প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৯ জানুয়ারি ২০২৫ ০৮:৪৯ এএম
আপডেট : ২৯ জানুয়ারি ২০২৫ ০৮:৫৪ এএম
রেলওয়ের রানিং স্টাফদের কর্মবিরতির কারণে মঙ্গলবার সারা দেশে ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল। ট্রেনের টিকিটধারী যাত্রীদের গন্তব্যে নিয়ে যায় বিআরটিসির বাস। বাসে ট্রেনের টিকিট প্রদর্শন করছেন যাত্রীরা। প্রবা ফটো
মূল বেতনের সঙ্গে রানিং অ্যালাউন্স যোগ করে পেনশন ও আনুতোষিক সুবিধার দাবিতে বাংলাদেশ রেলওয়ের রানিং স্টাফদের কর্মবিরতিতে গত সোমবার রাত ১২টা থেকে সারা দেশে ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। পরদিন গতকাল মঙ্গলবার দিনভর নানা উদ্যোগ, বৈঠকেও রেলকর্মীদের দাবি-দাওয়ার বিষয়ে সমঝোতা হয়নি। ফলে সচল হয়নি বন্ধ থাকা ট্রেনের চাকা। একই সঙ্গে দীর্ঘায়িত হয়েছে যাত্রীসাধারণের ভোগান্তি।
বরাবরের মতো বেতন, ওভারটাইম, পেনশনসহ সব ধরনের সুবিধার দাবিতে রেলওয়ের রানিং স্টাফরা গত ২২ জানুয়ারি সংবাদ সম্মেলন করে আন্দোলন কর্মসূচির ডাক দেন। সে অনুযায়ী গত সোমবার রাত থেকে সারা দেশে ট্রেন পরিচালনা কার্যক্রম বন্ধ করে কর্মবিরতি শুরু করেন তারা।
সমস্যা সমাধানে গতকাল দিনভর যোগাযোগ উপদেষ্টা, রেল সচিব ও রেলওয়ের কর্মকর্তা এবং শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে কয়েক দফায় আন্দোলনকারীদের বৈঠক চলে। কিন্তু সমঝোতা হয়নি। ফলে সারা দেশে ট্রেন যোগাযোগব্যবস্থায় তৈরি হওয়া অচলাবস্থারও অবসান হয়নি। এজন্য আন্দোলকারীরা ও রেল কর্তৃপক্ষ পরস্পরকে দোষারোপ করছে।
রানিং স্টাফরা গত সোমবার রাত ১২টা থেকে ট্রেন পরিচালনা বন্ধ রেখে ধর্মঘট শুরু করার পর গতকাল সকালে কমলাপুর রেলস্টেশনে যান যোগাযোগ উপদেষ্টা ফাওজুল কবির। এ সময় রেল সচিবসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তার সঙ্গে ছিলেন।
উপদেষ্টা সেখানে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি যাত্রী ভোগান্তির কথা উল্লেখ করে কর্মবিরতি কর্মসূচি প্রত্যাহার করে রেলকর্মীদের আলোচনায় বসার আহ্বান জানান।
যোগাযোগ উপদেষ্টার পর কমলাপুর রেলস্টেশনে যান বিএনপিপন্থি শ্রমিক নেতারা। সে সময় বিএনপি নেতা শিমুল বিশ্বাসও আন্দোলকারীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে রেল সচিবসহ রেলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও ছিলেন। তবে ওই বৈঠকেও সমস্যার কোনো সুরাহা হয়নি। আন্দোলনকারী রানিং স্টাফরা অবস্থানে অনড় থেকে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সমস্যা সমাধানে রেল ভবনেও রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দফায় দফায় বৈঠক করেন। কর্মকর্তারাও কয়েক দফায় বৈঠক করেন। তবে রাত ৯টায় এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো সমাধান আসেনি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, গতকাল সকাল থেকেই রেল পরিচালনা বন্ধ রেখে কমলাপুর স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে অবস্থান নেন রানিং স্টাফরা। সকাল থেকে সিডিউল অনুযায়ী কোনো ট্রেন কমলাপুর ছেড়ে যায়নি। অনলাইনে যেসব যাত্রী টিকিট নিয়েছিল, তাদের টিকিটের টাকা ফেরত দেওয়া হয়। ট্রেন বন্ধ থাকায় কমলাপুরসহ দেশের অন্যান্য স্টেশন থেকে টিকিট বিক্রিও বন্ধ ছিল। সকাল থেকেই যাত্রীরা দেশের প্রধান এই রেলস্টেশনে ভিড় করে। কিন্তু তাদের হতাশ হয়ে ফিরে যেতে হয়। কেউ কেউ ট্রেন চালু হওয়ার আশা নিয়ে দীর্ঘসময় স্টেশনে অপেক্ষা করে। বিকল্প ব্যবস্থায় বাসসহ অন্যভাবে গন্তব্যে রওনা হতেও দেখা যায় অনেককে।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব ফাহিমুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের আলোচনার দুয়ার খোলা আছে। তারা এলে আলোচনার ভিত্তিতে যেকোনো সময় ট্রেন চলাচল শুরু হতে পারে।’
