গোফরান পলাশ, কলাপাড়া (পটুয়াখালী)
প্রকাশ : ২৩ জানুয়ারি ২০২৫ ১০:৩৫ এএম
নীতিমালা উপেক্ষা করে বঙ্গোপসাগরে মাছ শিকারে অবাধে ব্যবহার করা হচ্ছে ট্রলিং বোট। গত সোমবার পটুয়াখালীর কলাপাড়ার আলীপুর-মহিপুর মৎস্য বন্দরে সাগরের মোহনায়। প্রবা ফটো
বঙ্গোপসাগরে দিন দিন বাড়ছে মাছ ধরার অনুমোদনহীন নৌযান ট্রলিং বোট। এসব নৌযানে নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার করে মাছ শিকার করায় মারা যাচ্ছে সব প্রজাতির মাছের পোনা। দীর্ঘদিন ধরে এমন অবস্থা চললেও অদ্যাবধি ব্যবস্থা নেয়নি মৎস্য বিভাগ।
মৎস্য গবেষকদের মতে, অগভীর সমুদ্রে ট্রলিং বোট দিয়ে মাছ শিকার করায় ধ্বংস হচ্ছে মাছের আবাসস্থল। এতে ভেস্তে যাচ্ছে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধিতে সরকারের সব পরিকল্পনা। অনুমোদনহীন নৌযান ট্রলিং বোটের মাধ্যমে মাছ শিকার করায় কমে যাচ্ছে উৎপাদন। জেলে ও মৎস্য আড়ত মালিকদের দাবি, ট্রলিং বোটের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে না পারলে দ্রুত মাছশূন্য হয়ে পড়বে সঙ্গোপসাগর।
সরেজমিনে মৎস্য বন্দর আলীপুর-মহিপুর ঘুরে দেখা যায়, সমুদ্রে মাছ শিকার শেষে শিববাড়িয়া নদীর বিভিন্ন স্থানে নোঙর করে আছে নিষিদ্ধ ট্রলিং বোট। এসব নৌযানে নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার করে মাছ শিকার করা হয়। প্রতিটি বোটেই রয়েছে নিষিদ্ধ জালে ভরা।
মৎস্যজীবীদের অভিযোগ, ট্রলিং বোটের মাধ্যমে নির্বিচারে মাছ শিকার করায় সমুদ্রে মাছের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে মৎস্য আহরণে। ট্রলিং বোট ব্যবসায়ীরা সংখ্যায় কম হলেও ক্ষতি হচ্ছে অনেক বেশি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মৎস্য বন্দর আলীপুর-মহিপুর বহিরাগতসহ ট্রলিং ব্যবসায়ীর সংখ্যা রয়েছে ৫০ থেকে ৬০টি। কিন্তু এ অঞ্চলে লম্বাজাল, খুটাজাল, ছান্দিজালের মাছ ধরার ট্রলার রয়েছে কয়েক হাজার। এসব ট্রলারের হাজার হাজার জেলে পরিবারের ভরণ-পোষণের একমাত্র মাধ্যম সমুদ্রে মাছ শিকার। বঙ্গোপসাগরে ট্রলিং বোট দিয়ে নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার করে মাছ শিকার করায় সব প্রজাতির মাছের পোনা মারা যাচ্ছে। মাছশূন্য সাগরে বৈধ প্রক্রিয়ায় মাছ শিকারে যাওয়া জেলেরা মাছ না পেয়ে এখন দিশাহারা। হাজার হাজার সাধারণ জেলে কর্মহীন হয়ে বর্তমানে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। একদিকে, মাছ না পেয়ে জেলেরা হতাশাগ্রস্ত, অপরদিকে রুপালি ইলিশ না থাকায় সরকার হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব।
নীতিমালা অনুযায়ী ৪০ মিটার গভীরতার কম পানিতে মাছ শিকার করতে পারবে না ট্রলিং বোট। কিন্তু এর তোয়াক্কা না করেই বঙ্গোপসাগরে ট্রলিং বোট দিয়ে মাছ শিকার করায় সরকারের মাছ উৎপাদন বৃদ্ধির সব পরিকল্পনা ভেস্তে যাচ্ছে।
