খুবি ছাত্র অর্ণব হত্যা
খুলনা অফিস
প্রকাশ : ২৫ জানুয়ারি ২০২৫ ২০:৩০ পিএম
আপডেট : ২৫ জানুয়ারি ২০২৫ ২০:৫৮ পিএম
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসনের শিক্ষার্থী অর্ণব কুমার সরকারের (২৬) হত্যাকাণ্ডের কারণ নিয়ে ধোঁয়াশায় রয়েছে পুলিশ। প্রাথমিকভাবে দুটি বিষয় মাথায় রেখে তদন্ত করছে পুলিশ ও একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা। এ ঘটনায় সন্দেহভাজন তিনজনকে আটক করেছে পুলিশ। এদিকে, অর্ণবের মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমেছে পরিবার ও এলাকায়।
শুক্রবার (২৪ জানুয়ারি) রাত সাড়ে ৯টার দিকে খুলনা নগরের তেঁতুলতলা মোড় এলাকায় অর্ণবকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রাতে তেঁতুলতলা মোড়ে একটি চায়ের দোকানের সামনে মোটরসাইকেলে হেলান দিয়ে চা খাচ্ছিলেন অর্ণব। এ সময় কয়েকটি মোটরসাইকেলে দুর্বৃত্তরা এসে তাকে গুলি করে পালিয়ে যায়। এর মধ্যে একটি গুলি অর্ণবের মাথা ভেদ করে বেরিয়ে যায়। স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করে বেসরকারি সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অর্ণবের পরিবার বহুদিন ধরে খুলনায় স্থায়ীভাবে বসবাস করছে। অর্ণবের নানাবাড়ি খুলনা জেলার রূপসা উপজেলায় আর বাবার জন্ম বাগেরহাটের রামপালে। নগরীর বানরগাতিতে তারা বাড়ি করে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন অনেক আগে থেকেই।
শনিবার সকালে ময়নাতদন্তের পর খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গ থেকে অর্ণবের লাশ তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। দুপুর ১২টা নাগাদ অ্যাম্বুলেন্সযোগে লাশ নেওয়া হয় নগরীর সোনাডাঙ্গা মডেল থানাধীন ইসলাম কমিশনারের মোড় সংলগ্ন হাজী ইসমাইল লিংক রোডের বাড়িতে। সেখানে লাশ দেখেই আহাজারি শুরু হয় বাবা-মা ও আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে।
ছেলের লাশ দেখে অজ্ঞান হয়ে যান মা লিপিকা রানী সরকার। জ্ঞান ফিরে প্রথমেই তিনি প্রশ্ন করেন, ‘আমার বাবা তো হেলমেট পড়ে। তাহলে সে মারা গেল কীভাবে? তোমরা বলো আমার বাবার কী হয়েছে?’ অর্ণবের মাকে প্রথমে জানানো হয়েছিল যে তার ছেলের মৃত্যু হয়েছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়। পরে বিষয়টি জানাজানি হলে তার মায়ের গগনবিদারি আর্তনাদে পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে।
অর্ণবের বাবা নিতিশ চন্দ্র সরকার বলেন, আমি জানি না, কী কারণে আমার ছেলের এমন নির্মম পরিণতি হয়েছে। আমার সন্তানের হত্যার সর্বোচ্চ বিচার চাই।
এ সময় এলাকাবাসী তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেও তিনি শোক সামলাতে পারছিলেন না।
অর্ণবের বন্ধু, আত্মীয় ও এলাকাবাসী এ হত্যাকাণ্ডের পেছনের কারণ ও দোষীদের খুঁজে বের করে শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। তারা জানান, অর্ণব অত্যন্ত নম্র ও ভদ্র স্বভাবের ছেলে। তাদের মতে, হত্যার নেপথ্যে পূর্বশত্রুতার কারণ থাকতে পারে।
অর্ণবের লাশ নিয়ে বাড়িতে কিছু সময় রাখার পর নেওয়া হয় গল্লামারী মহাশ্মশানে। সেখানেই শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হয়। অর্ণবের ছোট ভাই অনিক সরকার মজিদ মেমোরিয়াল সিটি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে এবার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। গতকাল তার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার তারিখ ছিল। পরীক্ষায় অংশগ্রহণের বদলে শ্মশানে অনিক কুমার বড় ভাইয়ের মুখাগ্নি করেন।
সোনাডাঙ্গা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল ইসলাম বলেন, ঘটনাটি এতটাই সুপরিকল্পিত ছিল যে হত্যাকারীরা পেশাদার হিসেবে কাজ করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডে দুটি আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছেÑ শটগান ও পিস্তল। সন্দেহভাজন তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে এবং আরও কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে।
ওসি আরও বলেন, কয়েকটি বিষয় মাথায় রেখে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। অর্ণবের বাবা ঠিকাদার ছিলেন। পড়াশোনার পাশাপাশি সেই ব্যবসা দেখাশোনা করতেন অর্ণব। এটা নিয়ে কোনো পক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্ব ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি নারীঘটিত কোনো ঘটনা বা অন্য কোনো দ্বন্দ্ব ছিল কি না, সে ব্যাপারগুলো তদন্তে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার জুলফিকার আলী হায়দার রয়েছেন ছুটিতে। তবে তিনি সার্বক্ষণিক দিক নির্দেশনা দিচ্ছেন বলে জানান। হত্যার কারণ এখনও উদঘাটন করা যায়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, এজন্য পুলিশি তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
খুলনা মহানগর পুলিশের (কেএমপি) উপকমিশনার (দক্ষিণ) মনিরুজ্জামান বলেন, ঘটনার পরপরই বিভিন্ন জায়গায় অভিযান শুরু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে তিনজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। বিভিন্ন দিক মাথায় নিয়েই তদন্ত কার্যক্রম চলছে। হত্যার ঘটনায় দুপুর পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি। পরিবারের সবাই লাশের সৎকার নিয়ে ব্যস্ত। বিকালের দিকে হয়তো তারা মামলা করতে পারেন।