× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

আমিনুলের ‘ময়ূরপঙ্খী’র আন্তর্জাতিক পুরস্কার

আব্দুর রহমান মিল্টন, ঝিনাইদহ

প্রকাশ : ১২ জানুয়ারি ২০২৫ ২১:৫৩ পিএম

আমিনুলের ‘ময়ূরপঙ্খী’র আন্তর্জাতিক পুরস্কার

ওয়ার্ল্ড ক্র্যাফটস কাউন্সিলের মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ‘অ্যাওয়ার্ড অব এক্সিলেন্স ফর হ্যান্ডিক্রাফটস-২০২৪’-এ বাংলাদেশের বিখ্যাত সূচিশিল্পী আমিনুল ইসলামের নকশিকাঁথা ‘ময়ূরপঙ্খী’ পুরস্কৃত হয়েছে। ঢাকার বেঙ্গল ফাউন্ডেশনে গত ৯ নভেম্বর এক অনাড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানে ইউনেস্কোর বাংলাদেশ প্রতিনিধি ড. সুজান ভিজ বিজয়ীদের হাতে সম্মাননা তুলে দেন। 

বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে সেরা কারুশিল্পীদের বৈচিত্র্যময় সব সামগ্রীর মধ্য থেকে বাংলাদেশের তিনটি পণ্য পুরস্কৃত হয়েছেÑ নকশিকাঁথা, জামদানি ও কাঠের গয়নার বাক্স।

ফুল, পাখি, গাছপালা, নদী, পিঠার নকশাসহ গ্রামের জীবনযাপন মিলিয়ে সূচিশিল্পী আমিনুল ইসলামের কাঁথায় ফুটে ওঠে বাংলাদেশি সংস্কৃতির আদি রূপ। একেকটি কাঁথা সেলাই করার জন্য প্রায় দেড় বছর সময় লাগে, বড় নকশিকাঁথাতে সময় বেশি দিতে হয় তার। প্রতিটি কাঁথার প্যাটার্ন, রঙের পরিকল্পনা, সেলাইয়ের নির্দেশনা সবকিছু আমিনুলই দেখভাল করেন।

আগে সূচিকর্মকে ‘মেয়েদের কাজ’ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। তাই সমাজের বিদ্রূপ আর তির্যক মন্তব্যের স্বীকার হয়েছিলেন আমিনুল। তার কাছের মানুষজন থেকেও রেহাই পাননি। একপর্যায়ে তিনি পণ করেন এ কাজ আর করবেন না। কিন্তু ভেতরের শিল্পী মনকে দমিয়ে রাখা তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। তাই বাধাকে খুব একটা তোয়াক্কা না করে আবার শুরু করেন।

ঝিনাইদহের শৈলকুপায় লক্ষণদিয়ার এক সাধারণ গ্রামীণ পরিবেশে বেড়ে ওঠেন আমিনুল। ৫৭ বছর বয়সি আমিনুল তার সাত ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট।

বালক বয়সেই আমিনুল তার মাকে অবসরে কাঁথা, টেবিল ক্লথ, রুমাল, বিছানার চাদর ইত্যাদি সেলাইয়ের কাজে ব্যস্ত দেখতেন। মায়ের হাতের হরেক রকম নকশায় রঙিন সুতার বুনন আমিনুলকে আকৃষ্ট করত। মায়ের পাশে বসে মুগ্ধ হয়ে সেসব কাজ দেখতেন, শিখতেন। মাঝেমধ্যে নিজেও চেষ্টা করতেন মাকে সাহায্য করার। ছোট ছোট হাতে রুমাল বা টেবিল ক্লথে মায়ের মতো করেই সেলাই করতেন। এভাবে কাঁথা বা কাপড়ে নকশা করে ফোঁড় দেওয়ার কাজে দক্ষ হয়ে ওঠেন তিনি। মায়ের হাত ধরেই সূচিশিল্পে তার যাত্রা শুরু হয়।

১৯৯০ সালে ঢাকায় পাড়ি জমান আমিনুল। মনের ভেতরে তখনও সূচিশিল্পের নকশা গেঁথে আছে। ফলে রাজধানীতে এসেই তিনি ঐতিহ্যবাহী নকশিকাঁথা নিয়ে কাজ করার স্বপ্ন বুনতে শুরু করেন।

তার লক্ষ্য ছিল হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করা ও নিজের ভালো লাগার কাজটি চালিয়ে যাওয়া। ১০ থেকে ১৫ জন নারী কর্মীকে নিয়ে শুরু হয় তার এ পথচলা। গড়ে তোলেন কারখানাও। কর্মীদের কেউ গ্রামে কাজ করতেন, আবার কেউ ঢাকার দক্ষিণখানের ফায়দাবাদে অবস্থিত তার কারখানায়ও। বর্তমানে কর্মীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫০ থেকে ৬০ জনে।

পুরোনো দিনের মোটিফ নিয়েই কাজ করেন তিনি। নকশিকাঁথার যে ঐতিহ্যবাহী রূপ, সেটিই সংরক্ষণ করার চেষ্টা করছেন। কাঁথার স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে সবকিছু নিজেই দেখেন। কর্মীদের হাতে কাজ তুলে দেন তবে কীভাবে কাজ হবে তা তিনিই ঠিক করে দেন।

