রহিম শুভ, ঠাকুরগাঁও
প্রকাশ : ২২ জানুয়ারি ২০২৫ ১১:৫২ এএম
ঠাকুরগাঁও সদরের সালন্দর ইউনিয়নে জমি থেকে আলু তোলায় ব্যস্ত চাষিরা। প্রবা ফটো
উত্তরের কৃষিনির্ভর জেলা ঠাকুরগাঁও। এ জেলার ধান, গম, ভুট্টা, আলুসহ নানান সবজি রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় যায়। তবে এ মৌসুমে উৎপাদন ভালো হওয়া সত্ত্বেও আলু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন এ জেলার কৃষকরা। বীজ, সার, কীটনাশকসহ সবকিছুর দাম বেশি থাকায় এবার আলু আবাদে খরচ হয়েছে প্রায় দ্বিগুণ। এদিকে গত কয়েক দিন ধরে বাজারে আলু বিক্রি হচ্ছে ১৮-২০ টাকা কেজি দরে। কৃষকরা বলছেন, এবার লাভ তো দূরের কথা উৎপাদন খরচ তোলাই দায়।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত মৌসুমে এ জেলায় ২৬ হাজার ১৬৮ হেক্টর জমিতে আলু আবাদ হয়। গতবার ভালো দাম মেলায় চলতি মৌসুমে আবাদ হয়েছে ৩৪ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে আগাম আলু চাষ হয়েছে ১ হাজার ৫৫৫ হেক্টর জমিতে।
১ মাস আগেই বাজারে প্রতি কেজি আলুর দাম উঠেছিল ৬০-৭০ টাকা পর্যন্ত। তবে এখন আলু পাইকারি বাজারে ১৮-২০ টাকা আর খোলা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ২৫-৩০ টাকা দরে।
সালন্দর ইউনিয়নের কৃষক ভিম পাল বলেন, ‘গতবার আলুর দাম ভালো পাইছি। তাই এবার ৩ একর জমিতে আলু চাষ করেছি। দুই দিন আগে আলু বিক্রি করেছি ১৯ টাকা কেজি দরে। এবার যে খরচ তাতে ৩ একর জমিতে লস হবে ১ লাখ টাকার মতো। এ নিয়ে অনেক দুশ্চিন্তায় আছি।’
বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার কৃষক ফজলু হক বলেন, ‘এবার ব্র্যাকের আলুর বীজ কিনেছি ১৮০ টাকা কেজি দরে। আর প্রতিটি সারের বস্তার দাম ছিল ৩০০-৮০০ টাকা বাড়তিতে। আলুতে কোয়াশার বিষ লাগবেই। এটার দাম কেজিপ্রতি ৫০০ টাকা বাড়তিতে কিনতে হইছে। আর এখন আলুর কেজি ১৬-১৮ টাকা। ২ একর জমিতে আলু চাষ করেছি, সব সার-কীটনাশক বাকি নিছি। এখন মহাজনের টাকা কেমন করে পরিশোধ করবÑ এটা নিয়ে বিপাকে পড়ছি।’
সদর নারগুণ ইউনিয়নের কৃষক জীবন হক বলেন, ‘গত ১৫-২০ দিন আগে আলু প্রতি কেজি ৪০ টাকায় বিক্রি করেছি। সেই আলু গতকালকে (সোমবার) বিক্রি করলাম ১৭ টাকা কেজিতে। এই দামে লাভ তো দূরের কথা, চাষের দেনা পরিশোধ নিয়েই দুশ্চিন্তায় আছি। কারণ এবার আলু চাষের সবকিছুর দাম বেশি ছিল। সার ঠিকমতো পাওয়া যায়নি। পাওয়া গেলেও দাম ছিল বস্তাপ্রতি ৩০০ টাকা বেশি।’
ঠাকুরগাঁও জেলার বিভিন্ন এলাকার আলুচাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, লাভের আশায় নানা জাতের আগাম আলুর চাষ করেছেন কৃষকরা। প্রতিবছর সেপ্টেম্বরের শেষে আলু রোপণ করে নভেম্বরে তা বাজারে বিক্রি করা হয়। তবে এবার সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে বৃষ্টির কারণে ক্ষেতের বীজ নষ্ট হয়ে যায়। এ কারণে নতুন বীজ রোপণ করতে হয়েছে। এতে অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার চাষের খরচও বেড়েছে। কিন্তু আগাম জাতের সেই আলু বিক্রি করে এখন লোকসানে পড়েছেন কৃষকেরা।
সদর ভেলাজান গ্রামের কৃষক নয়ন আলী বলেন, ‘এক বিঘা (৫০ শতক) জমিতে আগাম জাতের আলু আবাদে খরচ হয়েছে ৭০-৮০ হাজার টাকা। আলু পাওয়া গেছে ২ হাজার ৯০০ কেজি। তাতে প্রতি কেজি আলু চাষে খরচ পড়েছে ২৩ টাকার বেশি। সেই আলু বিক্রি করতে হচ্ছে ১৭ থেকে ১৮ টাকায়। তাতে কেজিতে ৭-৮ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে।’
সদর আড়তের আলু ব্যবসায়ী মো. বিপুল বলেন, ‘এবার মৌসুমের শুরুতে এক কেজি আলু ৮০ টাকায় কিনেছি। গত সপ্তাহেও ১ কেজি আলু মাঠ থেকে ২৪ টাকায় কিনেছি। এখন সেই আলু কিনছি ১৫ থেকে ১৬ টাকায়। এই দাম যদি থাকে, তাহলে কৃষকরা এবার লাভের মুখ দেখবে না। বরং বড় লোকসানের মধ্যে পড়বে। কারণ এই সময় আলু সংরক্ষণ করা যায় না।’
ঠাকুরগাঁও জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘এ এলাকার কৃষক যখন একটি ফসলে লাভ পান, তখন অন্যরাও সেটাতেই ঝোঁকেন। চলতি বছরে আলুর ক্ষেত্রেও এমনটি হয়েছে। তবে উৎপাদন খরচটাও একটু বেশি পড়ছে, বাজারে দামও কম। এতে কৃষক ন্যায্যমূল্য পাওয়া নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন। তবে উৎপাদন ভালো হওয়ায় কৃষকদের লাভ কম হলেও তেমন লোকসান হবে না।’