× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ঐতিহ্য

দুর্দিনেও টিকে আছে বাঁশ বেত শিল্প

সাইফুল হক মোল্লা দুলু, মধ্যাঞ্চল

প্রকাশ : ০৫ জানুয়ারি ২০২৫ ০৮:৫২ এএম

আপডেট : ০৫ জানুয়ারি ২০২৫ ২১:০০ পিএম

পাকুন্দিয়া উপজেলার কামালপুর, ষাইটকাহন ও ঘাগড়া গ্রাম ও বাজার থেকে তোলা। প্রবা ফটো

পাকুন্দিয়া উপজেলার কামালপুর, ষাইটকাহন ও ঘাগড়া গ্রাম ও বাজার থেকে তোলা। প্রবা ফটো

বাঙালি সংস্কৃতির ঐতিহ্য বাঁশ-বেত শিল্প আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে। নান্দনিক ও গ্রামীণ ঐতিহ্যের ধারক এই কুটিরশিল্পের দুর্দিন চললেও এখনও অনেকেই তাদের বাপ-দাদার আদি পেশাকে জীবিকার মাধ্যম হিসেবে ধরে রেখেছে। যদিও এই কুটিরশিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন স্থানীয় এই শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা। 

কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার বেশ কয়েকটি গ্রামের শতাধিক পরিবার এই বাঁশজাত শিল্পের ওপর নির্ভর করে তাদের জীবন-জীবিকা নির্বাহ করছে। ফলে আধুনিক সভ্যতার দাপটে একদিকে প্লাস্টিক সামগ্রীর বাজার দখল, অন্যদিকে বাঁশজাত শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল স্থানীয় বাজারগুলোতে মূল্যবৃদ্ধির কারণে বাঁশ ও বেতের তৈরির পণ্যের কদর কমে যাচ্ছে। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ এ পণ্যের প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে। তবে কিছু কারিগর বাঁশ দিয়ে খাঁচা তৈরিসহ নানা দর্শনীয় পণ্য তৈরির মাধ্যমে বাপ-দাদার পেশাকে টিকিয়ে রাখতে চেষ্টা করছেন।

জানা গেছে, উপজেলার কামালপুর, ষাইটকাহন এবং ঘাগড়া গ্রামের অন্তত দুই থেকে তিনশ পরিবার এখনও বাঁশ দিয়ে খাঁচা তৈরি করে বাপ-দাদার পেশা টিকিয়ে রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। আবার অনেকেই বেছে নিয়েছেন অন্য পেশা। দিন দিন বিভিন্ন জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে খাঁচা বানাতে খরচ বাড়লেও বাড়েনি এ শিল্পের তৈরি বিভিন্ন পণ্যের মূল্য। যে কারণে কারিগররা অর্থাভাবে জীবন সংসারে টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছেন। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও পেশা হিসেবে বাঁশ ও বেত শিল্পকে আঁকড়ে ধরে আছেন তারা। শিল্পটিকে টিকিয়ে রাখতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে পৃষ্ঠপোষকতা চেয়েছেন তারা। 

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এক সময় ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এ উপজেলায় বাঁশের চটা দিয়ে চাটাই, কুলা, ডালা, চাঙারি, টুকরি, ওড়া, চালুনি, মাছ রাখার খলই, ঝুড়ি ও হাঁস-মুরগির খাঁচাসহ বিভিন্ন জিনিস তৈরি করা হতো। পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও এ কাজে শামিল হতো। আর হাটবারে স্থানীয় বাজারে এমনকি বাড়ি বাড়ি ফেরি করে এসব বাঁশ-বেতের পণ্য বিক্রি হতো। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে এ শিল্পের মূল উপকরণ বাঁশের মূল্যবৃদ্ধিতে বাঁশ-বেতের কারিগররা তাদের পেশা ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। দিন যাচ্ছে আর এসব বিলুপ্তি হচ্ছে। চাহিদা কমে যাওয়ায় প্রতিযোগিতার বাজারে টিকতে না পেরে কারিগররা পূর্বপুরুষের পেশা ধরে রাখতে বাঁশ দিয়ে খাঁচা তৈরিতে ঝুঁকে পড়েন। ফলে বেকার হয়ে পড়েছে গ্রামীণ বাঁশ-বেতের কারিগররা। আধুনিক সভ্যতার দাপটে নানা কারণে লাভজনক না হওয়ায় অনেকেই এ পেশা ছেড়ে অন্য পেশা বেছে নিয়েছেন। ফলে মানবেতর জীবনযাপন করছেন এ পেশার লোকজন।

গত সোমবার সকালে সরেজমিন পাকুন্দিয়া উপজেলার কামালপুর, ষাইটকাহন ও ঘাগড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, এসব গ্রামের কম-বেশি সব বাড়িতেই বাঁশ দিয়ে খাঁচা তৈরি করা হচ্ছে। পুরুষের পাশাপাশি নারী ও শিশুরাও বাঁশ দিয়ে এসব খাঁচা তৈরি করছেন। বর্তমানে বেত তেমন সহজলভ্য না হওয়ায় বাঁশ দিয়েই বেশি এসব চিরচেনা পণ্য তৈরি করছেন কারিগররা।

ঘাগড়া গ্রামের বাসিন্দা জরিনা বেগম বলেন, স্বামীর বাড়িতে আসার পর থেকেই খাঁচা তৈরিতে স্বামীকে সহযোগিতা করছি। আমাদের এই এলাকার প্রায় বাড়িতেই বাঁশের তৈরি খাঁচা তৈরি করে পার্শ্ববর্তী কালিয়াচাপড়া বাজারে নিয়ে বেচা হয়। কী করব, বসে থাকার চেয়ে গ্রামের নারী-পুরুষরা এসব কাজ করে কোনো রকমে সংসার চালাচ্ছে।

ষাইটকাহন গ্রামের আমেনা আক্তার বলেন, ছোটবেলা থেকেই বাবার সঙ্গে খাঁচা তৈরির কাজ শিখেছি। এখন স্বামীর বাড়িতে গিয়েও এইসব খাঁচা তৈরি করে বিক্রি করি। তবে কোনো সময়ই এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে কোনো সহযোগিতা মেলেনি বলে তিনি দাবি করেন।

কারিগর মনজিল মিয়া বলেন, আমাদের গ্রামের শত শত পরিবার এই পেশায় জড়িত। আমাদের বাপ-দাদার পেশা এটা। সময়ের ব্যবধানে এই শিল্পে ধস নেমেছে। চাহিদা কমায় অনেকে পেশা পরিবর্তন করে অন্য পেশায় চলে গেছে। তবুও বাপ-দাদার পেশাকে আঁকরে ধরে রেখেছি। 

তিনি বলেন, আগে বাঁশের তৈরি এইসব জিনিস বাজারে বিক্রি করেছি, তখন লাভ হতো। কিন্তু এখন তেমন লাভ হয় না। রাত-দিন খেটে যা তৈরি করি হাটবাজারে সে তুলনায় বিক্রি নেই। তবে সরকারিভাবে প্রণোদনা কিংবা সুদমুক্ত ঋণের ব্যবস্থা হলে আবারও এই শিল্প ঘুরে দাঁড়াতে পারে এবং এ পেশার সঙ্গে জড়িতদের জীবনমান উন্নয়ন হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘পেশা ছেড়ে দিয়ে এখন অটোভ্যান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছি। একসময় বাঁশ ও বেত ঝাড় থাকায় বাঁশের তৈরি শিল্পের প্রচুর ব্যবহার ছিল। কিন্তু আগের মতো এখন বাঁশঝাড় আর বেত চোখে পড়ে না। আধুনিক সভ্যতার দাপটে একদিকে যেমন গ্রামীণ অর্থনীতির চালিকাশক্তি কুটির শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তেমনি নিঃস্ব হচ্ছে সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী পরিবারগুলো।

কারিগর হারিছ মিয়া বলেন, ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি আমার বাবা বাঁশ দিয়ে খাঁচা তৈরি করছেন। এর ধারাবাহিকতায় আমিও এ কাজ শিখেছি এবং এই পেশায় সংসার চালাচ্ছি। তবে এ কাজে তেমন একটা সুবিধা করতে পারছি না। বেকারত্ব দূর করা আরকি। 

তিনি আরও বলেন, খাঁচা তৈরিতে এক ধরনের বাঁশ ব্যবহার করা হয়। পুলেরঘাট (কালিয়াচাপড়া) বাজার থেকে ১০০ থেকে ৩৫০ টাকায় একটি বাঁশ কিনি। একটি বাঁশ দিয়ে ১০ থেকে ১২টি খাঁচা তৈরি হয়। এর ওপড়ে রয়েছে পরিবহন খরচ। পাশাপাশি বেড়েছে অন্য খরচ। ছোট আকারের খাঁচা ৫০ থেকে ৬০ টাকা, মাঝারি আকারের খাঁচা ৭০ থেকে ৮০ টাকা এবং বড় আকারের খাঁচা ১০০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হয়। 

এ বিষয়ে বাঁশের তৈরি শিল্প বিক্রেতা ফরিদ বলেন, আগে বাঁশের তৈরি জিনিসপত্র নিজেরা বাড়িতে তৈরি করে বাজারে বিক্রি করেছি, তখন লাভ হতো। কিন্তু এখন তেমন লাভ হয় না। রাত-দিন খেটে যা তৈরি করি হাটবাজারে সে তুলনায় বিক্রি নেই। সরকারিভাবে কোনো সাহায্যে সহযোগিতাও পাচ্ছি না। অনেক দুঃখকষ্টে দিন কাটছে আমাদের। অভাবের কারণে অনেকেই অন্য পেশায় চলে গেছেন। উপযুক্ত কাজ এবং অভিজ্ঞতার অভাবে আমরা অন্য পেশায় যেতে পারিনি।

এলাকাবাসী জানান, একসময় বাঁশ-বেত শিল্পের পণ্যের বেশ চাহিদা ছিল। সময়ের বিবর্তনে প্রতিযোগিতা বাজারে টিকতে না পেরে শিল্পটি হারিয়ে যেতে বসেছে। এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সুদমুক্ত ঋণের ব্যবস্থা করা গেলে কারিগরদের জন্য সহায়ক হতো। 

পাকুন্দিয়া উপজেলা কৃষি অফিসার নূর-ই-আলম বলেন, ‘বাঁশ ও বেত শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে সুদমুক্ত ঋণ দেওয়া প্রয়োজন। আর্থিক সহযোগিতা এ পেশা টিকিয়ে রাখতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। গ্রামীণ অর্থনীতির চালিকাশক্তি ক্ষুদ্র কুটিরশিল্প রক্ষার্থে উপজেলা কৃষি অফিস কাজ করছে।

পাকুন্দিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. বিল্লাল হোসেন বলেন, ঐতিহ্যবাহী এ শিল্পটিকে যুগোপযোগী করতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা