রাজঘাট চা-বাগান লেক
ইসমাইল মাহমুদ, মৌলভীবাজার
প্রকাশ : ০২ জানুয়ারি ২০২৫ ১৩:৪২ পিএম
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের রাজঘাট চা-বাগানের লেকে ঝাঁকে ঝাঁকে পরিযায়ী পাখি। প্রবা ফটো
মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার ৭ নম্বর রাজঘাট ইউনিয়নে অবস্থিত দ্য কনসোলিডেটেড টি অ্যান্ড ল্যান্ডস কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেডের মালিকানাধীন রাজঘাট চা-বাগান। এর তিন পাশে উঁচু-নিচু টিলা আর এক পাশে সড়কের মাঝে সমতলে অবস্থিত সুবিশাল একটি প্রাকৃতিক জলাধার। এই লেক বা হ্রদ স্থানীয় চা শ্রমিকদের কাছে পরিচিত ‘বাঁধ’ হিসেবে। প্রায় ১০ একর আয়তনের মোহনীয় এ লেকের নীল জলে ফুটে রয়েছে লাল শাপলা। তিন পাশে চা-বাগান ঘেরা পুরো লেকজুড়ে রয়েছে প্রচুর কচুরিপানা। স্বচ্ছ নীল জলের এ জলাধারের ওপরে ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে বেড়াচ্ছে পরিযায়ী পাখি। হাজার-হাজার অতিথি পাখির ঝাঁকে ঝাঁকে আকাশে উড়ে বেড়ানো, জলাশয়ের নীল জলে খুনসুঁটি, জলাশয় ঘিরে পাখির মধুময় কুঞ্জনে এখন মুখরিত পুরো রাজঘাট বাগান এলাকা।
সম্প্রতি শ্রীমঙ্গল শহর থেকে প্রায় ১৯ কিলোমিটার ও মৌলভীবাজার জেলা সদর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত রাজঘাট লেক এলাকায় গিয়ে দেখা যায় বাগানের ৯, ১০ ও ১১ নম্বর সেকশনের টিলা থেকে লেকের পাড় পর্যন্ত উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্ব পাশে অবারিত চা-বাগান। লেকের পশ্চিম পাশে উদনাছড়া ও বিদ্যাবিল চা-বাগানে যাওয়ার রাস্তা। মোহনীয় রাজঘাট লেকটি অপার সৌন্দর্যময়। আর শীত মৌসুমে হাজার হাজার পরিযায়ী পাখিদের আগমন এটির সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ। পাখির কিচিরমিচির শব্দ, ঝাঁকে ঝাঁকে ডানা মেলে মুক্ত আকাশে উড়ে চলা, লেকের স্বচ্ছ নীল জলে জলকেলি, খাবারের সন্ধানে লেকের সর্বত্র বিচরণ দেখতে প্রতিদিন শত শত মানুষ ভিড় করছে লেক এলাকায়। নির্জন রাজঘাট চা-বাগানের অভ্যন্তরে অবস্থিত এ লেকে অবস্থানকারী পরিযায়ী পাখির কিচিরমিচির আর জলকেলি এখানে আগত পর্যটক ও বাগানের রাস্তায় চলাচলকারী পথচারীরা মনের আনন্দে উপভোগ করছে। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকরা আসতে শুরু করেছে এখানে।
রাজঘাট চা-বাগানের শ্রমিক সন্তোষ তাঁতি বলেন, ‘আমাদের বাগানের সৌন্দর্যময় এ বাঁধে সব সময় পানি থাকে। শুষ্ক মৌসুমেও বাঁধটি শুকায় না। এ বাঁধের পানি শুষ্ক মৌসুমে বাগানের আশপাশের সেকশনগুলোর চা গাছগুলোকে সতেজ রাখতে ব্যবহৃত হয়। প্রতি বছর ঠান্ডা (শীত) বাড়লে এ বাঁধে অতিথি পাখিরা আসে বিভিন্ন দেশ থেকে। এ সময় সকাল ও সন্ধ্যায় পাখিরা বাঁধে খেলা করে। প্রতি বছর অক্টোবর মাসের শেষ সময় থেকে