নীলফামারী
নীলফামারী সংবাদদাতা
প্রকাশ : ২০ জানুয়ারি ২০২৫ ১৫:৫০ পিএম
নীলফামারী রেলস্টেশন। প্রবা ফটো
স্বাধীনতার ৫৩ বছরেও যাত্রীসেবার মান বাড়েনি নীলফামারী রেলস্টেশনে। উপজেলা স্টেশনের চেয়েও নাজুক অবস্থা হওয়ায় ক্ষুব্ধ যাত্রীরা। বিষয়টি খতিয়ে দেখে দীর্ঘদিন ধরে যাত্রীসেবার মান বাড়ানোর দাবি জানালেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ যাত্রীদের।
নীলফামারী সদর উপজেলার টুপামারী ইউনিয়নে অবস্থিত নীলফামারী রেলস্টেশন। জেলা সদর ছাড়াও আশপাশের উপজেলার ট্রেনের যাত্রীরা এখান থেকে যাতায়াত করে থাকেন দেশের বিভিন্ন স্থানে। স্বাধীনতার ৫৩ বছরেও স্টেশনটিতে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন না হওয়ায় আক্ষেপের শেষ নেই যাত্রীদের। তারা বলছেন, নীলফামারী জেলা সদর রেল স্টেশন হওয়া সত্ত্বেও এই স্টেশনটিতে যাত্রীদের সুযোগ-সুবিধার মান এতটাই খারাপ যে উপজেলা পর্যায়ের স্টেশনগুলোর চেয়েও নিম্নমানের। জেলা সদরের স্টেশন হয়েও পিছিয়ে পড়া স্টেশন হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে এটি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জনবল সংকটে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে জেলার ৯টি স্টেশনের পাঁচটিই বন্ধ রয়েছে। যে চারটি চালু রয়েছে তার মধ্যে জেলা সদরের স্টেশনটি বেশি জনগুরুত্বপূর্ণ। এই রেল স্টেশন থেকে ঢাকা, খুলনা, রাজশাহী রুটে সাতটি ট্রেন চলাচল করে প্রতিদিন। বাংলাদেশ-ভারত চলাচলকারী মিতালী এক্সপ্রেস এই রেলপথ দিয়ে চলাচল করায় এই রেলপথটি আন্তর্জাতিক রেলরুট হিসেবেও ব্যবহার করা হচ্ছে। এর পরও এখানে রয়েছে স্বাস্থ্যসম্মত ও পর্যাপ্ত শৌচাগারের অভাব, বিশ্রামাগারের অভাব। পর্যাপ্ত বসার ব্যবস্থা না থাকায় ও নোংরা পরিবেশ থাকায় স্টেশনে আসা যাত্রীদের দুর্ভোগে পড়তে হয়। এ ছাড়া যাত্রী ছাউনি না থাকা, প্ল্যাটফর্ম ছোট এবং ফুটওভার ব্রিজ না থাকায় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে ট্রেনযাত্রীদের। জেলা সদরের স্টেশন হিসেবে রয়েছে আসনেরও অভাব। দূরের যাত্রীদের জন্য আবাসিক হোটেল, নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য জিআরপি থানা স্থাপনের দাবি স্থানীয়দের।
স্থানীয় বাসিন্দা তরিকুল ইসলাম বলেন, জেলা শহরের প্রধান রেল স্টেশন হওয়ায় বিভিন্ন কর্মকর্তা এবং প্রথম শ্রেণির যাত্রীরা এই স্টেশন দিয়ে যাতায়াত করে। কিন্তু এখানে নেই ভালো কোনো রেস্টুরেন্ট। নিরাপত্তাব্যবস্থার অভাবে অনেকেই স্টেশনটিতে আসতে চান না বলেও জানান তিনি। নীলফামারী সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী শাকিল আহমেদ বলেন, চিলাহাটি থেকে নিয়মিত নীলফামারী সরকারি কলেজে আসতে হয়। নীলফামারী স্টেশনে স্যানিটেশন ব্যবস্থা এতটাই জঘন্য যে গেলেই রুচি নষ্ট হয়।
একই কলেজের আরেক শিক্ষার্থী আরিফ বলেন, নীলফামারী সদর স্টেশন জেলার উপজেলা শহরগুলোর তুলনায় অনেক নিম্নমানের। এ জেলায় মোট চারটি স্টেশন থাকলেও সদর স্টেশনটি সবদিক দিয়ে পিছিয়ে।
কাপড় ব্যবসায়ী রেজাউল বলেন, সৈয়দপুর থেকে নিয়মিত কাপড় আনতে হয়। কিন্তু এই সদর স্টেশনের নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য সবসময় ভয়ে থাকতে হয়।
ট্রেনে নিয়মিত যাতায়াত করেন এমন একজন হলেন আরিফা সুলতানা। তিন বলেন, আরামদায়ক ও নিরাপদ ভ্রমণ হওয়ায় ট্রেনে নিয়মিত যাতায়াত করি। কিন্তু সদর স্টেশনের অবস্থা দেখে ট্রেনে যাওয়া-আসার আগ্রহ হারাচ্ছি।
স্থানীয় বাসিন্দা আবুল কাশেম বলেন, ঢাকা থেকে নিয়মিত দুইটি ট্রেন চলাচল করে এই স্টেশন হয়ে। এ কারণে ঢাকার অনেক যাত্রী এখানে আসেন। কিন্তু এই স্টেশনে ভালো মনের কোনো হোটেল বা রেস্টুরেন্ট নেই। ফলে স্টেশনটির গ্রহণযোগ্যতা হারাচ্ছে প্রথম শ্রেণির যাত্রীদের কাছে।
অতি দ্রুত এই স্টেশনটিতে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগবে এবং যাত্রীরা পাবে তাদের নানা সুযোগ-সুবিধাÑ এমনটাই প্রত্যাশা বিশিষ্টজনদের।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নীলফামারী জেলা সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক)-এর সভাপতি আকতারুল আলম রাজু বলেন, জেলার প্রধান রেলওয়ে স্টেশনের এই অবস্থা খুবই দুঃখজনক। কর্তৃপক্ষ খুব দ্রুত এই সমস্যাগুলোর সমাধান করবেন বলে প্রত্যাশা তার।
স্টেশনের নানা সংকটের কথা স্বীকার করে স্টেশন মাস্টার মিঠুন চন্দ্র রায় বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে যাত্রীসেবার মান বাড়ানোর জন্য বলা হয়েছে। দ্রুত উন্নয়ন কাজ শুরু হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
সৈয়দপুর রেলওয়ে থানার ওসি মো. মাহমুদ উন -নবী বলেন, রেলের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে নীলফামারীর রেলওয়ে পুলিশ সব সময় সতর্ক অবস্থায় থাকে। এ কারণে এখানে তেমন কোনো বিশৃঙ্খলা নেই, এ ব্যাপারে যাত্রীদেরও বিশেষ কোনো অভিযোগ নেই। আর অবকাঠামো উন্নয়নের ব্যাপারে আমি কিছু বলতে চাই না। এ ব্যাপারে রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ভালো বলতে পারবে।
এ ব্যাপারে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন সহকারী প্রকৌশলী মো. রেজাউল ইসলাম বলেন, আমরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে রেল স্টেশনগুলোর কাজ করছি। যেসব রেল স্টেশনের ভৌগোলিক গুরুত্ব রয়েছে এবং যেখানে লোক সমাগম বেশি, সেগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ চলছে। তিনি বলেন, নীলফামারী সদর রেল স্টেশনে যেসব সমস্যা রয়েছে, সেগুলো সমাধানে উদ্যোগ নেওয়া হবে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নায়িরুজ্জামান বলেন, নীলফামারী রেল স্টেশনে অনেকগুলো সমস্যা রয়েছে। এসব সমস্যা দূর করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণে রেল মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর দ্রুত জানানো হবে।