গাজীপুর প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৪ জানুয়ারি ২০২৫ ১৭:৪০ পিএম
আপডেট : ১৪ জানুয়ারি ২০২৫ ১৯:২৬ পিএম
জামাই বাজারে মাছ কিনছেন এক ক্রেতা। প্রবা ফটো
গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার বিনিরাইল গ্রামে প্রতিবছরের মতো এবারও উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হলো আড়াই শত বছরের প্রাচীন ‘জামাই মেলা’। মেলা যেন জামাই–শ্বশুরের বড় মাছ কেনার প্রতিযোগিতার মাঠ। জামাইরা যেমন বড় মাছ কিনে শ্বশুর বাড়ি নিয়ে যাওয়ার জন্য মেলায় আসেন, তেমনি শ্বশুররাও জামাইকে মেহমানদারি করার জন্য বড় মাছ কিনতে আসেন। এই জামাই মেলায় মাছ কিনতে দূর দূরান্ত থেকে ক্রেতারা আসেন।
মঙ্গলবার (১৪ জানুয়ারি) দিনব্যাপী ঐতিহ্যবাহী এ জামাই মেলার আয়োজন করা হয়।

বিনিরাইল গ্রামে প্রতিবছর অগ্রহায়ণের ধান কাটা শেষে পৌষ-সংক্রান্তিতে অনুষ্ঠিত হয় এ মেলা। মেলা প্রাঙ্গণে সকাল থেকেই বসে সারি সারি মাছের দোকান। সামুদ্রিক বড় মাছের পাশাপাশি এখানে দেশীয় প্রজাতির নানা মাছও বিক্রি হয়। ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে নানারকম সুর করেন দোকানিরা। কোন কোন দোকানি বড় মাছ মাথায় তুলে জানান দেন মেলার বড় মাছটি তিনি এনেছেন। দোকানীদের এমন চটকদারিতে ক্রেতারাও ঝুঁকছেন স্টলগুলোতে। মেলায় ৩ শতাধিক মাছের স্টল ছাড়াও রয়েছে আসবাবপত্র, খেলনা, মিষ্টি, নিমকি-মোরালি, হাওয়াই মিঠাই, বস্ত্র, হস্ত ও কুটির শিল্পের নানা পণ্যেরও বাহার।
কথিত আছে, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পূজা-অর্চনাকে ঘিরে পৌষ সংক্রান্তি উপলক্ষে ১৮ শতকে মেলাটির প্রচলন শুরু হয়। মূলত ‘মাছ মেলা’ হিসেবে শুরু হলেও পরবর্তীতে এটি জামাই মেলা নামে বেশি পরিচিতি পায়।

এলাকাবাসী জানান, প্রতি বছর মেলাকে কেন্দ্র করে গ্রামের শ্বশুররা তাদের মেয়ের জামাইকে বাড়িতে দাওয়াত দেন। মেয়েরা তাদের স্বামীদের নিয়ে বাবার বাড়িতে বেড়াতে আসেন। জামাইরা মেলা থেকে মাছ কিনে শ্বশুর বাড়িতে নিয়ে যান। তবে এখন শ্বশুররাও মেলা থেকে বড় মাছ কিনে জামাইদের জন্য কিনে নিয়ে যান। মেলা উপলক্ষে মেয়ের জামাইকে দাওয়াত করে আনা এই এলাকার মানুষের রীতিতে পরিণত হয়েছে। প্রতি বছর এই মেলায় দল বেঁধে বন্ধু বান্ধব নিয়ে তারা ঘুরতে আসেন। অনেক লোক সমাগম হয়।
মেলার মাছ ব্যবসায়িরা জানান, প্রতিবছরই এই মেলায় তারা আসেন। অন্য বছর বেচাকেনা ভালো থাকলেও এ বছর বেচাকেনায় খুবই মন্দা। মেলায় কেনার চেয়ে দর্শনার্থীদের ভীড় বেশি। তবে স্থানীয় মানুষের সাথে সম্পর্কের কারণে প্রতি বছরই আসেন বিক্রেতারা। ব্যবসার পাশাপাশি জামাই শ্বশুরের এই যুদ্ধ দেখতে বেশ ভালো লাগে বলেও জানান তারা।

মাছ কিনতে আসা এলাকার কয়েকজন জামাই জানান, তারা এ উপজেলায় বিয়ে করেছেন। প্রতিবছরই এ মেলা উপলক্ষে দাওয়াত করা হয় তাদের। এবারও শ্বশুর বাড়িতে নিমন্ত্রণ পেয়ে বউ নিয়ে বেড়াতে এসেছেন। আর বেড়াতে আসলেই মেলা থেকে বড় মাছ কিনে শুশ্বর বাড়িতে যান এবং দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এ মেলা তাদের মিলন মেলায় পরিণত হয়।
আয়োজকরা জানান, শুরুতে মেলা অনুষ্ঠিত হতো ক্ষুদ্র পরিসরে। এটি অগ্রহায়ণের ধান কাটা শেষে পৌষ-সংক্রান্তি ও নবান্ন উৎসবে আয়োজন করা হতো। এটি এক সময় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মেলার হলেও সময়ের পরিক্রমায় এ মেলাটি একটি সর্বজনীন উৎসবে রূপ নিয়েছে। ব্রিটিশ আমল থেকে আয়োজন করে আসা বিনিরাইলের মেলার বয়স আড়াই শ বছর ছাড়িয়েছে। তাই বেড়েছে মেলার পরিধিও। মেলাটি এখন স্থানীয়দের কাছে ঐতিহ্যে রূপ নিয়েছে।

কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তনিমা আফ্রাদ বলেন, ‘বিনিরাইলের মাছের মেলাটি স্থানীয় একটি ঐতিহ্য। বহু বছরের পুরনো এই মেলাকে ঘিরে স্থানীয়ভাবে রয়েছে নানা ধরণের কথা। তবে ইতিহাস ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে গ্রামগঞ্জে এ ধরণের আয়োজন সত্যি আমাদের চিরায়ত বাংলার রূপই ফুটে উঠে।