এ কাঁথা বিক্রির মাধ্যম হিসেবে সূচিশিল্পী আমিনুল ইসলাম বেছে নিয়েছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে। ফেসবুকে তার ‘বাংলার সেলাই’ নামক একটি ব্যবসায়িক পেজ আছে, যেখান থেকে কেনাকাটা করে অনেকেই। আবার বন্ধু-বান্ধবদের মাধ্যমেও কেউ কেউ কিনতে আসে। তার আয়ের আরেকটি বড় উৎস হলো আড়ংয়ের সঙ্গে চুক্তি। প্রায় ৩০-৩৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে তার তৈরিকৃত পণ্য ক্রয় করছে আড়ং।

এখন পর্যন্ত তিন শতাধিক নকশিকাঁথা তৈরি করেছেন তিনি। বড় নকশিকাঁথার দাম ২৫ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত। অন্যদিকে ছোট নকশিকাঁথার দাম ৮ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকার মধ্যে। আমিনুল নকশিকাঁথার পাশাপাশি আড়ংয়ে অনেক জিনিস সাপ্লাই দেন। বেড কাভার, কুশন কাভার, পুরোনো দিনের মোটিফের কাজ, হাতের কাজের জামা ইত্যাদি তার কাছ থেকে কেনে।

আমিনুল বলেন, ‘নকশিকাঁথায় তার ব্যবসায়িক লাভ তেমন একটা নেই। তবে তাতে তার খারাপ লাগাও নেই। মূল লক্ষ্য ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখা।’

তিনি বলেন, ‘আমার মূল উদ্দেশ্যÑ আমি চাই পরবর্তী প্রজন্ম এ ঐতিহ্যকে জানুক, এটি রক্ষা করুক। আমাদের সংস্কৃতি যেন হারিয়ে না যায়।’

আমিনুল ব্যবসায়িকভাবে সূচিশিল্পের কাজ শুরু করেন ৩৫ বছর আগে। আগে তিনি হ্যান্ডক্রাফটের কাজ করতেন। কাঁথার কাজ করতেন না তখন। ১৫ বছর হলো নকশিকাঁথার কাজ করছেন। তবে ভাবেননি এ কাজ করে তিনি একদিন পুরস্কারও জয় করবেন। নকশিকাঁথা নিয়ে যে পুরস্কার আছে, সেটাই তিনি জানতেন না। বেঙ্গল ফাউন্ডেশন থেকে তাকে বলা হয়, কম্পিটিশনে নকশিকাঁথা পাঠাবেন কি না। তাদের কথায় পাঠিয়ে দেন, পরে পুরস্কারও পেয়ে যান। ‘বাংলার সেলাই’কে একটি ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চান তিনি। সঙ্গে নকশিকাঁথাকে পৌঁছে দিতে চান দেশের বাইরেও।

আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্ত সূচিশিল্পী আমিনুল ইসলাম জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে যেকোনো কাজের সর্বোচ্চ নৈপুণ্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এখানে হেলাফেলা করে করা কাজ মূল্যহীন। তাই কারুশিল্পীদের এসব ব্যাপারে ভীষণ সচেতন হতে হয়। নিজ দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্যকে ভালো করে বুঝতে ও সম্মান করতে হয়। নকশিকাঁথায় তার কাজটিতেও ছিল চাঁদ সওদাগরের কিছু উপাদান। উন্নত বিশ্বে মেশিনে করা কাজের চাইতে হাতে করা কাজের মূল্য অনেক বেশি। 

তিনি বলেন, ‘সবাই মিলে সচেতন হলে বিশ্ব মানদণ্ডে কারুশিল্পকে অনেক উচ্চে নেওয়া সম্ভব।’

স্ত্রী স্নিগ্ধা ইসলাম, ছেলে মাজাবিন আমিন ও মেয়ে আনুশকা বিনতে আমিনকে নিয়ে আমিনুল ইসলামের সংসার। বহুগুণের অধিকারী আমিনুল ইসলামের গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহের শৈলকুপার লক্ষণদিয়া গ্রামে ১৪ বিঘা জমির ওপর তার দ্বিতল-বিশিষ্ট একটি বাড়ি রয়েছে, যেটি গাছবাড়ি নামে পরিচিত। চিরসবুজ উদ্ভিদ ও গাছ দিয়ে মোড়ানো গাছের সংগ্রশালার বাড়িটিতে পাঁচ হাজার দেশি-বিদেশি গাছসহ নানা প্রজাতির গাছ রয়েছে। পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় তার এমন উদ্যোগ সারা দেশে ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছে ও আলোচিত হয়েছে। এটা বর্তমানে ঝিনাইদহ জেলার একটি অন্যতম পর্যটন এলাকা।

আমিনুল ইসলাম মূলত ঢাকায় বসবাস করলেও গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে আসা ও ছোটখাটো ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে ২০১৪ সালে ভবনটি তৈরি করেন। তিনি এই সংগ্রহশালায় বিরল প্রজাতির গাছ সংগ্রহের জন্য বেলজিয়াম, পর্তুগাল, মালয়েশিয়া, ভারত, দুবাইসহ অনেক দেশেই ঘুরেছেন। এখানে তিনি একটি নকশা তোলার কাজ ও সেলাই প্রকল্পও চালু করেছেন মায়ের নামেÑ আক্তার বানু সেলাই কেন্দ্র। এখানেও অনেক নারীর কর্মসংস্থান হচ্ছে এখন।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা