রাজু আহমেদ, রাজশাহী
প্রকাশ : ১৬ জানুয়ারি ২০২৫ ১১:০০ এএম
রাজশাহীর পবা উপজেলার বিদরপুরে অবস্থিত রহমান কোল্ডস্টোরেজে আলু বাছাইয়ের কাজ করছেন একদল শ্রমিক। সম্প্রতি তোলা। প্রবা ফটো
বিদুৎ বিল, ব্যাংক ইন্টারেস্ট ও ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণ দেখিয়ে হঠাৎ করে হিমাগারে আলু সংরক্ষণে ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজশাহী জেলার হিমাগারের মালিকপক্ষ। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আলু উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত কৃষক ও ব্যবসায়ীরা।
এদিকে কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের দাবি, একটি স্বার্থান্বেষী মহল তাদের অন্যায্য দাবি নিয়ে রাজশাহীর ছয়টি হিমাগারে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে।
রাজশাহী কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের দেওয়া তথ্যমতে, রাজশাহী জেলায় কোল্ড স্টোরেজ রয়েছে মোট ৩৬টি। এর অধিকাংশই জেলার পবা, তানোর, মোহনপুর, বাগমারা ও দুর্গাপুর উপজেলায় অবস্থিত। এগুলোতে আলুর ধারণক্ষমতা ৯৫ লাখ বস্তা। ওজনের পরিমাপে যা পাঁচ লাখ টন। কোল্ড স্টোরেজগুলোতে মালিকপক্ষের বিনিয়োগের পরিমাণ দেড় হাজার কোটি টাকা। প্রতি কোল্ড স্টোরেজে কর্মকর্তা ও কর্মচারী রয়েছেন গড়ে ৪০ জন। জেলায় এই সেক্টরে মোট কর্মরত কর্মচারী ও কর্মকর্তার সংখ্যা দেড় হাজার এবং শ্রমিক রয়েছেন ১১ হাজার। প্রায় দুই লাখ কৃষক ও ব্যবসায়ী এই কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত।
কৃষি বিভাগের দেওয়া তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে রাজশাহীতে ৩৭ হাজার ৬৬৭ হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ হয়েছে। এই পরিমাণ জমি থেকে ১০ লাখ টন আলু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের হিসাব অনুযায়ী উৎপাদিত আলুর ৫০ শতাংশ হিমাগারে সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।
হিমাগারের ভাড়াবৃদ্ধির প্রতিবাদে কৃষকরা স্থানীয় প্রশাসনসহ নিজেদের মধ্যে দফায় দফায় বৈঠক করেছেন।
আলুচাষিদের দেওয়া তথ্যমতে, লাভজনক হয়ে ওঠায় গত কয়েক বছর ধরে রাজশাহী জেলাজুড়ে আলুর আবাদ বেড়েছে। আলু তোলার সময় চাহিদা ও দাম কম থাকায় হিমাগারে সংরক্ষণের দিকে ঝুঁকে পড়েন কৃষকরা। রাজশাহীতে উৎপাদিত আলু দেশের আলুর চাহিদা পূরণে ভূমিকা রেখে চলেছে।
তানোর উপজেলার আলুচাষি সালাউদ্দিন বলেন, ‘গত বছর আমরা ৫০ কেজির একটি বস্তাপ্রতি আলু সংরক্ষণে স্টোরেজ ভাড়া দিয়েছি ২১০ টাকা। এটাকে পেইড বুকিং বলা হয়। এদিকে খোলা আলুর (লুজ বুকিং) ৬০ থেকে ৬৫ কেজি সংরক্ষণ ভাড়া গত বছর ছিল ২৭০ থেকে ২৮০ টাকা। এতে কেজিপ্রতি ভাড়া পড়ত প্রায় সাড়ে চার টাকা। এবার সেই ভাড়া বাড়িয়ে দ্বিগুণ অর্থাৎ আট টাকা করা হয়েছে।’
রাজশাহী জেলা আলুচাষি ও ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি নুরুল ইসলাম বলেন, ‘গত বছর রাজশাহীর হিমাগারে আলু সংরক্ষণের ভাড়া ছিল প্রতি কেজি চার টাকা। এজন্য প্রতিবছর কৃষক বা ব্যবসায়ীরা হিমাগারে অগ্রিম বুকিং দিয়ে থাকেন। তবে এবার আলুর আবাদ শুরু হলে আলুচাষি ও ব্যবসায়ীরা বুকিং দিতে গেলে তাদের জানানো হয় প্রতি কেজি আলুর সংরক্ষণ ভাড়া আট টাকা করা হয়েছে। এ নিয়ে আলুচাষিদের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে।’
এদিকে গত ২৬ ডিসেম্বর ও ১২ জানুয়ারি তানোরের গোল্লাপাড়া গ্রামে কোল্ড স্টোরেজে ভাড়াবৃদ্ধির প্রতিবাদে কয়েক হাজার আলুচাষি বিক্ষোভ-সমাবেশ করেন। সমাবেশ থেকে আলুচাষিরা আন্দোলনের ঘোষণা দেন। তারা বলেন, হিমাগারমালিকরা বর্ধিত ভাড়া প্রত্যাহার না করলে তারা হিমাগারগুলো ঘেরাও কর্মসূচির হুমকি দেন। সেই সঙ্গে তারা স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করেন। এ নিয়ে তারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। পাল্টা অভিযোগ করেছে হিমাগার মালিকপক্ষ। তাদের দাবি, তাদের ছয়টি হিমাগারে ভাঙচুরসহ অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। এই ঘটনায় তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
রাজশাহী কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ফজলুর রহমান বলেন, ‘বিদ্যুৎ বিল, ব্যাংক ইন্টারেস্টসহ হিমাগার পরিচালানার ব্যয় বেড়েছে। শ্রমিক ভাড়াও বেড়েছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়ানো হয়েছে তিনগুণ। এ কারণে আলু সংরক্ষণে ভাড়া বাড়ানোর প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। ২২-২৩ অর্থবছরে ব্যাংক ইন্টারেস্ট ছিল ৯ শতাংশ। ২৩-২৪ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬ শতাংশ। কয়েকটি কোল্ড স্টোরেজ এরই মধ্যে ঋণখেলাপি পর্যায়ে রয়েছে। এ ছাড়া ডলারের দাম বাড়ার ফলে যন্ত্রপাতির দামও বেড়েছে।’
ফজলুর রহমান আরও বলেন, ‘গত বছর ৫০ কেজির আলুর বস্তাপ্রতি নেওয়া হয়েছে ৩৪০ টাকা। কেজিপ্রতি হিসাবে যা দাঁড়ায় প্রায় সাত টাকা। বর্তমান বাজার অনুযায়ী তা আট টাকা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে মধ্যস্থতাকারীরা ৫০ কেজির বস্তার জায়গায় ৭০ থেকে ৮০ কেজির বস্তা রাখছে। এসব নিয়ে বলায় তারা কৃষকদের উত্তেজিত করে তুলেছে। তানোরের ছয়টি হিমাগারে তারা হামলা চালিয়েছে। এ ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরিসহ স্থানীয় প্রশানের সহযোগিতা কামনা করা হয়েছে।’
এ ব্যাপারে কথা বলতে রাজশাহী জেলা প্রশাসক আফিয়া আখতার ও তানোর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খায়রুল ইসলামের মোবাইল ফোনে কল দেওয়া হলেও তারা তা ধরেননি।