মেরিনা লাভলী, রংপুর
প্রকাশ : ২২ জানুয়ারি ২০২৫ ২২:০৫ পিএম
গঙ্গাচড়া উপজেলার লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নে চরাঞ্চলের কৃষকদের কর্মব্যস্ততার চিত্র।
বর্ষার খরস্রোতা তিস্তায় পানি নেই। জেগে উঠেছে বিশাল চর-দ্বীপ। উজান থেকে বয়ে আনা পলিতে উর্বর হয়েছে চরের জমি। বালুমাটির ওপর পলি জমায় চরে ফলছে আলু, মিষ্টিকুমড়া, গম, ভুট্টা, চিনাবাদাম, পেঁয়াজ, রসুন, মরিচসহ নানা ধরনের শাকসবজি। আর এ দিয়ে জীবন-জীবিকা চলে চরের মানুষের। বন্যায় সর্বস্বান্ত হওয়া চরের কৃষকদের দুঃখ ঘোচে এসব ফসল ফলিয়ে।
প্রতিবছর রংপুরের চরে প্রায় সাড়ে তিনশ কোটি টাকার ফসল উৎপাদন হচ্ছে। যা চাঙ্গা করেছে জেলার কৃষি অর্থনীতিকে। চরের কুমড়া বিদেশে রপ্তানি করে আসছে বৈদেশিক মুদ্রা। এতে স্বাবলম্বী হচ্ছে চরের মানুষ। চরে উচ্চমূল্যের ফসল উৎপাদনের পরামর্শসহ কলাকৌশল ছড়িয়ে দিতে কাজ করছে কৃষি বিভাগ।
সরেজমিনে দেখা যায়, রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলায় লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নে শুকিয়ে গেছে তিস্তা নদী। ৭৫০ মিটার তিস্তা সেতুর মাত্র ৬০ মিটার অংশ দিয়ে তিস্তা নদীর পানি প্রবাহিত হচ্ছে। পুরো চরে কৃষকরা ফসল আবাদ করে সবুজের সমারোহ ঘটিয়েছেন। লক্ষ্মীটারী চর শংকরদহের কৃষক মফিজুল ইসলাম চরের ৮০ শতক জমিতে রসুন আবাদ করেছেন। চরে উৎপাদিত রসুন পরিবারের সারা বছরের চাহিদা পূরণসহ উদ্বৃত্ত অংশ তিনি বিক্রি করেন। তিস্তার পানিতে পলি আসায় তেমন সার প্রয়োগ করতে হয় না ক্ষেতে। পরিমিতি সেচ দেওয়ার ব্যবস্থা করলেই বেড়ে ওঠে রসুনের গাছ।
তিনি বলেন, ‘চরে রসুনের আবাদ ভালো হয়। খাটনি কম, সার দিতে হয় না। একটু সেচ দিলেই হয়ে যায়। এখানকার রসুন আমি নিজে খাই, কিছু বিয়াইয়ের বাড়িতে দিতে হয়। আর বাকি যা থাকে সেগুলো বাজারে বিক্রি করি। এ ছাড়া ঋণ নিয়ে চরে আলু আবাদ করেছি। আলু বিক্রি করে ঋণের টাকা পরিশোধ করে যা থাকবে তা দিয়ে পুরো বর্ষার খাওয়া খরচ চলবে।’
কৃষক মইনুল ইসলাম বলেন, ‘চরের আবাদে মূল সমস্যা হলো পানি, পণ্য পরিবহন। সরকারের পক্ষ থেকে ভ্রাম্যমাণ কিছু পাম্প দিলে আমাদের মিষ্টিকুমড়া, গমসহ অন্যান্য ফসল আবাদ করতে সুবিধা হতো। এ ছাড়া চরের কিছু কাঁচা রাস্তা আছে যেগুলো বন্যায় নষ্ট হয় না। সেগুলোকে স্থায়ী করতে সরকার উদ্যোগ নিলে আমরা সঠিক সময় পণ্য পরিবহন করতে পারতাম। কয়েক বছর আগে চরের ফসল বিক্রি নিয়ে সমস্যা ছিল, এখন সব ফসলেরই ভালো দাম পাওয়া যায়।’
কৃষক আবুল হোসেন বলেন, ‘গত বছর আলুর দাম বেশি হওয়ায় এ বছর চরে প্রচুর পরিমাণ আলু আবাদ হয়েছে। তবে এ বছর আলুর বীজ, কীটনাশক, চাষ, সেচ, সার সবকিছুর দাম বেশি। আলু ৫০ থেকে ৫৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি করতে না পারলে আমাদের ক্ষতি হবে।’
গঙ্গাচড়া উপজেলার লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল হাদী বলেন, ‘আমরা ইউনিয়নের বেশিরভাগ এলাকা তিস্তা নদীর তীরবর্তী। এখানকার মানুষ চরে আবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করে। কৃষকদের সার, বীজসহ আধুনিক কৃষির কলাকৌশল ও সরঞ্জামাদি সরবরাহ করলে তারা অধিক পরিমাণ ফসল উৎপাদন করতে পারবে।’
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, রংপুরের গঙ্গাচড়া, পীরগাছা ও কাউনিয়া উপজেলার ওপর দিয়ে তিস্তা নদী প্রবাহিত হয়েছে। এ তিন উপজেলার ৬৭টি চরে জমি রয়েছে ৯ হাজার ৮৯৭ হেক্টর। এর মধ্যে আবাদ হয় ৭ হাজার ৯৬৮ হেক্টর জমিতে। প্রতিবছরের মতো এবারও ভুট্টা, গম, বাদাম, তিল, তিসি, মিষ্টিকুমড়া, ফুলকপি, বাঁধাকপি, মুলা, বেগুন, করলা, সরিষা, সূর্যমুখী, গাজরসহ বিভিন্ন শাকসবজি আবাদ হচ্ছে চরে। এসব চরে ফসল উৎপাদন হচ্ছে সোয়া লাখ টন। যার বাজারমূল্য প্রায় সাড়ে তিনশ কোটি টাকা।
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের জেলা প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা মো. এনামুল হক বলেন, ‘রংপুরের তিনটি উপজেলার তিস্তার চরে খাদ্যশস্য, মসলাজাতীয় ফসল উৎপাদন হচ্ছে। চরের বিশাল এরিয়াকে আবাদের আওতায় আনতে পারায় অর্থনীতির দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে। চরের উৎপাদিত মিষ্টিকুমড়া দেশের বাইরে যাচ্ছে। আমরা আধুনিক চাষ পদ্ধতি সম্প্রসারণে কৃষকদের পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি।’
তিনি বলেন, ‘চরে যেসব ফসল আবাদ হয়, সেগুলোতে বেশি সেচের প্রয়োজন হয় না। তাই সেচ নিয়ে কৃষকদের তেমন কোনো সমস্যা হচ্ছে না। বিএডিসি বারিক পাইপের মাধ্যমে সেচের ব্যবস্থা করেছে। এ সুবিধার বাইরে থাকা জমিতে কৃষকরা নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সেচ দিচ্ছে।’