রানিং স্টাফ ঐক্য পরিষদের ঢাকা বিভাগের আহ্বায়ক সাইদুর রহমান বলেন, ‘আমরা সকাল থেকে বেলা আড়াইটা পর্যন্ত কমলাপুর স্টেশনে রেল সচিব ও মহাপরিচালকের সঙ্গে বৈঠক করেছি। তবে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছা সম্ভব না হওয়ায় বৈঠক চলমান অবস্থায়ই আমি চলে আসি। বিকালে রেল ভবনে আলোচনা হয়েছে। সেখানেও কোনো ধরনের সমাধান হয়নি। কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আমরা আলোচনা করব। তবে আমরা আমাদের কর্মবিরতিতে অনড় রয়েছি।’
তিনি বলেন, ‘অর্থ মন্ত্রণালয় ও রেলপথ মন্ত্রণালয়ের দুই সচিব মিলে যদি সিদ্ধান্ত দেন যে আগামী সাত দিনের মধ্যে রানিং স্টাফদের দাবির সুরাহা করা হবে, তাহলে তারা কর্মবিরতি প্রত্যাহার করে কাজে ফিরে যাবেন। দাবি-দাওয়া নিয়ে এ পর্যন্ত্র রেলপথ মন্ত্রণালয়কে ৯৪টি চিঠি দেওয়া হয়েছে। ১৭ বার বৈঠক করা হয়েছে। কিন্তু সংকট নিরসন হয়নি।’
বৈঠকে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
কর্মবিরতির কারণে ট্রেন যোগাযোগে সৃষ্ট অচলাবস্থা নিরসনে গতকাল দুপুরে আন্দোলনকারী রানিং স্টাফদের সঙ্গে বৈঠক করেন বিএনপি নেতা ও শ্রমিক সংগঠনের নেতৃত্ব দেওয়া শিমুল বিশ্বাস। ওই বৈঠকে বিএনপিপন্থি অন্যান্য শ্রমিক নেতা এবং রেল কর্তৃপক্ষও অংশ নেয়।
রেলস্টেশনের দোতলায় একটি কক্ষে বিশেষ ওই বৈঠক থেকে বের হয়ে কমলাপুর রেলস্টেশনের ভিআইপি লাউঞ্জে ফের বৈঠকে বসেন রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম ও বিএনপি চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী ও জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সমন্বয়ক শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস। কিন্তু বৈঠকে কোনো সমাধান না হওয়ায় রানিং স্টাফরা বেরিয়ে যান। বিকালে রেল ভবনে আরেকটি বৈঠক হয়। সেখানেও সমাধানের খবর পাওয়া যায়নি।
রেল ভবনের একটি সূত্র জানায়, রেলের রানিং স্টাফদের কর্মবিরতি নিয়ে গতকাল রেল ভবনে বিশেষ বৈঠক হয়। যোগাযোগ উপদেষ্টা ফাওজুল কবির, বিএনপি নেতা শিমুল বিশ্বাস, রেল মন্ত্রণালয়ের সচিব, অতিরিক্ত সচিব, ভারপ্রাপ্ত মহারিচালক ও আন্দোলনরত রানিং স্টাফদের প্রতিনিধিরা এই বৈঠকে অংশ নেন।
বৈঠকের আলোচনা অনুযায়ী রানিং স্টাফদের দাবির বিষয়টি এখন আর রেল মন্ত্রণালয়ের কাছে নেই। বিষয়টি সম্পূর্ণ অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিষয়। অর্থ মন্ত্রণালয়কে আলোচনার জন্য রেল মন্ত্রণালয় অনুরোধ করবে। যদি সমাধান হয় তাহলে আজ বুধবার থেকে রেল চলাচল শুরু হবে। আর যদি না হয় ভিন্ন চিন্তা করা হবে। বৈঠক শেষ করে উপদেষ্টাসহ কর্মকর্তারা যে যার মতো চলে গেছেন।
আন্দোলনকারীরা বলছেন, তাদের দাবি যৌক্তিক। বিষয়টি এত দিন ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। রেলের বিভিন্ন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম-লুটপাটের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অথচ যারা ট্রেন পরিচালনা করেন অর্থাৎ রানিং স্টাফদের ন্যায্য সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে যত বাধা।
তাদের অভিযোগ, যৌক্তিক দাবির বিষয়টি নিয়ে রেল মন্ত্রণালয়ের আন্তরিকতার ঘাটতি ছিল। অর্থ মন্ত্রণালয় ও শ্রম মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কোনো সমন্বয় না করেই রেল মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে একাধিকবার চিঠি দেওয়ার কথা জানিয়েছে। কিন্তু তাদের ওই চিঠির কোনো ফলাফল আসেনি।
তবে রেলওয়ে সূত্র দাবি করেছে, রানিং স্টাফদের দাবির বিষয়ে রেল কর্তৃপক্ষ আন্তরিক। কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয়কে রাজি করানো যাচ্ছে না। আগামী শুক্রবার টঙ্গীতে বিশ্ব ইজতেমা শুরু হচ্ছে। প্রতিবার বিশ্ব ইজতেমা উপলক্ষে বাড়তি ট্রেন পরিচালনা করে থাকে রেলওয়ে। এবার ঠিক ইজতেমার আগে কর্মবিরতিতে গিয়ে সরকারের গণপরিবহন সেবাকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
