ইসমাইল মাহমুদ, মৌলভীবাজার
প্রকাশ : ২২ জানুয়ারি ২০২৫ ০৯:১০ এএম
আপডেট : ২২ জানুয়ারি ২০২৫ ১১:১১ এএম
এ দেশে ১৮৩৯-৪০ সালের দিকে চায়ের চাষাবাদ শুরু হয়। ওই সময় চট্টগ্রাম জেলা কালেক্টর মি. স্কনস আসাম থেকে কিছু চা বীজ ও কলকাতার বোটানিক্যাল গার্ডেন থেকে চায়না টাইপের কিছু চাগাছ সংগ্রহ করে চট্টগ্রাম ক্লাবের সামনে তা রোপণ করেন। চট্টগ্রামের প্রথম চা-বাগানের নাম ‘পাইওনিয়ার’। স্থানীয়ভাবে যা কুণ্ডদের বাগান নামে পরিচিত ছিল। কিন্তু নানাবিদ কারণে বাগানটি পরবর্তী সময়ে টিকিয়ে রাখা যায়নি।
এরপর মি. হগ নামের আরেক ব্যক্তি কর্ণফুলী নদীর ওপারে কোদালায় দুই একর জমিতে চাগাছের চারা রোপণ করেন। ওই দুই একর জমির চাগাছও টেকেনি। এরপর ১৮৪৫ সালের দিকে সিলেটের চাঁদখানি পাহাড়ে অল্পসংখ্যক চাগাছের উপস্থিতি পাওয়া যায়। ওই বছর কাছাড় ও সিলেটের বিভিন্ন অঞ্চল নিয়ে গঠিত সুরমা ভ্যালিতে চায়ের চাষ শুরু হয়। তবে দেশে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে প্রথম চা উৎপাদন শুরু হয় ১৮৫৪ সালে সিলেট শহরের এয়ারপোর্ট রোডে মালনিছড়ায়। এই মালনিছড়াই মূলত দেশের প্রথম বাণিজ্যিক চা-বাগান।
১৮৬০ সালে মৌলভীবাজার মহকুমায় (বর্তমান মৌলভীবাজার জেলা) প্রথম চা চাষ শুরু হয়, বর্তমান কমলগঞ্জ উপজেলার মিরতিঙ্গা চা-বাগানে। এরপর মৌলভীবাজারের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে একের পর এক বাড়তে থাকে চা-বাগানের সংখ্যা।
১৮৭১ সালে ভারতবর্ষ ভ্রমণে আসেন ইংল্যান্ডের গ্লাসপো শহরে তুলা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ফিনলের সে সময়ের স্বত্বাধিকারী মি. জন ম্যুর। ওই প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তার দাদা মি. জেমস ফিনলে। ভারতবর্ষ ভ্রমণের সময় মি. জন ম্যুর ব্যবসার উদ্দেশ্যে ‘ফিনলে ম্যুর অ্যান্ড কোম্পানি’ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৮২ সালে তিনি উত্তর ও দক্ষিণ সিলেট (প্রা.) কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে ১৮৯৬ সালের মধ্যে উপমহাদেশে বিভিন্ন চা-বাগান সম্প্রসারণ করেন।
ইতিহাস পর্যালোচনায় জানা যায়, ফিনলে কোম্পানি উপমহাদেশে চায়ের আবাদ শুরু করার পর বাগানগুলোর সুপারিনটেনডেন্ট, ম্যানেজার, অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার পদবির টি-প্ল্যান্টারদের নিয়ে আসা হতো ইংল্যান্ড থেকে। শুধু শ্রমিক নিয়োগ দেওয়া হতো ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের। প্রথম দিকে জাহাজে করে অতি কষ্টে বহুপথ পাড়ি দিয়ে টি-প্ল্যান্টাররা আসেন এ দেশে। পরবর্তীকালে ফিনলে কোম্পানির চা-বাগান ব্যাপক সম্প্রসারণ হওয়ার পর কোম্পানির নিজস্ব ছোট বিমানে করে ইংল্যান্ডের সাহেবরা (টি-প্ল্যান্টার) যাতায়াত শুরু করেন। যাতায়াতের সুবিধার্থে ১৯৪৫ সালে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার বালিশিরা চা-বাগানের পাশে লিজকৃত জমিতে চা-বাগানের মাঝে স্থাপন করা হয় ২ হাজার ফুটের বিমানের ধাবনপথ বা রানওয়ে।
ষাটের দশক পর্যন্ত এখানে ফিনলে কোম্পানির কর্মকর্তাদের বিমান ওঠানামা করত। বর্তমানে এ রানওয়ে বা ধাবনপথ ব্যবহৃত না হলেও বালিশিরা ভ্যালি ক্লাবের সামনে এখনও এটি সগর্বে অতীতের স্মৃতি বুকে ধারণ করে আছে। একসময় এ ধাবনপথ বা রানওয়েটিতে প্রবেশ সবার উন্মুক্ত থাকলেও ২০০৪ সালে বাংলাদেশের কিছু ব্যবসায়ী ফিনলে টি কোম্পানি কিনে নেওয়ার পর এটি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়েছে। বর্তমানে এ ধাবনপথে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেওয়া হলেও বাগানের রাস্তা থেকে এটি দেখতে মৌলভীবাজারে আগত দেশি-বিদেশি পর্যটকরা প্রায় প্রতিদিনই এখানে ভিড় করে।