সচিবালয়ে আগুন
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৭ ডিসেম্বর ২০২৪ ০৯:২৯ এএম
আপডেট : ২৭ ডিসেম্বর ২০২৪ ১১:৩৭ এএম
প্রবা ফটো
প্রশাসনের প্রাণ সচিবালয়ে ভয়াবহ আগুনের ঘটনায় দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার পাশাপাশি মানুষের মনে নানারকম সন্দেহেরও জন্ম দিয়েছে। এটি নিছক দুর্ঘটনা নাকি নাশকতা, তা নিয়ে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠাও। সরকার, রাজনৈতিক দল ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টদের একটাই প্রশ্নÑ সচিবালয়ের মতো জায়গায় কীভাবে এত বড় ঘটনা ঘটল? এরই মধ্যে অনেকেই গত বুধবার (২৫ ডিসেম্বর) রাতে সচিবালয়ের সাত নম্বর ভবনের অগ্নিকাণ্ডকে পরিকল্পিত বলে তাদের সন্দেহের কথা প্রকাশ্যে জানিয়েছেন। তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাসহ দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা তদন্ত শেষ হওয়ার আগে আগুনের কারণ নিয়ে কিছু বলতে নারাজ। অন্যদিকে রাজনৈতিক দল ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শীর্ষ নেতারা তাদের জোরালো সন্দেহের তীর ছুড়ে দিয়ে বলেছেনÑ এটি পরিকল্পিত ঘটনা।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ৭ নম্বর ভবনের প্রতিটি দপ্তরের সিসিটিভি ভিডিও সংগ্রহ করার কথা বলেছেন। রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছেন, ‘ভেতরে থাকা সিসি ক্যামেরার ভিডিও এরই মধ্যে সংগ্রহ করা হয়েছে।’ তবে ভিডিওতে অগ্নিকাণ্ডের কারণ বোঝা গেছে কি না, তা স্পষ্ট করেননি জাহাঙ্গীর আলম। সাংবাদিকদের তিনি তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করার কথা বলেছেন।
এদিকে থানা পুলিশ, র্যাব ও ডিবির একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগুনের পর সাত নম্বর ভবনের ভেতরে কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা বা ফুটেজ তারা পাননি। ভবনের বাইরে কিছু সিসি ক্যামেরা আছে, কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকায় অগ্নিকাণ্ডের আগে-পরের ফুটেজ পাওয়া যায়নি। ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহের চেষ্টা চলছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
এদিকে সচিবালয়ে কর্মরত একাধিক কর্মকর্তা বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, সচিবালয়ে কোনো ধরনের বৈদ্যুতিক ত্রুটি থেকে একসঙ্গে ভবনের বিভিন্ন জায়গায় আগুন লাগবে, এটা তারা বিশ্বাস করেন না। তাদের মতে, এ আগুন পরিকল্পিতভাবেও লাগানো হতে পারে।
আগুনে সচিবালয়ের সাত নম্বর ভবনের ছয়, সাত, আট ও নবম তলা পুড়েছে। ভবনটির পূর্ব ও পশ্চিম পাশে এবং মাঝ বরাবর আগুনে পোড়া কালো ক্ষত হয়ে আছে। পূর্ব পাশে সাত ও আটতলায় কালো ক্ষতচিহ্ন রয়েছে। এসব দেখে প্রত্যক্ষদর্শীরাও এটি পরিকল্পিত কি নাÑ এমন প্রশ্ন তুলেছেন। সচিবালয়ের ১২টি ভবনের মধ্যে এক নম্বর ভবনটি অগ্নিঝুঁকির তালিকায় ছিল। সাত নম্বর ভবনটি ছিল সুরক্ষিত। ফলে সেখানে আগুন লাগার ঘটনা সন্দেহের উদ্রেক করে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে।
ওই সাত নম্বর ভবনে রয়েছে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দপ্তর। এই ভবনে রয়েছেÑ পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়; যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়; ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়; ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ; স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়; স্থানীয় সরকার বিভাগ; পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ; শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়; অর্থ মন্ত্রণালয়, অর্থ বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ; সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়; সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা নাহিদ হোসেন ও আসিফ মাহমুদের দপ্তরও এই ভবনে। