কিশোরগঞ্জ
মিলাদ হোসেন অপু, ভৈরব (কিশোরগঞ্জ)
প্রকাশ : ২৭ জানুয়ারি ২০২৫ ১১:২৪ এএম
সড়ক না থাকায় কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার আগানগর ইউনিয়নের শ্যামপুর গ্রাম বিচ্ছিন্ন জনপদে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি তোলা। প্রবা ফটো
কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার আগানগর ইউনিয়নের শ্যামপুর গ্রামটিতে উন্নয়নের কোনো আলো পড়েনি। বর্ষায় গ্রামটিতে আসা-যাওয়ার একমাত্র ভরসা নৌকা। শুকনো মৌসুমে ক্ষেতের কিনার ধরে চলতে হয়। দেশের প্রত্যন্ত গ্রামে পাকা সড়ক তৈরি হয়েছে। কিন্তু শ্যামপুর গ্রামে নেই একটি কাঁচা রাস্তা।
বর্ষায় গ্রামটির চারপাশে পানি থই থই করে। দূর থেকে দেখলে মনে হবেÑ নদীর ওপর ভাসছে একটি গ্রাম। এ গ্রামের লোকজন বছরে ৬ মাস থাকে পানিবন্দি ও বাকি ৬ মাস থাকে শুকনায়। এভাবেই চলছে উপজেলার শ্যামপুর গ্রামবাসীর জীবন। এখানকার মানুষের মূল পেশা মাছ শিকার। এই পেশা আঁকড়ে ধরে তারা বেঁচে আছে।
শুকনো মৌসুম শুরু হলে কিছু লোক নিজের জমিতে চাষাবাদ করে। অন্যরা কৃষিশ্রমিকের কাজ করে। অল্পতেই তারা তুষ্ট থাকে। তেমন কোনো চাহিদা নেই। তবে যোগাযোগ অবকাঠামো গড়ে না ওঠায় তারা নানান অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার। চলাচলের এজ্য একটি কাঁচা-পাকা রাস্তাও নেই। ২০০ বছর পুরোনো এই গ্রামে দুই হাজার মানুষ বাস করে। কাঁচা-পাকা রাস্তা না থাকায় দুর্ভোগ তাদের নিত্যসঙ্গী।

স্থানীয়রা জানায়, প্রায় ২০০ বছর আগে মেঘনা নদীতে ছোট্ট একটি চর জেগে ওঠে। ওই চরে শ্যাম বাবু নামে এক জেলেসহ সাতজন মিলে ছন, পাটখড়ি আর বাঁশ দিয়ে কয়েকটি ঘর বানিয়ে বসবাস শুরু করে। রোদ-বৃষ্টি-ঝড়-তুফান মাথায় নিয়েই শুরু হয় সাতটি পরিবারের বসবাস।
শ্যামপুর গ্রামটির দৈর্ঘ্য প্রায় আধা কিলোমিটার। প্রায় দুই হাজার মানুষের আবাসস্থল এটি। এখানে টিনের ঘর ছাড়াও একাধিক পাকা ভবন আছে। এলাকায় ভোটার সংখ্যা প্রায় ৬০০। একটি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও একটি মসজিদ আছে। ২ শতাধিক ছাত্র-ছাত্রী মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে লেখাপড়া করছে। প্রবাসে আছে শতাধিক পরিবারের সদস্য। বর্তমানে গ্রামটিতে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগতে শুরু করেছে। তবে একটি রাস্তার অভাব দূর হচ্ছে না।
রাস্তার জন্য গ্রামবাসী সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে আবেদনও করেছে। রাস্তার আকুতি নিয়ে বেশ কয়েকবার তারা সরকারি দপ্তরে ধরনা দিয়েছে। এখন পর্যন্ত সাড়া মেলেনি।
জনপ্রতিনিধিরা অবশ্য রাস্তা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি সব সময় দিয়ে থাকেন। কিন্তু পরে বিষয়টি তারা আর মনে রাখেন না। বর্ষা মৌসুমে ভৈরব বাজার, স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, ইউনিয়ন পরিষদসহ পাশের গ্রামে যেতে নৌকাই সম্বল। আর শুকনো মৌসুমে জমির কিনার ধরে পায়ে হেঁটে চলতে হয়। নারীরা বাড়ি থেকে যখন কোথাও যায়, শিশুসন্তানকে কোলে জড়িয়ে হাঁটতে হয়। ২-৩ কিলো পথ নারীরা এভাবে হেঁটে যায়। বয়স্কদের ক্ষেত্রে বেশি কষ্টকর হয়ে পড়ে।
শ্যামপুর গ্রামের মানুষ অসুস্থ স্বজনদের নিয়ে বর্ষা ও শুকনো দুই মৌসুমেই বিপদাপন্ন অবস্থায় থাকে। গর্ভবতী নারী, শিশু ও বয়স্ক রোগীদের নিয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় পড়তে হয়। বিশেষ করে, গুরুতর রোগী নিয়ে যথাসময়ে হাসপাতালে পৌঁছানোটাই কঠিন হয়ে পড়ে।
দুর্দশাগ্রস্ত গ্রামটির মানুষদের আশপাশের গ্রামের মানুষজন সামাজিকভাবে এড়িয়ে চলে। এ গ্রামের ছেলেমেয়েদের বিয়ে করতে চায় না অন্য গ্রামের ছেলেমেয়েরা। এ কারণে অভিভাবকরা ছেলেমেয়েদের বিয়ে নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত থাকেন।
সীমা, মীম, রোকসানা, রাকিব, মোবারকসহ কয়েকজন শিক্ষার্থী বলে, আমাদের মতো কোনো শিক্ষার্থীই এত কষ্ট করে না। বর্ষাকালে নৌকায় পার হয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে হয়। হঠাৎ ঝোড়ো বাতাসে নৌকাডুবির ঘটনাও ঘটেছে। ভয়ে ভয়ে এ সময়টা নৌকাযোগে যেতে হয়। আসতে হয়।
শুকনো মৌসুমে জমির কিনার ধরে চলতে গিয়ে কাদামাটি পায়ে জড়িয়ে যায়। এসব অসুবিধা থাকায় অনেক শিক্ষার্থী মাঝপথেই লেখাপড়া ছেড়ে দিয়েছে।
নাছির মিয়া বলেন, ‘মেঘনা নদীর পশ্চিমপাড়ে শ্যামপুর গ্রাম। রোগী নিয়ে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। রাস্তা থাকলে এটা হতো না। গ্রাম থেকে হাসপাতালে যাওয়া মানে হিমালয় অতিক্রম করার মতো অবস্থা দাঁড়ায়। এতে রোগীকে হাসপাতালে নেওয়ার পথে আরও বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ে। মাঝপথেই রোগী মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটে।’
শ্যামপুর গ্রামে কোনো কাঁচা-পাকা রাস্তা নেই, এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে উপজেলা প্রকৌশলী ইশতিয়াক আহমেদ বলেন, ‘আমি এখানে নতুন যোগ দিয়েছি। নবীপুর থেকে শ্যামপুরে রাস্তার বিষয়ে আমি জানতে পেরেছি। বর্তমানে রাস্তাটি এলজিইডির আওতাভুক্ত নয়। আওতাভুক্ত করতে আবেদন জানানো হয়েছে। আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে রাস্তাটি যাতে হয়।’