তিস্তার সেচনালা
নীলফামারী সংবাদদাতা
প্রকাশ : ২২ জানুয়ারি ২০২৫ ১২:৩১ পিএম
নীলফামারীর ডিমলায় তিস্তা সেচ প্রকল্পের প্রধান সেচনালার পলিমাটি অপসারণের নামে নিষিদ্ধ বোমা মেশিনে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। সম্প্রতি তোলা। প্রবা ফটো
নীলফামারীর ডিমলায় তিস্তা সেচ প্রকল্পের প্রধান সেচনালার পলিমাটি অপসারণের নামে নিষিদ্ধ বোমা মেশিনে বালু উত্তোলনের মহোৎসব চলছে। সেচনালায় ২৫ থেকে ৩০ ফুট গভীরতা সৃষ্টি করে চলছে এই বালু উত্তোলনের কাজ।
অভিযোগ রয়েছে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিয়োগ দেওয়া ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান সরাসরি পাউবোর সঙ্গে যোগসাজশে বালু উত্তোলন করছে। এতে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে পাউবো ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু এর ফলে সেচনালায় পলিমাটি সরানোর কার্যক্রম হচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত। এতে স্থানীয়রা প্রচণ্ড রকমের হতাশ।
কয়েক সপ্তাহ ধরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পাঁচটি নিষিদ্ধ বোমা মেশিনের সাহায্যে বালু উত্তোলন করে স্থানীয়দের ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। অন্যদিকে পাউবো প্রকল্প নিয়ে দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়লেও সবাইকে দেখাচ্ছে যেÑ পলিমাটি অপসারণ করে সেচনালা পানিপ্রবাহ উপযোগী করে তোলা হচ্ছে।
এই দুর্নীতির ফলে ব্যারাজ নিয়ন্ত্রণকক্ষ, তিস্তা ব্যারাজ, সেচ প্রকল্প, সরকারি পরিদর্শন বাংলোসহ নদীর তীরবর্তী স্থাপনাগুলো ও পরিবেশের ভারসাম্য ভয়ানকভাবে ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এতে অবশ্য পাউবোর কোনো জবাবদিহিতা নেই। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশে বালু উত্তোলন করায় পাউবোর লোকজনের পকেট হচ্ছে ভারী। কিন্তু স্থানীয় মানুষ যে এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তা নিয়ে বিন্দুমাত্র ভাবছে না।
জানা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের নদী-খাল-পুকুর খনন প্রকল্পের আওতায় তিস্তার সেচ প্রকল্পের প্রধান খালে সেচনালায় জমে থাকা পলিমাটি অপসারণে খননকাজ শুরু করেছে ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ড। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ২৯ লাখ টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে মেসার্স সাইকি বিল্ডার্স নামে এক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, তিস্তা সেচ প্রকল্পের প্রধান খালে ৫টি নিষিদ্ধ বোমা মেশিন বসিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এ স্থান থেকে প্রায় ২০০ মিটার পশ্চিমে পরিদর্শন বাংলো, উত্তর-পূর্বে তিস্তা ব্যারাজ নিয়ন্ত্রণকক্ষ ও তিস্তা ব্যারাজ অবস্থিত। ইতোমধ্যেই ২৫ থেকে ৩০ ফুট গভীর থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। উত্তোলিত বালু তিস্তা ব্যারাজের ভাটিতে ফেলা হচ্ছে। এতে তিস্তা নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এ কারণে সেচনালার পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়া ছাড়াও প্রকল্পের কার্যকারিতা মারাত্মকভাবে ক্ষতির শিকার হচ্ছে।
স্থানীয়রা বলেন, প্রায় চার সপ্তাহ হলো তিস্তা ব্যারাজ ২০০ মিটার দূরত্বে নালা থেকে পলিমাটি অপসারণের নামে চলছে বালু উত্তোলন। ভূগর্ভস্থ বালু উত্তোলনের ফলে খালের তলদেশে প্রায় ২৫-৩০ ফুট গভীরতার সৃষ্টি হওয়ায় আশপাশের বহু স্থাপনা প্রচণ্ড ঝুঁকিতে পড়েছে। এতে নালার দুই পাড় দেবে বাঁধ ও সিসি ব্লক ধসে যেতে পারে। নদীর পানি বাড়লেই সেচ প্রকল্পও ঝুঁকিতে পড়বে।
তিস্তা ব্যারাজের কাছে ঘুরতে আসা সোহরাওয়ার্দী কলেজের শিক্ষার্থী নাঈম আহমেদ বলেন, ‘তিস্তা ব্যারাজ ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লাগোয়া জায়গায় পরিবেশ বিধ্বংসী বোমা মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন চলতে থাকলে এখানকার স্থাপনাগুলো যেকোনো সময় ধসে পড়তে পারে। এ ছাড়া সেচ প্রকল্পের দুই পাড় দেবে বাঁধ ও সিসি ব্লকও ক্ষতিগ্রস্ত হবেÑ তা দায়িত্বশীলদের বুঝতে হবে।’
প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স সাইকি বিল্ডার্সের প্রোপাইটর এএইচএম সাইফুল্লাহ বলেন, ‘বোমা মেশিন ব্যবহারের কোনো অনুমোদন নেই। তবে অনেক সময় জরুরি প্রকল্পের কাজ দ্রুত শেষ করতে বিশেষ পরিস্থিতিতে এটি ব্যবহার করা হয়। তারপরও আইনের চোখে বোমা মেশিন পুরোপুরি অবৈধ।’
ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন, ‘নিজস্ব ড্রেজার না থাকায় পলিমাটি অপসারণে সাময়িক সময়ের জন্য বোমা মেশিন কাজে লাগানো হয়েছে। আমাদের ড্রেজার কেনার প্রক্রিয়া চলমান আছে। বাইশপুকুর এলাকায় ভাঙনরোধে ড্রেজিং করা মাটি তিস্তা নদীর ভাটিতে ভরাট করা হচ্ছে। ড্রেজার না আসা পর্যন্ত এই পদ্ধতি চালু রাখতে হচ্ছে।’
এ প্রসঙ্গে ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাসেল মিয়া বলেন, ‘ব্যাপারটি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পরিবেশ ও স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিতে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’