কিছু কিছু পাখি আসা শুরু করে। ডিসেম্বর মাসে পুরো বাঁধ চলে যায় পাখিদের দখলে। জানুয়ারি মাসের শেষ পর্যন্ত পাখিরা এখানে থাকে। বছরের ওই চার মাস পাখি দেখার জন্য ঢাকা-চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলা থেকে অনেক মানুষ আসে এখানে। কেউ যাতে পাখিদের মারতে না পারে বা পাখিদের কোনো ধরনের সমস্যা করতে না পারে সেজন্য বাগান কর্তৃপক্ষ এখানে নিয়মিত পাহারার ব্যবস্থা করেছে। সব সময় চৌকিদার থাকে এখানে।’
একই বাগানের জয়রাম তাঁতি বলেন, ‘শীতের সময় ৩-৪ মাস পাখিরা এখানে থাকে। বৃষ্টি শুরু হলে তারা বিদায় নেয়। কয়েক বছর ধরে এ বাঁধে এভাবে পাখিরা আসছে-যাচ্ছে। এখানে চৌকিদার ছাড়াও আমরা বাগানের অন্যান্য শ্রমিক পাখিদের দেখাশোনা করি। আমাদের বড় সাবও (ম্যানেজার) বলেছেন এখানের পাখিরা আমাদের মেহমান। তাদের কেউ যেন না মারতে পারে তার খেয়াল রাখার জন্য।’
ঢাকা থেকে পাখি দেখতে আসা সুমনা পাল চৌধুরী বলেন, ‘আমি প্রতি বছর শীত মৌসুমে সপরিবারে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত উপজেলা শ্রীমঙ্গল ভ্রমণে আসি। আর শ্রীমঙ্গলে আসার পর প্রথমেই ভ্রমণ করি এই রাজঘাট লেকটি। লেকের জলে পাখিরা যখন ঘুরে বেড়ায়, স্বচ্ছ জলে জলকেলি করে, কিচিরমিচির শব্দ করে, তখন মন ভরে যায়। যারা শ্রীমঙ্গল ভ্রমণ করে তাদের আমি বলব নানা জাতের পাখি দেখতে হলে অবশ্যই অন্যান্য পর্যটন স্পটের সঙ্গে রাজঘাট লেকটিকে তালিকায় রাখবেন।’
সৌখিন ফটোগ্রাফার কাজল হাজরা বলেন, ‘আমি প্রতি শীত মৌসুমেই রাজঘাট লেকে আসি পাখিদের ছবি তুলতে। এখানে সরালী হাঁস, পানকৌড়ি, লালচে বক, কালো লেজ জৌরালীসহ নানা ধরনের পরিযায়ী পাখি আসে প্রতি বছর। লেকটির পাশের টিলার ওপর থেকে পাখিদের ছবি তোলা যায়। রাজঘাট লেক এলাকায় আসা পরিযায়ী পাখিদের যেন কেউ শিকার করতে না পারে সে ব্যাপারে বাগান কর্তৃপক্ষ সতর্ক ও সজাগ রয়েছে। সেজন্য বাগান কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানাই।’
কীভাবে যেতে হবে রাজঘাট লেকে
দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে ট্রেন, বাস বা প্রাইভেট গাড়িযোগে আসতে হবে সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলার চায়ের রাজধানী ও পর্যটন নগরী হিসেবে পরিচিত শ্রীমঙ্গল উপজেলা সদরে। শ্রীমঙ্গল শহর থেকে সিএনজি অটোরিকশা, জিপ ইত্যাদি গাড়িতে করে ৭ নম্বর রাজঘাট ইউনিয়নের রাজঘাট চা-বাগানের চৌমুহনায় পৌঁছতে হবে। রাজঘাট চা-বাগানের চৌমুহনা থেকে দক্ষিণমুখী বিদ্যাবিল চা-বাগান সড়কে চা কারখানা থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার পিচঢালা পথ এগোলেই রাস্তার বাম পাশে দেখতে পাওয়া যাবে আকর্ষণীয় লেকটি। শ্রীমঙ্গল শহর থেকে রাজঘাট লেক পর্যন্ত সিএনজি অটোরিকশা ভাড়া নেবে ৮০০-১০০০ টাকার মধ্যে।