আব্দুস ছালাম সফিক, সাটুরিয়া (মানিকগঞ্জ)
প্রকাশ : ২৫ জানুয়ারি ২০২৫ ১০:৪৩ এএম
মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলায় অবস্থিত বালিয়াটি জমিদারবাড়ি। প্রবা ফটো
ইতিহাস-ঐতিহ্য বুকে ধারণ করে আজও স্বগর্বে দাঁড়িয়ে আছে বালিয়াটি জমিদার বাড়ি। শুধু ইতিহাসের অংশই নয়, স্থাপত্যকলার অনন্য নিদর্শনও এ জামিদার বাড়ি। মানিকগঞ্জ জেলা শহর থেকে মাত্র ৮ এবং ঢাকা জেলা সদর থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরে সাটুরিয়া উপজেলায় অবস্থিত বালিয়াটি জমিদার বাড়ি। বাড়িটির গোড়াপত্তন হয় আনুমানিক ১৭৯০ খ্রিস্টাব্দে। বর্তমানে জমিদারি প্রথা না থাকলেও কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক অনন্য সৃষ্টি। জেলায় যতগুলো ঐতিহাসিক স্থাপনা রয়েছে, তার মধ্যে বালিয়াটি জমিদার বাড়িটি অন্যতম। সাতটি প্রাসাদতুল্য ইমারতে রয়েছে মোট ২০০টি কক্ষ।
বালিয়াটি জমিদার বাড়ি বা প্রাসাদটির সবগুলো ভবন একসাথে স্থাপিত হয়নি। এই প্রাসাদের অন্তর্গত বিভিন্ন ভবন জমিদার পরিবারের বিভিন্ন উত্তরাধিকার কর্তৃক বিভিন্ন সময় স্থাপিত। বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্লকটি জাদুঘর হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে, যা বাংলাদেশ প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগ কর্তৃক সংরক্ষিত ও পরিচালিত।
ধনাঢ্য লবণ ব্যবসায়ী গোবিন্দ রায় সাহা ছিলেন এ বাড়ির পূর্বপুরুষ। সাটুরিয়ায় জমিদার বাড়িটি প্রায় ১৬ হাজার ৫৫৪ বর্গমিটার জায়গার ওপর নির্মিত। বাড়ির সামনে বড় পুকুর। শান বাঁধানো ছয়টি ঘাট রয়েছে পুকুরের চারপাশে, যা দেখতে সত্যিই মনোমুগ্ধকর। প্রবেশপথের চূড়ায় রয়েছে সিংহ মূর্তি। ভেতরে নানা ফুলরাজী সবার দৃষ্টি কাড়ে।
বাড়িতে ৫টি বড় ভবন রয়েছে। যা পূর্ব বাড়ি, পশ্চিম বাড়ি, উত্তর বাড়ি, মধ্য বাড়ি এবং গোলাবাড়ি নামে পরিচিত। প্রথম সাড়িতে রয়েছে চারটি ভবন। এগুলো নির্মাণশৈলী প্রায় একই রকম। আট ইঞ্চি করে সিঁড়ির উত্থান আর বিশাল স্তম্ভ চুন, সুরকি ও ইট দিয়ে তৈরি প্রায় ৫০ ফিট উঁচু কারুকার্যে ভরা একেকটা প্রাসাদ। মাঝখানের দুটি প্রাসাদ দুই তলা এবং দুই পাশের দুইটা তিনতলা করে।
ভবনটির ভেতরে জাদুঘরের অবস্থান। নিদর্শনের মধ্যে রয়েছেÑ জমিদারদের ব্যবহৃত সিন্দুক, আয়না, ঝাড়বাতি, লণ্ঠন, বল্লম, শ্বেত পাথরের তৈরি টেবিল, পালঙ্ক, আলনা, কাঠ ও বেতের চেয়ারসহ অনেক মূল্যবান নিদর্শন। দ্বিতীয় তলায় রঙমহল। মজলিস কক্ষের দেওয়ালে হাতে আঁকা ছবি। এর অন্দর মহলে রয়েছে তিনটি অট্টালিকা। এখানে ছিল রন্ধনশালা ও অতিথি এবং পরিচারকদের থাকার জায়গা।
জানা যায়, জমিদাররা উনিশ শতকের প্রথমার্ধ থেকে শুরু করে বিশ শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত প্রায় একশ বছরের প্রাচীনতম পূরাকীর্তির নিদর্শন রেখে গেছে, যা জেলার পূরাকীর্তিকে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করেছে। বালিয়াটি প্রাসাদটি বালিয়াটি জমিদার বাড়ি নামেই বেশি পরিচিত।
জমিদার গোবিন্দ রায় সাহার পরবর্তী বংশধরা হলেন দাধী রাম, পণ্ডিত রাম, আনন্দ রাম ও গোলাপ রাম। এই পরিবারের স্মরণীয় অন্য ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন নিত্যানন্দ রায় চৌধুরী, বিন্দাবন চন্দ্র, জগন্নাথ রায়, কানায় লাল, কিশোরী লাল রায়, ঈশ্বর চন্দ্র রায় চৌধুরী প্রমুখ। ঢাকার জগন্নাথ মহাবিদ্যালয় (বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তাদেরই বংশধর বাবু কিশোরী লাল রায়।
বালিয়াটি জমিদার বাড়িতে প্রবেশের জন্য জনপ্রতি টিকিটের মূল্য ২০ টাকা। এই মূল্য কেবল দেশি দর্শনার্থীদের জন্য। তবে বিদেশি দর্শনার্থীরাও বেড়াতে আসেন এই বিখ্যাত জমিদার বাড়িতে। তাদের টিকিটের মূল্য রাখা হয় ২০০ টাকা, সার্কভুক্ত দর্শনার্থীদের জন্য ১০০ টাকা।