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় (এলজিআরডি) এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া আগুনের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তরুণ এই উপদেষ্টা তার ফেসবুক পোস্টে লেখেন, ‘বিগত সময়ে হওয়া অর্থ লোপাট, দুর্নীতি নিয়ে আমরা কাজ করছিলাম। কয়েক হাজার কোটি টাকা লুটপাটের প্রমাণও পাওয়া গিয়েছিল।’ গতকাল ঘটনাস্থল পরিদর্শনকালে তিনি বলেন, ষড়যন্ত্রকারীরা থেমে নেই। আমাদেরকে ব্যর্থ করার এই ষড়যন্ত্রে যে বা যারাই জড়িত থাকুক, তাদের কাউকেই বিন্দু পরিমাণ ছাড় দেওয়া হবে না।
উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ আরও বলেন, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের বিগত সময়ে হওয়া অর্থ লোপাট, দুর্নীতি নিয়ে আমরা কাজ করে যাচ্ছিলাম। কয়েক হাজার কোটি টাকা লুটপাটের প্রমাণও পাওয়া গিয়েছিল।
জাতীয় নাগরিক কমিটির মুখ্য সংগঠক ও জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক সারজিস আলম ফেসবুকে লিখেছেন, ‘বিগত ১৬ বছরে আওয়ামী লীগের যারা চাটার দল ছিল, তাদের মধ্যে অন্যতম স্টেকহোল্ডার ছিল আমলাদের বৃহৎ একটা অংশ। এদের ওপর ভর দিয়েই হাসিনা এই দেশে তার ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছিল। যখনই বিপ্লবীরা হাসিনার অপকর্ম, চুরি, লুটপাট, দুর্নীতির দিকে নজর দিয়েছে, সেগুলোর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে, তখনই সচিবালয়ে ঘাপটি মেরে থাকা হাসিনার দালালরা বিভিন্ন অপকর্মের ফাইলগুলোকে আগুনে পুড়িয়ে দিল।’ ঘাপটি মেরে থাকা ষড়যন্ত্রকারীদের শেকড় উপড়ে ফেলতে তার সহযোদ্ধা থেকে এখন উপদেষ্টার পদে থাকা নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ ও মাহফুজ আলমের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
আগুনের ঘটনাকে নাশকতা মনে করছেন কি নাÑ সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, প্রাথমিকভাবে আমরা বলতে পারব না। এটা ইনভেস্টিগেশনের পরে বলতে পারব। সচিবালয়ের মতো এত সুরক্ষিত জায়গায় আগুন লাগার কারণ নিয়ে তিনি বলেন, অ্যাক্সিডেন্ট তো সব জায়গায় হতে পারে, এজন্যই তো অ্যাক্সিডেন্ট বলে। সচিবালয়ের ভেতরেও তো হতে পারে।
ফায়ার সার্ভিসও অগ্নিকাণ্ডের কারণ বা ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণের বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেনি। তবে বাহিনীর মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাহেদ কামাল ধারণা করছেন, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট অগ্নিকাণ্ডের কারণ হতে পারে। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, আগুন লাগার কারণ সম্ভবত ইন্টেরিয়র ডেকোরেশন ছিল। এক জায়গায় আগুন ধরলে বিদ্যুৎ লাইনের মাধ্যমে সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। এটা হতে পারে। আমরা যতটুকু জানতে পেরেছি, তিনটি জায়গায় একসঙ্গে আগুন দেখা গেছে। যখন স্পার্কিং হয়, যদি বিদ্যুৎ লাইনের শর্টসার্কিট হয়, এটা হতে পারে। কিন্তু এটাই হয়েছে, তা আমরা বলব না। এজন্য তদন্ত শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা এটা এখনও নিশ্চিত বলব না, যতক্ষণ পর্যন্ত না আমরা তদন্ত শেষ করছি।
