আবু রায়হান তানিন, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ০৮ জানুয়ারি ২০২৫ ১১:৪৭ এএম
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাট-সংলগ্ন ডিসি পার্কে তৃতীয়বারের মতো শুরু হয়েছে ফুল উৎসব। ১৩৬ প্রজাতির লক্ষাধিক ফুল দিয়ে ১৯৪ একরজুড়ে সাজানো হয়েছে এবারের উৎসবস্থল। প্রবা ফটো
‘জোটে যদি মোটে একটি পয়সা, খাদ্য কিনিও ক্ষুধার লাগি/ দুটি যদি জোটে তবে অর্ধেকে ফুল কিনে নিও, হে অনুরাগী’Ñ কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত রচিত ‘ফুলের ফসল’ কবিতার বিখ্যাত দুটি চরণ। যেখানে কবি দুটি পয়সা জুটলে তার অর্ধেক দিয়ে ফুল কেনার জন্য আহ্বান জানিয়েছিলেন। ফুলের প্রতি কবির সেই আহ্বানের চেয়ে বেশি অনুরাগ দেখা যাচ্ছে চট্টগ্রামের ডিসি পার্কে গেলে। যেখানে ৫০ টাকা খরচ করে ফুল দেখতে যাচ্ছে মানুষ। একজন দুজন নয়, প্রতিদিন গড়ে ২৫ হাজার করে।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাট-সংলগ্ন ডিসি পার্কে এবার তৃতীয়বারের মতো শুরু হয়েছে ফুল উৎসব। ১৩৬ প্রজাতির লক্ষাধিক ফুল দিয়ে ১৯৪ একরজুড়ে সাজানো হয়েছে এবারের ফুল উৎসব। গত ৪ জানুয়ারি মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. শেখ আব্দুর রশীদ এই উৎসবের উদ্বোধন করেন। ডিসি পার্কে গিয়ে দেখা যায়, তেজদীপ্ত রোদের মধ্যেই পুরো উৎসবের এলাকাজুড়ে মানুষের ভিড়। ১৯৪ একরের যেদিকেই চোখ যায় শুধু মানুষ আর মানুষ। বেলা গড়ানোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছিল মানুষের ভিড়। স্কুলছাত্র থেকে হোটেল কর্মচারী, শিশু থেকে বৃদ্ধÑ সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মেলা যেন বসেছে এখানে।
ডিসি পার্কে ঢুকতেই একটি বেঞ্চে দেখা মিলল এক প্রৌঢ় দম্পত্তির। একটি বেঞ্চে পাশাপাশি বসে কথা বলছিলেন দুজন। পাশে গিয়ে কথা বলতেই লাজুক হেসে তাদের মধ্যে শ্যাম সুন্দর দাশ জানালেন, পাশেই তাদের বাসা। সাধারণত কোথাও স্ত্রী অনুরাধা দাশকে নিয়ে ঘুরতে যাওয়া হয় না। ঘরের কাছে এমন একটা আয়োজন হচ্ছে, তাই সুযোগ হাতছাড়া করেননি। কেমন লাগছেÑ এমন প্রশ্ন করতে বললেন, ‘অনেক সুন্দর। একসঙ্গে এত ফুলÑ এমন সুন্দর পরিবেশ দেখে মন ভালো হয়ে গেছে।’ শুধ শ্যাম সুন্দর কিংবা অনুরাধা নয়, বিভিন্ন বয়স ও শ্রেণি-পেশার অনেক মানুষই ফুলের এমন সমাহার উপভোগ করতে ফুল উৎসবে এসেছেন।
খবর নিয়ে জানা গেল, গত শনিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ১৬ হাজার টিকিট বিক্রি হয়েছে। আগের দিন এ সংখ্যা ছিল ১৫ হাজার। আগামী ৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকবে।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের সিনিয়র সহকারী কমিশনার আলাউদ্দিন বলেন, ‘দ্বিতীয় ফুল উৎসবে সব মিলিয়ে ৮ লাখ দর্শনার্থী এসেছিল। এবার প্রথম দিনে ১৫ হাজার এবং দ্বিতীয় দিনে এখন পর্যন্ত ১৬ হাজার দর্শনার্থী এসেছে।’ দ্বিতীয় ফুল উৎসবের হিসাব অনুযায়ী প্রতিদিন গড়ে ২৭ হাজারেরও বেশি মানুষ উৎসবে যোগ দেন।
