× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড

নওফেলের ছায়ায় বেপরোয়া ছিল ফলাফল জালিয়াতি চক্র

আবু রায়হান তানিন, চট্টগ্রাম

প্রকাশ : ২৬ জানুয়ারি ২০২৫ ১০:৫২ এএম

সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী

সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী

চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে ফলাফল জালিয়াতির বিষয়টি ছিল অনেকটা ওপেন সিক্রেট। ২০২১ সালে অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র নাথ পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বোর্ডের সিস্টেম এনালিস্ট কিবরিয়া মাসুদ খানসহ একটি চক্র রীতিমতো চুক্তির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ফলাফল বদলে দিতÑ এমন অভিযোগ ছিল সব সময়। কিন্তু অভিযোগ থাকলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিল এ চক্র। সর্বশেষ ২০২৩ সালে নারায়ণ চন্দ্রের ছেলে নক্ষত্র দেবনাথের ফলাফল জালিয়াতি করতে গিয়ে ধরা পড়ে এই চক্র। অভিযোগ রয়েছে, গত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরীর সরাসরি ছায়া থাকায় এ চক্র দিন দিন বেপরোয়া হয়ে ওঠে। 

এর আগে ২০২০ সালে পরীক্ষার পর একবার ফলাফল জালিয়াতির অভিযোগ ওঠে বেশ গুরুতরভাবে। সেবার একই দিনে দুবার এইচএসসির ফলাফল প্রকাশ করে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড। দুই ফলাফলে অনেক শিক্ষার্থীরই ফলাফল বদলে যাওয়ার অভিযোগ ছিল। যার পরিপ্রেক্ষিতে সে সময় একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়। সেই কমিটিতে থাকা বুয়েটের বিশেষজ্ঞ দল মতামত দিয়েছিলÑ ১৫ ধাপে পরীক্ষার ফলাফল প্রস্তুত করা হয় তার ১৩টি ধাপেই হস্তক্ষেপের সুযোগ আছে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের। ফলে এর যেকোনো ধাপে নিজের ক্ষমতা প্রয়োগ করে ফলাফল প্রভাবিত করার ক্ষমতা আছে তার।

সেই তদন্তে ফলাফল জালিয়াতির অভিযোগ প্রমাণ হওয়ায় নারায়ণ চন্দ্রের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার সুপারিশও করেছিল কমিটি। যদিও সেই সুপারিশ অজানা কারণে ফাইলবন্ধি হয়ে পড়ে এবং বিভাগীয় মামলার বদলে পদোন্নতি পেয়ে বোর্ড সচিব হন নারায়ণ চন্দ্র। 

চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘একটি চক্র চুক্তির মাধ্যমে ফলাফল বদলে দিতÑ এটা প্রায় ওপেন সিক্রেট ছিল, সবাই জানত। পরীক্ষার ফলাফলের আগে বোর্ডের কয়েকজন কর্মচারী রীতিমতো বাজার বসিয়ে লোকজন ধরে আনত। সিস্টেম এনালিস্ট কিবরিয়া ছিল এর নেতৃত্বে। কিন্তু শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরীর সরাসরি ছায়া থাকায় এই চক্রের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলত না। খুললেও যে লাভ হতো না সেটা ২০২১ সালে প্রমাণ হয়ে যায়। সেবার তদন্ত কমিটি প্রমাণ পেলেও তাদের সুপারিশ কার্যকর হয়নি।’

সেবারের তদন্তে নারায়ণ চন্দ্র নাথের অভিযুক্ত হওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে তার ২০২১ সালের বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদনে (এসিআর)। ওই বছর তার এসিআরে বিরূপ মন্তব্য করেন প্রতিস্বাক্ষরকারী কর্মকর্তা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের (মাধ্যমিক-১) অতিরিক্ত সচিব ডা. সৈয়দ ইমামুল হোসেন।

নারায়ণ চন্দ্র নাথের ২০২১ সালের বার্ষিক অনুবেদনে তিনি মন্তব্য করেন, ‘চিটাগং বোর্ডের ফলাফল কেলেঙ্কারির জন্য (এক রাতে দুবার ফল প্রকাশ) প্রাথমিকভাবে তাকে দায়বদ্ধ করে বিভাগীয় মামলা চালুর জন্য কলেজ অনুবিভাগকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ট্রান্সক্রিপ্ট ছাপানোয় ৪,৮১,৪৪৪ টাকার বোর্ডের আর্থিক ক্ষতির অভিযোগ রহিয়াছে, যাহা মন্ত্রণালয়ের নথিতে সংরক্ষিত আছে। সে কারণে অনুবেদনকারী কর্মকর্তার সহিত একমত হওয়া গেল না।’ 

বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বোর্ডের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘এখান থেকে বোর্ডের চেয়ারম্যান তার (নারায়ণ চন্দ্র নাথ) এসিআর ভালো লিখে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছিলেন। বোর্ডের এসিআরে প্রতিস্বাক্ষর করতে গিয়ে মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব তার সঙ্গে দ্বিমত করেছেন।’

বিভাগীয় মামলার সেই সুপারিশ কখনই আলোর মুখ দেখেনি, বরং ফল কেলেঙ্কারির গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়ার এক বছরের মাথায় পদোন্নতি পেয়ে ২০২৩ সালের শেষদিকে বোর্ডের সচিব হন অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র নাথ। দুই বছর পর আবারও একই অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। 

তবে এ যাত্রায় পার পাননি নারায়ণ চন্দ্র। এ বিষয়ে বোর্ডসংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারী বলেন, আগের বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্টভাবে আসলে বলা যেত না কোন কোন পরীক্ষার্থীর ফলাফল বদলে দেওয়া হয়েছে। তবে এটি করতে গিয়ে একবার পুরো ফলাফলের বড় ধরনের কারিগরি সমস্যা দেখা দেয়। সেটার তদন্ত করতে গিয়ে জানা যায়, এখানে প্রক্রিয়াটি ত্রুটিযুক্ত। সেই তদন্ত শুরু থেকে বারবার বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করেন নারায়ণ চন্দ্র। তবে যেবার তার ছেলে পরীক্ষা দিল সেবার একেবারে সুনির্দিষ্টভাবে ধরার সুযোগ ছিলÑ এই পরীক্ষার্থীর ফলাফল বদলে দেওয়া হতে পারে। সেই সন্দেহ থেকেই একজন নারায়ণ চন্দ্রের ছেলের ফলাফল পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করেন। যেটি নিয়ে থানায় জিডি করেন তার স্ত্রী। আর নারায়ণ চন্দ্র পুনর্নিরীক্ষণের প্রক্রিয়াটি স্থগিত করে দেন। এর ফলে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়। যার জের ধরে দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয় এই তদন্ত প্রক্রিয়া। এবারও বারবার তদন্ত বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছিলেন নারায়ণ চন্দ্র। এমনকি হাইকোর্টে রিট পর্যন্ত করেন তিনি। শেষ পর্যন্ত তদন্তে প্রমাণিত হয়Ñ ফলাফলে জালিয়াতি হয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে নক্ষত্র দেবনাথের ফলাফল, ট্রান্সক্রিপ্ট সব বাতিল হয়। তবে গত চার বছরে এমন অনেকের ফলাফলই জালিয়াতি করা হয়েছে। যেহেতু নক্ষত্রের ফলাফল বাতিল হয়েছে, কাজেই বাকি যাদের এমন জালিয়াতি হয়েছে, তাদেরও শনাক্ত করে ফলাফল বাতিল করা উচিত। 

এ ঘটনায় সর্বশেষ সাবেক সচিব নারায়ণ চন্দ্র, চেয়ারম্যান মুস্তফা কামরুল আখতার, সাবেক সিস্টেম এনালিস্ট কিবরিয়া মাসুদ খান ও নারায়ণ চন্দ্রের ছেলে নক্ষত্র দেবনাথের বিরুদ্ধে পাঁচলাইশ থানায় মামলা করেন বর্তমান বোর্ড সচিব অধ্যাপক একেএম সামছু উদ্দিন আজাদ।

এসব বিষয়ে কথা বলতে চাইলে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেজাউল করিম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমার চাকরির মেয়াদ আর বেশি দিন নেই। সব বিষয় বোর্ডের সচিবকে বুঝিয়ে দিয়েছি আমি। এসব বিষয়ে উনার সঙ্গে কথা বলুন।’

চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সচিব অধ্যাপক একেএম সামছু উদ্দিন আজাদ বলেন, ‘আমি মাত্র দুই দিন আগে দায়িত্ব নিয়েছি। এই মামলার সিদ্ধান্ত আগেই হয়েছিল। কোনো কারণে সেটি বাস্তবায়িত হয়নি। চেয়ারম্যানের আদেশে আমি শুধু মামলাটি করেছি। কেন কীভাবে কী হয়েছেÑ আমি এখনও বিস্তারিত জানি না।’

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা