× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

মৃত বাবার ঋণের দায়ে ৩ শিশু আসামি, মা জেল হাজতে

বোয়ালমারী (ফরিদপুর) প্রতিবেদক

প্রকাশ : ২৬ জানুয়ারি ২০২৫ ১৭:৩৬ পিএম

আপডেট : ২৬ জানুয়ারি ২০২৫ ১৭:৩৭ পিএম

সংবাদ সম্মেলনে তিন শিশু এবং তাদের স্বজনরা। প্রবা পটো

সংবাদ সম্মেলনে তিন শিশু এবং তাদের স্বজনরা। প্রবা পটো

জান্নাতুল নাঈমা আর আহমদুল্লাহ ‍দুই সহোদর ভাই-বোন। বয়সই বা কত তাদের? চার আর পাঁচ বছর! যে বয়সে শিশুরা মা-বাবার কোলে থাকার কথা তারা আজ সাংবাদিকদের মুখোমুখি। বাবা নামক বটগাছটা যখন আর নাই, তখন পৃথিবীর দুষ্টচক্রের মাঝেই পড়ে গেল এই অবুঝ শিশুরা। বাবার রেখে যাওয়া ঋণের বোঝা এসে চেপে বসল তাদের কপালে। সংবাদ সম্মেলনে তাদের সাথে ছিল বড় বোন আইরিন। নাঈমা আর আহমদুল্লাহ ‍দুজনই সংবাদ সম্মেলনে বড় বোন আইরিনকে জড়িয়ে ধরেছিল। আইরিনের বয়সও সবেমাত্র দশ।

ঘটনাটি ফরিদপুরের বোয়ালমারী পৌর সদরের পোল্ট্রি মুরগী ব্যবসায়ী মৃত আমিন শেখ ও পপি খাতুন দম্পতির শিশু তিন সন্তান আইরিন, আহমাদুল্লাহ আর জানাতুন নাঈমার।

দুই বছর আগে বাবার মৃত্যুর পর মায়ের আশ্রয়ে থাকলেও মা এখন জেলে। তাই বড় বোন আইরিনই অবুঝ শিশু নাঈমা আর আহমাদুল্লাহর একমাত্র ভরসা। এখন সে ই তাদের মা-বাবা।

অপ্রাপ্তবয়সস্ক এতিম এই তিন শিশু তাদের বাবার ঋণের কারণে ব্র্যাক ব্যাংকের দায়ের করা ঋণের মামলার আসামী। পিতার মৃত্যুর শোক মা পপি খাতুন বুঝতে না দিলেও স্বামীর মৃত্যুর দুই বছর পর স্বামীর ব্র্যাক ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ না করার দায়ে গ্রেপ্তাতার হন তিনি। দুই মাস ধরে মা পপি খাতুন জেল হাজতে।

শিশুর নিরাপদ আশ্রয়স্থল মা ই যখন জেলে, তখন তাদের জীবন এক বিভিষীকাময়ে পরিণত হল। মায়ের জামিন করাতে আদালতে ঋণের দায়ের ২৫ শতাংশ ৭ লাখ টাকা পরিশোধ করতে হবে তাদের।

একদিকে বাবা হারানোর শোক, মা জেলে অন্যদিকে সুদে আসলে ২৯ লাখ টাকা ব্যাংক ঋণ পরিশোধের চাপ। ওয়ারিশ সূত্রে মা, দাদির সাথে অর্থ ঋণের মামলায় আসামি। অসহায় এতিম তিনটি শিশু যারা এখনও ঠিকমতো টাকা, ঋণ, লেনদেনের অর্থই বোঝে না। বয়স লুকিয়ে তাদেরও করা হয়েছে আসামী। পিতার মৃত্যুর পর বেহাত হয়ে গেছে বাবার ব্যবসা। পাওনাদাররা চাপ দিলেও দেনাদার কেউ মুখ খুলে নাই। জমি জমা কিছুই নেই, নেই ভিটে মাটি। সহায় সম্বল হারিয়ে তিন তিনটি এতিম শিশু নিয়ে এমনিতেই দিশেহারা অবস্থা তার উপর ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে পপি খাতুন জেলে যাবার পর নানার কাছে আশ্রয় পেয়েছে তিনটি অবুঝ শিশু। বৃদ্ধ নানা দিনমজুর। নিজেরই সংসার চলে না তার উপর যুক্ত হয়েছে কন্যার এতিম তিন সন্তান। তারও সাধ্য নাই মৃত জামাতার  ঋণ পরিশোধ করা। দিশেহারা নানা তাই এতিম শিশুদের নিয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন।

সংবাদ সম্মেলনে এতিম শিশু তিনটির নানা ময়না ইউনিয়নের বান্দুগ্রামের বৃদ্ধ সিরাজ শেখ বলেন, আমার মেয়ের জামাই বোয়ালমারী বাজারের পোল্ট্রি মুরগী ব্যবসায়ী আমিন শেখ ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। মৃত্যুর পর জানতে পারি সে ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসি বোয়ালমারী শাখা থেকে ২০২২ সালের ২৫ অক্টোবর  ৩০ লাখ টাকা  ঋণ গ্রহণ করে । এর মধ্যে জীবিত থাকা অবস্থায় কিস্তিতে সুদে আসলে ৬ লাখ ২১ হাজার ৩৭৮ টাকা পরিশোধ করে ঋণ গৃহীতা মো. আমিন শেখ।

