চাটমোহর (পাবনা) প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৬ জানুয়ারি ২০২৫ ১৯:৩৩ পিএম
আপডেট : ১৬ জানুয়ারি ২০২৫ ১৯:৪৩ পিএম
দরিদ্র নারীদের হাতে গাভীর বাছুর দেওয়ার নামে ফটোসেশন। ছবি: সংগৃহীত
পাবনার চাটমোহরে গাভীর বাছুর বিতরণের নামে ফটোসেশনের অভিযোগ ওঠেছে এক এনজিওর নির্বাহী পরিচালকের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, তাদের বাছুর দেওয়ার কথা বলে ডেকে এনে ছবি তুলে বিদায় করে দিয়েছে।
অভিযুক্ত ব্যক্তি হলেন- মানবসেবা উন্নয়ন সংস্থা নামে এনজিওর নির্বাহী পরিচালক এম এস আলম বাবলু।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ৩০ ডিসেম্বর সকালে বাংলাদেশ এনজিও ফাউন্ডেশনের (বিএনএফ) আর্থিক সাহায্যে ‘মানবসেবা উন্নয়ন সংস্থা’ এনজিওর উদ্যোগে ১০ জন দুঃস্থ নারীকে গাভীর বাছুর দেওয়ার কথা বলে রেলবাজারে নিয়ে আসা হয়। নিজের পরিচিত একটি খামার থেকে বাছুর নিয়ে আসেন এনজিওর নির্বাহী পরিচালক এম এস আলম বাবলু। এর পর এলাকার কিছু ব্যক্তিকে এনজিওটির সামনে ডেকে এনে নারীদের দাঁড় করিয়ে বাছুর দেওয়ার ফটোসেশন করেন। পরে ওই নারীদের বাছুর না দিয়ে খিচুড়ি ডিম খাইয়ে বিদায় করা হয়। উপস্থিত অনেকেই গরু প্রদানের বিষয়ে জানতে চাইলে বাবলু পরে দেওয়া হবে বলে জানান।
তারা আরও জানান, প্রকল্পের নাম ছিল ‘হতদরিদ্রদের মাঝে উন্নত জাতের গাভীর বাছুর বিতরণ’। এতে বরাদ্দ ৫ লাখ টাকা।
বাছুর না পাওয়ায় হতাশ ওই গরিব নারীরা। ফটোসেশনের পর দুই সপ্তাহ পার হলেও এখনও তাদের গাভীর বাছুর বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। প্রকল্পের পুরো অর্থ বাবলু আত্মসাতের চেষ্টা করতেছে বলে তাদের অভিযোগ।
কুবিরদিয়ার মাঠপাড়া গ্রামের আলম হোসেনের মেয়ে খুশি খাতুন স্বামী পরিত্যক্তা হওয়ার পর বাবার বাড়িতে এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে থাকেন। তিনি অন্যের বাড়িতে ও মাঠে দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালান।
তিনি বলেন, ‘প্রশিক্ষণের কথা বলে আমাকে ডেকে নিয়ে যায়। বাছুর হাতে ধরিয়ে ছবি তোলে। কিন্তু আমাকে বাছুর দেয়নি। বলছে এবার অন্য এলাকার লোকেদের দেবে, পরেরবার আমাকে দেওয়া হবে। পরে খিচুরি ডিম দিয়ে বিদায় করছে। বাবলু কাকা ত্যাড়া মানুষ। বেশি কথা বললে ধমক দেয়। তাই আর কিছু বলার সাহস পাইনি।’
খুশি আরও বলেন, ‘এর আগে একবার আমাকে একটা ছাগল দিয়েছিলেন বাবলু কাকা। সেজন্য আমার কাছ থেকে নগদ ১৩০০ টাকা নিয়েছিলেন তিনি। এছাড়া পরবর্তীতে একটি গর্ভবতী ছাগলও নিয়েছিলেন।’
অন্যের বাড়িতে রান্নার কাজ করে সংসার চালানো এক গৃহবধূ নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমাদেরকে বাছুর দেওয়ার কথা বলে প্রশিক্ষণে ডেকে নেয়। এখানে আমরা বিভিন্ন গ্রামের দশজন নারী ছিলাম।’
বাছুর আনা-নেওয়ার গাড়ি চালক শুভ দাস বলেন, ‘ওইদিন আমার গাড়ি নিয়ে মথুরাপুর এলাকার একটি গরুর খামার থেকে দশটি বাছুর নিয়ে রেলবাজার বাবলু সাহেবের বাসার সামনে যাই। পরে অনুষ্ঠান শেষে ওখান থেকে ওই বাছুরগুলো আবার মথুরাপুরের একই খামারে নামিয়ে দেই। এর বেশি কিছু জানা নেই।’
এ বিষয়ে অভিযুক্ত এম এস আলম বাবলুর মুঠোফোনে বুধবার রাতে ও বৃহস্পতিবার একাধিক নাম্বার থেকে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। ফোন রিসিভ না করায় অভিযোগের বিষয়ে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিএনএফের উপ-মহাব্যবস্থাপক (কর্মসূচি) মোস্তফা কামাল ভূঞা বলেন, 'বিশেষ প্রকল্পের আওতায় মানবসেবা উন্নয়ন সংস্থা নামের এনজিওকে আমরা ৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছি। এর মধ্যে প্রথম অবস্থায় ৩ লাখ টাকা দিয়েছি। কার্যক্রমে সন্তোষজনক রিপোর্ট পেলে তাকে বাকি ২ লাখ টাকা দেওয়া হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ প্রকল্পে সংশ্লিষ্ট ইউএনও বা তার প্রতিনিধিকে একীভূত করে কাজ করার নির্দেশনা রয়েছে। কারণ প্রকল্প বাস্তবায়নের রিপোর্টে ইউএনওর প্রত্যয়ন লাগবে। ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়নের রিপোর্ট জমা দেওয়ার কথা রয়েছে। এখনও তার রিপোর্ট হাতে পাইনি। আমরা বিষয়টি পর্যক্ষেণ করছি। রিপোর্ট আসার পর যাচাই-বাছাই করে দেখব। গরমিল পেলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চাটমোহর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুসা নাসের চৌধুরী বলেন, ‘আমাকে অতিথি করে দাওয়াত দিয়েছিলেন। কিন্তু ব্যস্ততার কারণে যেতে পারিনি। প্রকল্পটি সম্পর্কে বিস্তারিত জানা নেই। তবে আমার অফিসের প্রত্যয়ন দেওয়ার কথা রয়েছে। তিনি প্রত্যয়ন নেওয়ার জন্য রিপোর্ট অফিসে জমা দিয়েছেন কি না দেখে বলতে পারব। তবে এ রকম অভিযোগ থাকলে বিষয়টি খতিয়ে দেখে সেই অনুযায়ী প্রত্যয়ন দেওয়া হবে।’