ঈশ্বরদী
মাহাবুবুর রহমান মিঠুন, ঈশ্বরদী (পাবনা)
প্রকাশ : ১৪ জানুয়ারি ২০২৫ ০৯:৪২ এএম
আপডেট : ১৪ জানুয়ারি ২০২৫ ১০:৩৮ এএম
পাবনার ঈশ্বরদীর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রথম সারির একটি হাসপাতাল। এটি উপজেলার কয়েক লাখ মানুষের ভরসার স্থল। কিন্তু সরকারি এই হাসপাতালের একমাত্র এক্স-রে রুমটি প্রায় বন্ধ থাকে। ফেলে সুচিকিৎসা থেকে রোগীরা বঞ্চিত হচ্ছে। এক্স-রে করাতে না পেরে দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে।
রোগীদের অভিযোগ, হাসপাতালের চিকিৎসকরা এক্স-রের জন্য নির্দিষ্ট একটি বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালে পাঠিয়ে থাকেন। এতে রোগীদের সময় ও টাকা দুই-ই বেশি লাগে। হাসপাতালের এক্স-রে রুমটি প্রায়ই বন্ধ থাকে। আবার এখানে রয়েছে জনবল সংকট; অপারেশন থিয়েটারের যন্ত্রপাতিও অচল। সেই সঙ্গে হাসপাতালে দালাল ও সিন্ডিকেটের উপদ্রব্যে রোগীরা দিশেহারা।
জানা গেছে, ৫০ শয্যায় উন্নীত করে ২০১১ সালে ঈশ্বরদীতে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উদ্বোধনের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা শুরু হয়। স্বাস্থ্যসেবায় বিশেষ অবদান রাখায় এটি ১২টি জাতীয় পুরস্কার ও পদক পেয়েছে। জরুরি প্রসূতি ও স্বাস্থ্যসেবা সুনিশ্চিত করায় বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে পুরস্কার অর্জনে সহায়তা করে। হাসপাতালের বহির্বিভাগে প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ জন রোগী চিকিৎসা নিতে আসে। তাদের অনেকেরই এক্স-রে দরকার হয়। কিন্তু এক্স-রে রুম বন্ধ থাকায় বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা বেশি দিয়ে রোগীদের এক্স-রে করাতে হচ্ছে।
এদিকে হাসপাতালে এক্স-রে রুমে পাঁচ বছর আগে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া একটি মেশিনে প্রাথমিক এক্স-রে কাজ করা হতো। পরে সেই মেশিন বিকল হওয়াতে বাইরে থেকে ফিল্ম কিনে তা চলমান রাখা হয়। তবে দুই বছর ধরে সেটাও বন্ধ। শুধু যক্ষ্মা রোগীদের এক্স-রে করা হয়।
সরেজমিন দেখা গেছে, হাসপাতালটির এক্স-রে রুমের দরজাটি তালাবদ্ধ। দরজায় ছোট্ট কাগজে লেখা রয়েছে ‘শুধুমাত্র যক্ষ্মা রোগীর এক্স-রে কার্যক্রম চলমান। যক্ষ্মা রোগী ব্যতীত অন্যান্য এক্স-রে সাময়িক সময়ের জন্য বন্ধ রয়েছে’।
এ সময় এক্স-রে রুমের সামনেই কয়েকজন রোগী অপেক্ষা করছিলেন। কথা হয় সাঁড়া গোপালপুর এলাকার মাহিদা খাতুনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘কিছুদিন ধরে বুকে ব্যথা করে। ডাক্তারের পরামর্শ নিলে তিনি যক্ষ্মা রোগের আশঙ্কা করে এখানে এক্স-রে করতে পাঠিয়েছেন। কিন্তু আধা ঘণ্টা ধরে দাঁড়িয়ে আছি। অথচ এক্স-রের রুমটি খুলছে না।’
পৌরশহরের ইব্রাহিম মিয়া নামে একজন বলেন, ‘একটি সরকারি হাসপাতাল। এখানে অন্যান্য এক্স-রে হয় না সেটা আমরা জানি। কিন্তু যক্ষ্মা রোগীর এক্স-রে হয় বলে জানি। কিন্তু এক্স-রে রুমের সামনে যক্ষ্মা রোগীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে ফিরে যান। এটি খোলা হয় না।’
কোমরের এক্স-রে করতে একটি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে যাচ্ছিলেন আফরোজা আক্তার নামে এক রোগী। তিনি ক্ষোভ ঝেড়ে বলেন, ‘প্রথম সারির একটি হাসপাতাল। অথচ তার এক্স-রে বন্ধ। যেখানে ২০০ টাকায় এক্স-রে করার কথা, সেখানে বাইরে গিয়ে ৬০০ টাকায় করতে হচ্ছে।’
এসব নিয়ে সোমবার (১৩ জানুয়ারি) পাবনা জেলা ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) কর্মকর্তারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পরিদর্শন করে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। এ সময় পাবনা জেলা ড্যাবের সাধারণ সম্পাদক ডা.আহমেদ মোস্তফা নোমান বলেন, ‘আমরা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় চিকিৎসা পৌঁছে দিতে ও দায়িত্বরত চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একতাবদ্ধ। ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ঘুরে ঘুরে সব দেখেছি; অনেক ত্রুটি চোখে পড়েছে, তাতে খুবই হতাশ হয়েছি।’
তিনি বলেন, ‘এক্স-রে কক্ষটা যাতে নিয়মিত চালু থাকে তা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বিশেষভাবে ভাবতে হবে।’
ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আলী এহসান বলেন, ‘আমাদের এই হাসপাতালের কিছু সংকট রয়েছে। শুধু যক্ষ্মা রোগীদের এক্স-রে করা হচ্ছে। অন্যান্য এক্স-রে করার মতো মেশিন নেই। আমরা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে রেখেছি। দেখা যাক কী হয়। আমরাও চাই এই হাসপাতালে পুরোপুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হোক।’
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি পরিদর্শনকালে আরও উপস্থিত ছিলেন- পাবনা মেডিকেল কলেজ শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ডা. সিরাজুল ইসলাম শুভ, পাবনা সদর হাসপাতালের অর্থোপেডিক্স সার্জন ডা. হাসানুজ্জামান টুটুল, পাবনা মেডিকেল কলেজ শিক্ষক সমিতির দপ্তর সম্পাদক ও ড্যাব সদস্য ডা. মশিউর রহমান মাসুদ, ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. শাহেদুল ইসলাম শিশির প্রমুখ।