তার মৃত্যুর পর ২০২৩ সালের ২৫ অক্টোবর ফরিদপুর জেলা জজ ১ম অর্থঋণ আদালতে আমার মেয়ে পপি খাতুন, তার তিন এতিম নাবালক শিশু সন্তানসহ, আমিন শেখের মা সালেহা বেগম ও মো. চুন্নু মিয়াসহ ছয় জনের নামে মামলা করে। যাতে ২৫ লাখ ৯৩ হাজার ২৮৩  আসল, ৩ লাখ ৩৯ হাজার ৩২৯ টাকা সুদ এবং ৬০ হাজার ৫৭০ টাকা আইনি খরচ বাবদ মোট ২৯ লাখ ৯৩ হাজার ১৩৮ টাকা পরিশোধের ডিক্রি জারি করে আদালত। অথচ মামলার বিষয়ে কিছুই জানতো না আসামিগণ। মামলার বিবরণে ফরিদপুর জজ আদালতের বাদির পক্ষের আইনজীবী তার স্বাক্ষরিত আর্জিতে বিবাদীগণের নামে ৯ ডিসেম্বর ২০২১ সালে লিগ্যাল নোটিশ জারি করেছেন বলে দাবি করেছেন। অথচ ঋণ গৃহীতা ব্যাংক থেকে ঋণ নেন তারও ১ বছর পর ২০২২ সালে।

গত ২ ডিসেম্বর ২৪ সালে মোসা. পপি খাতুন গ্রেপ্তার হলে পরিবারের সদস্যরা জানতে পারেন মৃত আমিন শেখের ঋণের দায়ে তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। মামলার নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায় ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসি বোয়ালমারী শাখা আমিন শেখের দুই এতিম নাবালক মেয়ে ও নাবালক ছেলের বয়স গোপন করে তাদেরও মামলার আসামি করেছে। মায়ের গ্রেপ্তারের পর থেকেই একই মামলার আসামি তিনটি এতিম নাবালক শিশু সারাক্ষণ শঙ্কা ও আতংকের মধ্যে থাকে কখন জানি তাদেরও পুলিশ ধরে নিয়ে যায়।

সংবাদ সম্মেলনে শিশু আইরিন বলে, ভাই বোন দুটো পুলিশের ভয়ে কান্দে, না জানি কখন আমাগেরও ধরবার আসে। ঘুমের ঘরেও ওরা পুলিশ পুলিশ কইয়ে কান্দে উঠে। আমার আব্বার লোন মাফ করে আমার মারে ছাড়ায়া আইনে দেন।

পপি খাতুনের আত্মীয় হুমায়ুন কবির বলেন, অবুঝ তিন শিশুকে ঋণের দায়ী হিসেবে আসামী করা হয়েছে। এরা নাকি জামিনদার হয়েছিলো। এরা ঋণের কী বুঝে। আদালতের নিকট আবেদন মৃত ঋণ গ্রহীতার অসহায় ওয়ারিশদের আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করে ঋণ মওকুফ করে তাদেরকে বেকসুর খালাস দেওয়া হোক।

এ বিষয়ে ব্র্যাক ব্যাংক বোয়ালমারী শাখার ব্যবস্থাপক রাসেল আহমেদ বলেন, ঋণ গ্রহীতা মৃত আমিন শেখ আমাদের শাখা থেকে ত্রিশ লাখ টাকা ঋণ নেন। আমাদের ব্যাংকের শর্ত ও নিয়মের মধ্যে থেকেই চলমান ব্যবসার জন্য ঋণ দেওয়া হয়েছে। শর্তাবলী মেনেই ঋণের টাকা অনাদায়ে জামিনদার ও ওয়ারিশগণের নামে মামলা হয়েছে।  আমাদের ব্যাংক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল আইনের ব্যাত্যয় হোক এমন কিছুই করা হয়নি। এতিম নাবালক শিশু সন্তান মামলার বিষয়ে আমাদের আইনজীবী ভালো বলতে পারবেন।

বিবাদী পক্ষের আইনজীবী এ্যাড. মেহেদী হাসান বলেন, মৃত আমিন শেখের অপ্রাপ্ত বয়সী তিনটি অবুঝ শিশুকে এ মামলায় ওয়ারিশ সূত্রে আসামী করা হয়েছে। তারা ওয়ারিশ হলেও বয়ঃপ্রাপ্তির আগে পিতার সম্পত্তির অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না। আর অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুদের আসামী করা তামামি আইন সমর্থন করে না। এটা স্পষ্ট আইনের ধারায় উল্লেখ রয়েছে। শিশুদের বিরুদ্ধে যারা মামলা করেছে নিসন্দেহে তারা প্রত্যারণার আশ্রয় নিয়ে আদালতকে ভুল তথ্য দিয়েছে। এটা আদালত অবমাননার সামিল।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা