রহিম শুভ, ঠাকুরগাঁও
প্রকাশ : ১৯ জানুয়ারি ২০২৫ ১৮:৫৭ পিএম
আপডেট : ১৯ জানুয়ারি ২০২৫ ১৯:০৬ পিএম
‘শুরুতে হামার জন্য স্লুইসগেইটটা অনেক উপকারে আসিছে। কৃষি কাজত পানির তানে কোন বার্তি টাকা লাগেনি। সরকার কোটি টাকা খরচ করে খরা মৌসুমে সেচের জন্য হামার তানে করিছে এই গেইটটি। কিন্তু কয়েক বছর ধরে গেইটা হামার কোন কাজে আসে না। নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। মেরামত করা হয় না। অনেক মালামাল চুরি হয়ে গেছে। এটা এখন হামার গলার কাঁটা। যদি এটা সংস্কার করা হয় কৃষকরা আবারও উপকার পাবে।’
ঠাকুরগাঁয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার বড়বাড়ি ইউনিয়নের কৃষক আব্দুল মোতালেব প্রতিদিনের বাংলাদেশের এই প্রতিনিধির সঙ্গে আলাপচারিতায় এভাবেই তার মনের খেদ ব্যক্ত করলেন।
বড়বাড়ি ইউনিয়নের জাউনিয়া গ্রামে স্লুইসগেটটি নির্মাণ করা হয় ২০১৫-১৬ অর্থবছরে। উদ্দেশ্য ছিল খরা মৌসুমে আবাদি জমিতে সেচসুবিধা দেওয়া। অথচ প্রায় পাঁচ বছর ধরে এটি কৃষকের কোনো কাজে আসছে না। উল্টো এলাকাবাসীর জন্য হরিষে বিষাদে পরিণত হয়েছে।
সরেজমিন দেখা গেছে, চারপাশে ফসলের বিস্তৃত মাঠ। মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে নহনা খাল। খালের দুপাশে ফসলের সমাহারÑ ধান, ভুট্টা, আলুসহ নানা শস্য। এই খালের ওপর ২ কোটি ৩০ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল স্লুইসগেট। স্থানীয় কৃষকদের আবাদে সেচকাজের সুবিধা বিবেচনায় এটি নির্মাণ করা হলেও এখন আর কাজে আসছে না।
কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত স্লুইসগেটটি এখন কৃষক তথা এলাকাবাসীর গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘদিন সচল না থাকায় এটি পরিণত হয়েছে মাদকসেবীদের আড্ডাখানায়। চুরি গেছে গেটটির লোহাজাতীয় অধিকাংশ মালামাল। উল্টো সেচসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন কৃষকরা। এ অবস্থায় গেটটি সংস্কার করে দ্রুত চালুর দাবি জানিয়েছে স্থানীয়রা।
জানা যায়, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে উপজেলার বড়বাড়ি ইউনিয়নের জাউনিয়া গ্রামে স্লুইসগেটটি নির্মাণ করে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। খরা মৌসুমে আবাদি জমিতে কৃষককে সেচসুবিধা দিতে নির্মাণ করা হয় গেটটি। শুরুতে সেটি খোলা ও বন্ধের কাজ ঠিকঠাক চললেও প্রায় পাঁচ বছর ধরে এটি অকেজো হয়ে পড়ে আছে। কোনো ধরনের সুবিধা পাচ্ছেন না কৃষক। নিথর দাঁড়িয়ে আছে গেটটি আর অন্যদিক দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে নদীর পানি।
বড়বাড়ি ইউনিয়নের সিংগিয়াপাড়া গ্রামের কৃষক নাজমুল হোসেন বলেন, ‘আমরা চাই স্লুইসগেটটি দ্রুত মেরামত করা হোক। তাতে আমাদের কৃষকদের সেচসুবিধা ফিরে আসবে। জমিতে বাড়তি টাকা খরচ করতে হবে না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে মনে রাখতে হবেÑ কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে।’
আরেক কৃষক সুদেব পাল বলেন, ‘আমরা বারবার বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার এলজিইডির নির্বাহী প্রকোশলীকে বিষয়টি জানিয়েছি। কিন্তু দীর্ঘ ৫ বছর পার হয়ে গেলেও আমাদের কথা আমলে নেওয়া হয়নি। এতে প্রতিবছর কৃষিকাজে জমিতে সেচের জন্য বাড়তি গুনতে হয়। দেশে নতুন সরকার এসেছে। আমরা চাই, গেটটি আগের মতো সচল করে কৃষিজমিতে সেচের ব্যবস্থা করে দেওয়া হোক।’
বড়বাড়ি ইউনিয়নের শিক্ষক আব্দুল বাতেন বলেন, অকেজো হয়ে পড়ে থাকা স্লুইসগেটটি ঘিরে রাতে স্থানীয় বখাটেরা মাদকের আড্ডা বসায়। গেটটির মালামালও চুরি হয়ে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের গুরুত্ব দেওয়া উচিত।’
ছোট সিংগিয়া পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির বলেন, ‘আমাদের সমিতির ব্যবস্থাপনায় একটি গেট ও আরেকটি ওয়ার করা হয়েছে। শুরুতে কৃষকদের উপকার হলেও এখন কোনো কাজে আসছে না। দুই বছর ধরে আমরা এলজিইডির সাথে এটি সংস্কার নিয়ে কথা বলছি। পুনরায় মেরামত হলে কৃষকদের কাজে আসবে এটি।’
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার প্রকৌশলী মাইনুল ইসলাম বলেন, স্লুইসগেটটি এখন কৃষকদের সেচসুবিধা দিতে পারছে না। এটি সংস্কারে গত বছর আমরা একটি এস্টিমেট পাঠিয়েছি। চলতি অর্থবছরেও প্রাক্কলন পাঠানো হয়েছে। বছরের মধ্যভাগে মেরামত করা হবে বলে আশা করছি।’
ঠাকুরগাঁও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন বিশ্বাস বলেন, ‘দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে স্লুইসগেটটি অকেজ হয়ে পড়ে আছে। পুনরায় কৃষকদের সেচসুবিধা দিতে দ্রুত সময়ের মধ্যে সংস্কারের কাজ শুরু হবে।’