কক্সবাজার অফিস
প্রকাশ : ২৬ জানুয়ারি ২০২৫ ২১:৫৯ পিএম
সামুদ্রিক কচ্ছপের প্রজনন মৌসুমে আবারও একের পর এক মৃত কচ্ছপের দেখা মিলছে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টসহ উপকূল এলাকায়। তবে গত বছরের তুলনায় এবার মৃতের সংখ্যা অস্বাভাবিক বেশি।
বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউটের দেওয়া তথ্য বলছে, কক্সবাজারের সমুদ্র উপকূলে গত দুই দিনে (শনি ও রবিবার) ভেসে এসেছে ৬৮টি মৃত কচ্ছপ। এর আগে গত ৪ জানুয়ারি থেকে ২২ জানুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন পয়েন্টে ভেসে এসেছে আরও ১৪টি মৃত কচ্ছপ। গত ২৪ দিনের মোট ৮৪টি মৃত কচ্ছপ ভেসে আসার তথ্য দিয়েছে সংস্থাটি।
গত বছর জানুয়ারি থেকে ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কক্সবাজার সমুদ্র উপকূলের বিভিন্ন পয়েন্টে ২৯টি মৃত কচ্ছপ পাওয়া গিয়েছিল। এ সময়ের মধ্যে ৩টি মৃত ডলফিন, ১টি মৃত পরপইসও ভেসে এসেছিল।
রবিবার (২৬ জানুয়ারি) বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বোরি) বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শিমুল ২৪ দিনে ৮৪টি মৃত কচ্ছপ ভেসে আসার তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
তিনি জানিয়েছেন, সম্প্রতি কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের বিভিন্ন এলাকায় কিছুসংখ্যক কচ্ছপের মৃতদেহ পড়ে থাকার খবর দেয় স্থানীয়রা। এ তথ্যের ভিত্তিতে বোরির একটি গবেষক দল গত শনিবার সকাল থেকে সমুদ্রসৈকতের বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন শুরু করে। শনিবার প্রথম দিনে টেকনাফের সাবরাং জিরো পয়েন্ট থেকে উখিয়া উপজেলার রূপপতি এলাকা পর্যন্ত ১২টি কচ্ছপের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। গতকাল দ্বিতীয় দিনে রূপপতি থেকে সোনারপাড়া পর্যন্ত ৪৯টি এবং পেঁচারদ্বীপ থেকে হিমছড়ি পর্যন্ত ৭টি কচ্ছপের মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে।
বোরির এই বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা বলেন, মৃত উদ্ধার সবগুলো কচ্ছপই অলিভ রিডলি প্রজাতির। এগুলোর মধ্যে পুরুষ ও স্ত্রী কচ্ছপও রয়েছে। উদ্ধার করা কচ্ছপগুলোর মধ্যে কিছুসংখ্যক এক থেকে দুই দিন, কিছু সাত থেকে ১৫ দিন বা তারও আগে মারা গেছে। কিছুসংখ্যকের শুধু কংকাল পাওয়া গেছে।
বোরি থেকে পাওয়া তথ্য মতে, গত ৪ জানুয়ারি সোনারপাড়া সৈকতে ১টি, ৫ জানুয়ারি কক্সবাজার উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় ১০টি, ১০ জানুয়ারি দরিয়ানগর সৈকতে ১টি, ১৮ জানুয়ারি সোনারপাড়া সৈকতে ২টি ও ইনানি সৈকতে ১টি, ২২ জানুয়ারি সেন্টমার্টিন সৈকতে ১টি মৃত কাছিম ভেসে আসে।
কী কারণে মৃত্যু হয়েছে তা নিশ্চিত করতে না পারলেও স্থানীয়দের তথ্যের বরাতে শিমুল ভূঁইয়া বলেন, নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত সামুদ্রিক কচ্ছপের প্রজনন মৌসুম। এ সময় বিশেষ করে কচ্ছপ উপকূলে ডিম দিতে আসে। কচ্ছপগুলোর জেলেদের জালে আটকে, সমুদ্রে চলাচলকারী বড় নৌযানের ধাক্কায় এবং উপকূলে ডিম পাড়তে এসে কুকুরের আক্রমণে মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। তবে তদন্তের পর কচ্ছপগুলোর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা সম্ভব হবে।
মৃত কচ্ছপগুলো উদ্ধারস্থলের আশপাশে বালিচাপা দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
প্রকৃতি ও পরিবেশ বিষয়ক সংস্থা নেচার কনজারভেশন ম্যানেজমেন্ট (নেকম) বলছে, সামুদ্রিক মা কচ্ছপ এখন মহাবিপদে রয়েছে। ২০০৩ সালে সংস্থাটির এক জরিপে দেখা গেছে, কক্সবাজার উপকূলের ৫২ পয়েন্টে সামুদ্রিক মা কচ্ছপ ডিম দিতে আসত। ওই সময় এসব পয়েন্ট মা কচ্ছপের কাছে অত্যন্ত নিরাপদ ছিল।
সংস্থাটির উপ-প্রকল্প পরিচালক ড. শফিকুর রহমান জানান, মা কচ্ছপের ডিম দেওয়ার সময় সাধারণত নভেম্বর থেকে শুরু, যা এপ্রিল-মে পর্যন্ত চলে। তারা রাতের বেলায় নির্জন উপকূলে এসে গর্ত তৈরি করে ডিম দেয়। সাধারণত একটি মা কচ্ছপ ৩০টি পর্যন্ত ডিম দেয়। ডিম দেওয়া শেষ করে তা মাটি, বালি বা অন্য কোনো জৈব পদার্থ দিয়ে ঢেকে দেয়। এরপর মা কচ্ছপ ফিরে যায় সাগরে। ৬০ থেকে ৭০ দিনের মধ্যে প্রাকৃতিকভাবে ডিম থেকে বাচ্চা জন্ম নেয়। এরপর বাচ্চাগুলো গর্ত থেকে বের হয়ে ফিরে যায় সাগরে।
এটা প্রকৃতিগতভাবে হয়ে আসত বলে মন্তব্য করে শফিকুর রহমান বলেন, ১০ বছর আগে ৫২ পয়েন্টে মা কচ্ছপ ডিম দিতে এলেও বর্তমানে কমে ৩৪ পয়েন্টে এসে দাঁড়িয়েছে। মহেশখালীর সোনাদিয়া থেকে শুরু করে সেন্টমার্টিন দ্বীপ পর্যন্ত সৈকতের নির্জন এলাকায় এসব কচ্ছপ ডিম দিত। সমুদ্রপাড়ে ডিম দিতে এসে পুনরায় গভীর সাগরে ফিরে যাওয়ার পরিবেশ এখন যেন আর নেই। ডিম দিতে এসে প্রতিনিয়ত মারা যাচ্ছে মা কচ্ছপ।
নেচার কনজারভেশন ম্যানেজমেন্টের প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু পরিবর্তন ব্যবস্থাপক আবদুল কাইয়ুম বলেন, নির্জন সৈকতে কচ্ছপ ডিম দিতে আসে। নানা কারণে ডিম দেওয়ার স্থানগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অপরিকল্পিত অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি কক্সবাজার সৈকতে আলোকায়ন, সমুদ্রে পরিত্যক্ত জাল ফেলা, ডিম ছাড়ার মৌসুমে বিচে ডাইভিং, খেলাধুলা, সৈকতে হাঁটা ইত্যাদি কচ্ছপের ডিম দেওয়ার পরিবেশ নষ্ট করেছে। ফলে ক্রমাগত কচ্ছপের ডিম দেওয়ার স্থান কমছে।
তিনি আরও বলেন, মা কচ্ছপগুলো ডিম দিতে সমুদ্র থেকে উপকূলে আসা-যাওয়ার পরিবেশও নষ্ট হচ্ছে সৈকতে পুঁতে রাখা মাছ ধরার অবৈধ কারেন্ট জালের কারণে। গভীর সাগরে ট্রলিং জালে আটকা পড়েও মারা যাচ্ছে মা কচ্ছপ। ডিম পাড়তে উঠলেই মা কচ্ছপের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে সংঘবদ্ধ কুকুর, ডিমগুলো খেয়েও ফেলা হচ্ছে। ফলে মা কচ্ছপ মহাবিপদে পড়েছে।
পরিবেশ বিষয়ক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এনভায়রনমেন্ট পিপলের প্রধান নির্বাহী রাশেদুল মজিদ বলেন, প্রতিবছর প্রজনন মৌসুমে মৃত কচ্ছপ পাওয়া যাচ্ছে। এসব কচ্ছপের শরীরে আঘাতের চিহ্ন থাকে। সাগরে পুঁতে রাখা মাছ ধরার জালে আটকা পড়লে জেলেরা লাঠিসোটা দিয়ে পিটিয়ে কিংবা ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে কচ্ছপকে হত্যা করে সমুদ্রে নিক্ষেপ করে। জেলেদের সচেতন করা, ডিম দেওয়ার স্থানটি নিরাপদ করা এবং সৈকতে কুকুরের বিচরণ রোধ করা জরুরি।