দাঁতমারা রাবার বাগান
ওবাইদুল আকবর রুবেল, ফটিকছড়ি (চট্টগ্রাম)
প্রকাশ : ২৬ জানুয়ারি ২০২৫ ২১:৫৫ পিএম
আপডেট : ২৬ জানুয়ারি ২০২৫ ২২:০৮ পিএম
চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে লাইন পরিষ্কারের নামে বাগানে আগুন দেয় দাঁতমারা রাবার বাগান কর্তৃপক্ষ। শনিবার বিকালে দাঁতমারা ইসলামপুর এলাকা। প্রবা ফটো
আগুনে পুড়ছে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার দাঁতমারা ইউনিয়নের দাঁতমারা রাবার বাগান। আগুনের তাপে উৎপাদন ক্ষমতা হারাচ্ছে রাবার গাছ। মরছে নানা প্রজাতির কীটপতঙ্গ ও বন্যপ্রাণী। ব্যাপক হুমকির মুখে পড়েছে পরিবেশ-প্রতিবেশ। প্রতিবছর শুষ্ক মৌসুমে ‘লাইন পরিষ্কার’ করার নামে বাগানে আগুন ধরিয়ে দেয় কর্তৃপক্ষসহ দুর্বৃত্তরা। মূলত বাগান পরিষ্কারের বরাদ্দের টাকা আত্মসাৎ করতেই এমন ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম চালাচ্ছে তারা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাড়ে চার হাজার একরের বিশাল বাগানটি পরিচালনা করছে বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফআইডিসি)। শনিবার (২৫ জানুয়ারি) বিকালে দাঁতমারা রাবার বাগানে সারি সারি গাছে আগুন জ্বলতে দেখা যায়। আগুনে বিপন্ন হচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণী ও কীটপতঙ্গ। এ সময় আবুল কালাম নামে বাগানের এক কর্মচারী আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু আগুনের তাপ এবং লেলিহান শিখা অতিরিক্ত হওয়ায় তার একার পক্ষে তা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছিল না।
স্থানীয়রা জানায়, রাবার বাগান এলাকায় বিভিন্ন ধরনের পাখি, বিরল প্রজাতির কাঠবিড়ালি, বানর, খরগোশ, বনমোরগ, বেজি, খ্যাঁকশিয়াল, টিয়া, ময়না, ঘুঘু, শালিক, বক, বাবুইসহ বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীর বসবাস। বাগান কর্তৃপক্ষ প্রতি বছরই বাগান সম্প্রসারণ করতে এবং টিলা পরিষ্কার করতে আগুন ধরিয়ে দেয়। আবার একশ্রেণির স্থানীয় দুর্বৃত্ত এসে পাতার স্তূপে আগুন লাগায়। আগুনে বনে থাকা পোকামাকড়, কীটপতঙ্গ পুড়ে যায়। স্থায়ী বাসস্থান হারিয়ে বন্য প্রাণীরা লোকালয়ে এসেও হত্যার শিকার হয়। প্রতিবছর ফাল্গুন-চৈত্র মাসে এ আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে।
বাগানে কর্মরত একাধিক টেপার (শ্রমিক) জানান, প্রতিবছর জুন-জুলাই মাসে বাগানের জঙ্গল পরিষ্কার করার জন্য প্রতি একরে ৩২০ টাকা বরাদ্দ দেয় বিএফআইডিসি। কিন্তু বাগানের শ্রমিক নেতাসহ কর্মকর্তারা এসব বরাদ্দ ভাগবাটোয়ারা করে লুটেপুটে খায়। এরপর স্বেচ্ছাশ্রমে জঙ্গল পরিষ্কারের জন্য টেপিং শ্রমিকদেরকে চাপ প্রয়োগ করে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক টেপিং শ্রমিক জানান, কর্তৃপক্ষের চাপে পড়ে কোনো শ্রমিক জঙ্গল কাটলেও বেশিরভাগ থেকে যায়। এরপর শুষ্ক মৌসুম তথা ডিসেম্বর, জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি মাসে বাগানের ব্লকগুলোতে আগুন লাগিয়ে পরিষ্কার করা হয়। আগুনের তাপে উৎপাদন ক্ষমতা হারাচ্ছে রাবার গাছ। বিপন্ন হচ্ছে নানা প্রজাতির কীটপতঙ্গ।
শুধু দাঁতমারা রাবার বাগান কর্তৃপক্ষ নয়, এভাবে শুষ্ক মৌসুমে ‘লাইন পরিষ্কার’ নামে কাঞ্চননগর, রাঙ্গামাটিয়া, তাঁরাখোসহ বিভিন্ন রাবার বাগান কর্তৃপক্ষ এবং দুর্বৃত্তদের দেওয়া আগুনে পুড়ে বিপন্ন হচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির বন্য প্রাণী ও কীটপতঙ্গ। পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০১০ সালে এসব রাবার বাগানে আগুন লাগানোর বিষয়টিকে জীববৈচিত্র্যের জন্য সংকটাপন্ন বলে চিহ্নিত করা হয়েছিল। জীববৈচিত্র্য নিধন বন্ধে এ ধরনের কর্মকাণ্ড সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে একটি চক্র নির্বিচারে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে।
চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক কলেজের জীববিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বলেন, বাগানে আগুন দিয়ে ঝরেপড়া পাতা পোড়ানোর ফলে পরিবেশের ও জীববৈচিত্র্যের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে। পাতা পোড়ানোর সময় কার্বন মনোক্সাইড, কার্বন ডাই-অক্সাইড এবং অন্যান্য ক্ষতিকর গ্যাস নির্গত হয়, যা বায়ুকে দূষিত করে জলবায়ু পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যের বিভিন্ন সমস্যা যেমন- শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, ফুসফুসের সংক্রমণ ইত্যাদি হতে পারে।
তিনি বিারও বলেন, পাতার পোড়ানোর ফলে যে তাপ উৎপন্ন হয়, তা মাটির ওপরের স্তরের পুষ্টিগুণ নষ্ট করে। ফলে মাটির উর্বরতা কমে যায় এবং ছোট ছোট কীটপতঙ্গ, মাটির উপকারী অণুজীব এবং ক্ষুদ্র প্রাণীর আশ্রয়স্থল ধ্বংস, এমনকি আশপাশে থাকা ছোট প্রাণী মারা যেতে পারে। যা খাদ্যজাল ও বাস্তুতন্ত্রে সরাসরি প্রভাব ফেলে।
লাইন পরিষ্কারের নামে রাবার বাগানে আগুন দেওয়ার কথা স্বীকার করে কর্তৃপক্ষও। দাঁতমারা রাবার বাগানের ডিজিএম রুহুল আমিন বলেন, অনেক স্থানে লাইন পরিষ্কার করতে নিজেরাই আগুন লাগাই। আবার আমরাই প্রতিরোধ করি। বন্য প্রাণী, কীটপতঙ্গ নষ্ট হওয়ার বিষয়টি দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি ‘খতিয়ে দেখবেন’ বলে জানান।
পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপপরিচালক মো. মোজাহিদুর রহমান বলেন, বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অধীনে থেকে এসব বাগানে এ ধরনের কাজ করতে পারে না। সেখানে শিগগিরই অভিযান চালানো হবে।’