লালমনিরহাট প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৮ জানুয়ারি ২০২৫ ২০:৪৭ পিএম
বাঁয়ে বাবার সঙ্গে শিশু সাফওয়ান ডানে তার এক্স-রে রিপোর্ট। ছবি কোলাজ : প্রবা
অবুঝ শিশু সাফওয়ান একটি ধাতব মুদ্রা গিলে ফেলে। এতে করে শিশুটির শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। তড়িঘড়ি করে নেওয়া হয় ক্লিনিকে। করা হয় এক্স-রে। কিন্তু তাতে ধাতব মুদ্রাটির অস্তিত্ব শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। ওদিকে শিশুটির অবস্থা অনেকটা মরণাপন্ন হয়ে পড়ে। পরে নেওয়া হয় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে শিশুটির খাদ্যনালী থেকে মুদ্রাটি অপসারণ করা হয়। আর বেঁচে যায় শিশুটি।
গত বৃহস্পতিবার লালমনিরহাট জেলা শহরের ‘যমুনা ক্লিনিকে’ এমন ঘটনা। জানা যায়, ওই ক্লিনিকে শিশুটিকে নেয়ার পর সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক বা রেডিওলজিস্ট শিশুটির পেটের অংশে এক্স-রে করেন। ফলে মুদ্রার অস্তিত্ব ধরা পড়েনি। কেননা ধাতব মুদ্রাটি পেট নয় গলায় আটকে ছিল।
শিশুটির বাবা বিজিবি সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান জানান, একমাত্র ছেলে সাফওয়ান একটি কয়েন খেয়ে ফেলেছে- স্ত্রীর কাছ থেকে ফোনে এমন খবর পেয়ে তিনি তাড়াহুড়ো করে বাড়ি যান। তিনি নিজেও একজন মেডিকেল এ্যাসিসট্যান্ট। কাজ করেন লালমনিরহাট ১৫ বিজিবি'র অভ্যন্তরীণ স্বাস্থ্যসেবা টিমে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে খবর পেয়ে বাসায় পৌঁছেই তিনি ছেলেকে স্থানীয় যমুনা ক্লিনিকে গিয়ে সার্জারি বিভাগের চিকিৎসক বদিউর জামান রবিকে দেখান। ডা. বদিউর জামান লালমনিরহাট ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালের সার্জারি বিভাগে জুনিয়র কনসালট্যান্ট হিসেবে কর্মরত। তিনি শিশুটিকে দেখে এক্স-রে করাতে বলেন। এক্স-রে রিপোর্ট দেখে ডা. বদিউর বলেন, ‘শিশুটির শরীরের ভেতরে কিছু পাওয়া যায়নি। মোস্তাফিজুর ভালো করে দেখতে বলেন ডাক্তারকে। ডাক্তার আবারও বলেন, কিছু নেই। পরে ক্লিনিকটির পরিচালক আলহাজ্ব হোসেনকে অনুরোধ করেন যেন এক্স-রে করে আরেকবার করে ভালোভাবে দেখেন। পরিচালক আলহাজ্ব ক্লিনিকের রেডিওলজিস্টকে পুনরায় চেক করতে বলেন। রেডিওলজিস্ট নিশ্চিত করে বলেন, অপ্রত্যাশিত কোনো কিছুই শিশু সাফওয়ানের শরীরে নেই।
এ অবস্থায় ছেলেকে নিয়ে বাড়ি ফিরে যান মোস্তাফিজুর। সন্ধ্যার পর খেতে না পেয়ে শিশুটি বমি শুরু করলে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে সাফওয়ানের পরিবার। আবারও স্থানীয় ক্রিসেন্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টারে এক্স-রে করান। সেখানে স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যায় শিশুটির খাদ্যনালীতে একটি কয়েন আটকে আছে। পরে রাত ১০টার দিকে অ্যাম্বুলেন্সে রংপুরে নিয়ে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করান। পরদিন শুক্রবার ছুটির দিন হওয়ায় শনিবার সকালে সেখানকার চিকিঁসক এন্ডোস্কপির মাধ্যমে কয়েনটি বের করে আনেন। বর্তমানে শিশুটি সুস্থ রয়েছে।
ঘটনার বিষয়ে ডাক্তার বদিউর জামান রবি বলেন, ‘এখানে শিশুটির কোনো চিকিৎসা দেয়া হয়নি। আবারও সমস্যা হলে যোগাযোগ করতে বলেছিলাম।’
ক্লিনিকের পরিচালক আলহাজ্ব হোসেন বলেন, ‘ছোট্ট একটা ভুল হয়ে গেছে। শিশুটির গলা থেকে এক্স-রে করা হলে হয়তো প্রথমেই কয়েনটার অস্তিত্ব জানা যেত।
শিশু সাফওয়ানের বাবা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘ঘটনার পর আমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার পরামর্শে অভিযোগ করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ক্লিনিকের পরিচালক আলহাজ্ব হোসেনের অনুরোধে শেষ পর্যন্ত তা করিনি। তবে আমি চাই ঘটনাটি সবাই জানুক। আর কাউকে যেন এমন বিপদে পড়তে না হয়।’
স্থানীয় ভুক্তভোগী লোকজন জানান, লালমনিরহাটে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা ডায়াগনস্টিক ও প্যাথলজি সেন্টারগুলোর ভুতুড়ে রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে ভুল চিকিৎসায় বিপাকে পড়ছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা। আর্থিক ও মানসিক হয়রানির শিকার হচ্ছে রোগীর পরিবার। একাধিক ডায়াগনস্টিক সেন্টারের এমন ভুল রিপোর্টের চিকিৎসায় দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল।
এসব বিষয়ে বক্তব্য জানতে লালমনিরহাটের সিভিল সার্জন নির্মলেন্দু রায়কে মোবাইল ফোনে কল করলে তিনি রিসিভ না করে লাইন কেটে দেন।