যে কারণে ধর্মঘট
আন্দোলকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মূল বেতনের সঙ্গে রানিং অ্যালাউন্স যোগ করে পেনশন ও আনুতোষিক সুবিধা দেওয়ার বিষয়ে জটিলতা নিরসন না হওয়ায় কর্মবিরতিতে গেছেন বাংলাদেশ রেলওয়ের রানিং স্টাফরা। এই রানিং স্টাফের মধ্যে রয়েছেনÑ ট্রেনচালক, গার্ড ও টিকিট চেকারের দায়িত্বে থাকা কর্মচারীরা।
আন্দোলকারীরা বলছেন, ট্রেন পরিচালনায় যুক্ত কর্মচারীরা বাড়তি সময় কাজ করেন। তাই তাদের এক মাসের দায়িত্ব দুই মাস কিংবা এর চেয়ে বেশি সময় কাজ করেছেন ধরে বেতন হিসাব করার রীতি ব্রিটিশ আমল থেকেই। এসব কর্মচারী অবসরের পর পেতেন বাড়তি সুবিধা। বিশেষ এই সুবিধা পুরোপুরি দেওয়া না-দেওয়া নিয়ে আন্দোলনের সূচনা।
আন্দোলনকারীদের দুজন নাম প্রকাশ না করে জানান, মূল ঝামেলাটি তৈরি করেন রেলওয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা উপসচিব পদমর্যাদার আব্দুস ছালাম। ওই সময় রেলওয়ের মহাপরিচালক ছিলেন সর্দার আমজাদ হোসেন। ২০১৮ অথবা ২০১৯ সালের দিকে তিনি প্রথম মাইলেজ কমানোসহ অন্যান্য প্রাপ্য সুবিধা বাতিলের জন্য জনপ্রশাসন ও অর্থ মন্ত্রণালয়কে একটি চিঠি দেন।
বিষয়টি টের পাওয়ার পর তখন থেকে রানিং স্টাফদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করে। আগের সিস্টেম অনুযায়ী বেতনসহ অন্যান্য সুবিধা ঠিক রাখতে ২০২১ সালে একবার আন্দোলনে যান তারা। তৎকালীন রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজনের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের আলোচনার মাধ্যমে তখন কর্মবিরতি প্রত্যাহার করা হয় আগের সুবিধা ঠিক রাখার শর্তে। কিন্ত পরে রেল মন্ত্রণালয় শর্ত ভঙ্গ করে। পরে ওই প্রজ্ঞাপন বাতিল করে আগের বিধি অনুযায়ী বেতন, পেনশন, মাইলেজ এলাউন্সসহ সুবিধা পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন করেন স্টাফরা। বিষয়টি সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হলে তখন আন্দোলন স্থগিত করা হয়। কিন্তু দীর্ঘ বছরেও সংকটের সমাধান হয়নি। গত ২২ জানুয়ারি নতুন করে আন্দোলনের ডাক দেন রানিং স্টাফ ও শ্রমিক কর্মচারী অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা। গত সোমবারের কর্মবিরতি কর্মসূচিতেও সেই চিত্র দেখা গেছে। আগেরবার দাবি মেনে সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়ে তা বাস্তবায়ন না করায় এবার কর্মচারীরা দাবি আদায়ে অনড় অবস্থান নিয়েছেন।
যা বলছেন উপদেষ্টারা
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর গতকাল সকালে কমলাপুর রেলস্টেশনে যান। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘দাবি-দাওয়া পূরণ রেল বিভাগের হাতে নেই। এটা অর্থ বিভাগের হাতে। আমরা অর্থ বিভাগের কাছে এটা তুলেছি। অর্থ বিভাগ এটা অনেকাংশে পূরণ করে দিয়েছে। দরকার হলে আমরা বাকিটা নিয়েও তাদের সঙ্গে আলোচনা করব।’
কর্মবিরতি প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এটা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। তাই বলে তারা রেল চলাচল বন্ধ করতে পারে না। এতে সাধারণ মানুষ কষ্ট পাচ্ছে।’
রানিং স্টাফদের আন্দোলনের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ গতকাল সচিবালয়ে বলেন, ‘রেলের কর্মীদের ওভারটাইমের যৌক্তিক দাবি মেনে নেওয়া হয়েছে। এখন অন্য দাবি-দাওয়াগুলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় দেখবে। আমার এখানে যদি আসে এবং তাতে যৌক্তিক কিছু থাকলে অর্থ মন্ত্রণালয় মানা করবে না। মানবিক কারণে বা মানুষের চাকরির ব্যাপারে সমস্যা হলে সে বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’