এদিকে, নিষিদ্ধ ট্রলিং বোট নিয়ে বিপাকে পড়েছে মৎস্য বিভাগও। মালিকরা ট্রলিং বোট চলাচলের বিষয়ে রিট আবেদন দাখিল করায় কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারছেন না তারা। সমুদ্র দাপিয়ে বেড়ানো ট্রলিং বোটগুলোর মধ্যে আলীপুর-মহিপুরে প্রায় ২৫ থেকে ৩০টি এবং বহিরাগত বোট রয়েছে ৩০ থেকে ৩৫টি। এ ছাড়া পাথরঘাটা-বরগুনায় রয়েছে ৫৫ থেকে ৬৫টি। সারা দেশে রয়েছে এরকম শত শত অনুমোদনহীন ট্রলিং বোট।
খাজুরা এলাকার জেলে ছিদ্দিক ফকির বলেন, ‘যেসব জেলে বৈধ প্রক্রিয়ায় সমুদ্রে মাছ শিকার করে, তারা মাছ না পাওয়ায় দিন দিন লোকসানে পড়ছে। এজন্য দায়ী ট্রলিং বোট। এসব বোট বন্ধ করতে না পারলে সমুদ্র মাছশূন্য হয়ে পড়বে। বিশেষ করে হাজার হাজার সাধারণ জেলে কর্মহীন হয়ে বিপদে পড়বে।’
কুয়াকাটা সংলগ্ন গঙ্গামতি জেলে পল্লীর আলী মাঝি বলেন, ‘ট্রলিং বোট দিয়ে নির্বিচারে মাছ ধরায় এখন সমুদ্রে মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। যান্ত্রিক এ পদ্ধতির মাধ্যমে সব প্রজাতির ও আকৃতির মাছ ধরা হচ্ছে। এতে মাছের উৎপাদন বাড়াতে সরকার যেসব নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছে, তা কোনো কাজে আসছে না। ট্রলিংয়ে ব্যাহত হচ্ছে সরকারি নিষেধাজ্ঞা, মাছ সংকটের আশঙ্কায় মৎসজীবীরা।
জাতীয়তাবাদী মৎস্যজীবী দল মহিপুর থানা শাখার সভাপতি মো. আফজাল মোল্লা বলেন, ‘ট্রলিং বোট দিয়ে নির্বিচারে মাছ শিকার করায় সমুদ্রে মাছের আকাল দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি এই বোটের অযাচিত ব্যবহারে মাছের আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে। এতে মাছের উৎপাদন কমে যাচ্ছে। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করায় এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। সাগরে মাছ না পেয়ে সাধারণ জেলে চুরি-ডাকাতিসহ খারাপ কাজে জড়িয়ে পড়ার শঙ্কা রয়েছে।’ মাছের উৎপাদন ও আহরণ স্বাভাবিক রাখতে ট্রলিং বোট দ্রুত বন্ধ করার আহ্বান জানান তিনি।
এ ব্যাপারে পটুয়াখালী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. কামরুল ইসলাম বলেন, ‘ট্রলিংয়ের নিষিদ্ধ জাল দিয়ে মাছ ধরায় আমি বোট মালিকদের নোটিস দিয়েছিলাম। তারা আমার নোটিস নিয়ে সমুদ্রে মাছ শিকার করার আবেদন জানিয়ে উচ্চ আদালতে রিট করেছেন। এ কারণে আমরা ট্রলিং বন্ধের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারছি না। তারপরও আমরা আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছি।’ তিনি বলেন, ‘সচেতনতার জন্য মাইকিং করেছি, বিভিন্ন সভা সেমিনার করেছি। তবে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। আশা করছি, খুব শিগগির রিট আবেদন নিষ্পত্তি হবে। তারপর আমরা পুরোদমে ট্রলিং বন্ধের জন্য অভিযান শুরু করব।’