেয়। পরে মেয়র পদ চলে যাওয়ার পর আর তার দেখা মেলেনি। পরিবার পরিজন নিয়ে আত্মগোপনে।
এ বিষয়ে জানতে নজরুল মন্ডলের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।