ফুল উৎসবের প্রতি মানুষের এই উন্মাদনার কারণ সম্পর্কে সহজেই ধারণা পাওয়া যাবে রিয়াজ হোসেন আবিরের কথায়। চট্টগ্রামের একটি কলেজের ডিগ্রি দ্বিতীয় বর্ষে পড়েন এই শিক্ষার্থী একটি রেস্তোরাঁয় পার্টটাইম চাকরি করেন। দুই সহকর্মীসহ কর্মস্থল থেকে পার্কে এসেছেন তিনি। তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রামে এখন বিনোদনের জায়গা বলতে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত ছাড়া বলার মতো কিছু নেই। এই জায়গাটা অনেক খোলামেলা, পাশে সাগর-ম্যানগ্রোভ বন। একদম প্রাকৃতিক পরিবেশে ফুলের সমাহার একটা বাড়তি উন্মাদনা যোগ করেছে। এমনিতে খুব একটা অবসর পাই না। কাজের ফাকে একটু সুযোগ মেলায় সহকর্মীদের নিয়ে এলাম। বেশ ভালো লাগছে।’
২০২৩ সালে চট্টগ্রামের তৎকালীন ডিসি আবুল বাসার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামানের উদ্যোগে এই ফুল উৎসব যাত্রা শুরু করে। ফুল উৎসবের সেই ইতিহাস নিয়ে একটা স্মারক স্তম্ভ বসানো হয়েছে পার্কের ভেতর। সেখানে বলা হয়েছে, একসময় এই ১৯৪ একর সরকারি খাস ভূমি দখল করে মাদক ও নানা অবৈধ কর্মকাণ্ডের আখড়া বানিয়েছিল কিছু দখলদার। পরে ফখরুজ্জামান ডিসি হিসেবে যোগ দেওয়ার এক মাসের মাথায় তার নির্দেশনায় সীতাকুণ্ডের তৎকালীন এসিল্যান্ড আশরাফুল আলম এখানে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করেন। পরে ফখরুজ্জামান ও তার সহধর্মিণী তানজিয়া রহমানের পরিকল্পনায় এখানে ফুল উৎসব শুরু হয়। সামনের দিনে এখানে সাইক্লিং ট্র্যাক, ওয়াকওয়ে, ডেস্টিনেশন ওয়েডিং, ফেরিস হুইল, সমুদ্র পর্যন্ত উডেন ওয়াকওয়ে, কনভেনশন সেন্টার, বন্য প্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। স্তম্ভে এই পার্কের জন্য জেলার তৎকালীন এডিসি রাকিব হাসান, সীতাকুণ্ডের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহাদাত হোসেন, এএম রফিকুল ইসলাম, আশরাফুল আলমের প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এবারের মূল উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে পার্কের দুটি জলাশয়ের মধ্যে দক্ষিণ পাশের জলাশয়ের পশ্চিম পাড়জুড়ে। তার পাশেই লেডিস কর্নার ও জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থান কর্নার। জলাশয়ের পূর্ব প্রান্তে রয়েছে অস্থায়ী খেলার মাঠ, শিশু কর্নার, স্থায়ী ফুলের বাগান, ভিআইপি জোন ও রেস্টুরেন্ট। পাশের জলাশয়ের পুরো অংশের ওপর কাঠের কাঠামো বসিয়ে করা হয়েছে ভাসমান ফুলের বাগান, তার পশ্চিম পাশে সাংস্কৃতিক আয়োজনের জন্য করা হয়েছে মঞ্চ, যেখানে মাসজুড়ে চলবে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। পূর্ব পাশে গ্রামীণ মেলার স্টল ও শিশুদের জন্য অস্থায়ী পার্ক। গ্রামীণ মেলার অংশে বিভিন্ন লোকজ পণ্যের পসরা বসিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। কথা বলে জানা গেছে, এক মাসে প্রতিটি স্টলের জন্য তাদের গুনতে হচ্ছে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা করে।
সব মিলিয়ে ২০২৩ সালে শুরু হওয়া এই ফুল উৎসব চট্টগ্রামের মানুষের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। যেটি বুঝতে বাকি নেই মন্ত্রিপরিষদ সচিবেরও। উদ্বোধনকালে তিনি বলেছেন, টিকিয়ে রাখা গেলে মেজবানের মতো ফুল উৎসবও চট্টগ্রামের ঐতিহ্যে পরিণত হবে।