ফায়ার সার্ভিসের সাবেক কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরাও প্রশ্ন তুলেছেন সচিবালয়ের ভেতরে থাকা ফায়ার সার্ভিস টিমের ব্যর্থতা নিয়ে। ভেতরে সিকিউরিটির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা। এখানে তৃতীয় কোনো পক্ষ সুযোগ নিয়ে আগুন লাগিয়েছে বলে সন্দেহ করছেন তারা।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ইঞ্জিনিয়ার আলী আহমেদ খান গণমাধ্যমকে বলেন, এটা নাশকতামূলক হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। আগুনটা শর্টসার্কিট থেকে হলে একসঙ্গে ৩-৪ জায়গায় লাগার কথা নয়। দুর্বৃত্তদের লাগানো আগুনেই এমনটা হয়। আমি ভোররাত থেকে এই আগুন ফলো করেছি। আমার কাছে মনে হয়েছে এটা স্যাবোটাজ (নাশকতা)। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে মনে হয়েছে, এটা লাগানো আগুন, শর্টসার্কিটের আগুন কখনও এভাবে লাগে না। এর মধ্যে কাল তো সচিবালয় বন্ধ ছিল। সুতরাং সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ রয়ে যাচ্ছে। স্ট্যান্ডার্ড গার্মেন্টসে লাগা আগুনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ফায়ার সার্ভিসের সাবেক এই কর্মকর্তা বলেন, দুর্বৃত্তরা যখন আগুন লাগায় তখন একসঙ্গে একাধিক স্থানে আগুন লাগে। এমন দুর্বৃত্তায়নের আগুন আমি আগেও দেখেছি। এখানেও (সচিবালয়) তাই হয়েছে। এটা শর্টসার্কিট না। এ আগুন লাগানো হয়েছে। এই ঘটনাকে নাশকতা বিবেচনায় অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে দেখার অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, এটা তো ডিজাস্টার, স্যাবোটাজ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। যেটা পরে অন্য জায়গাতেও হতে পারে। এমন ঘটনা খুবই দুর্ভাগ্যজনক।
ফায়ার সার্ভিসের সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবু নাঈম মো. শহীদুল্লাহ গণমাধ্যমকে বলেন, এই আগুন যে স্যাবোটাজ, অবশ্যই এটা সন্দেহের শুরুতে রাখতে হবে। লাগানো আগুন হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। এটা কেপিআইভুক্ত এলাকা। আমাদের এখন চ্যালেঞ্জিং সময় যাচ্ছে। এটা ধরে নিতে হবে যে, এই আগুনের মোটিভ কী হতে পারে? এই চ্যালেঞ্জিং সময়ে সচিবালয়ের চারটা ফ্লোরে আগুন, যেখানে চারটা কমিশন চলছে। যেখানে বিভিন্ন ধরনের নথিপত্রের প্রয়োজন হবে। এই আগুনের টার্গেটই হচ্ছে সেই গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র পুড়িয়ে দেওয়া। যে উচ্চপদস্থ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, তাদেরকে সবকিছুর আগে বিবেচনায় রাখতে হবে যে এটা স্যাবোটাজ। যদি প্রথমেই ‘স্যাবোটাজ’ না ধরে তদন্ত করা হয় তাহলে ভুল হবে। এখানে তো বাইরের লোক ছিল না। শুধু ওখানকারই লোকজন ছিল। এত রাতে আগুন লাগল। সেখানে তো ফায়ার প্ল্যান্ট থাকার কথা। যে ভবনে আগুন লেগেছে সেখানে কারা নিয়োজিত ছিল? ফায়ার সার্ভিসের কারা ছিল। ফায়ারের ইক্যুইপমেন্ট কাজ করেছে কি না? এসব বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, আগে দেখতে হবে সেখানে মানুষ ছিল কি না? সেখানে মশার কয়েল, রান্নার হিটার বা সিগারেট ছিল কি না? মানুষ না থাকলে এসব থাকার কথা নয়। মানুষ না থাকলে তো বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকার কথা। সেটা বন্ধ করা না থাকলে ইনটেনশনটা বুঝতে হবে।
মেলেনি সিসিটিভি ক্যামেরা
থানা পুলিশ, র্যাব ও ডিবির একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে এই তথ্য জানা গেছে, সচিবালয়ের সাত নম্বর ভবনের ভেতরে কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা বা ফুটেজ মেলেনি। বিদ্যুৎ না থাকায় অগ্নিকাণ্ডের আগে-পরের ফুটেজ পাওয়া যায়নি।
র্যাবের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ঘটনার পরপর র্যাবের গোয়েন্দারা ঘটনাস্থলে যান। তারা আগুনের ঘটনার রহস্য উদঘাটনে কাজ করছেন। ডিবির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, আমরা সচিবালয় ও আশপাশের এলাকায় নজরদারি চালাচ্ছি। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তাও নেওয়া হচ্ছে। তবে কোনো ফুটেজ পাওয়া যায়নি।
রমনা বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মাসুদ আলম বলেন, যতটুকু জানতে পেরেছি ভবনের ভেতরে কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা নেই। তবে বাইরে বা গেটে আছে। সেটার ফুটেজ খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি।