ফায়ার ফাইটার নয়নের মায়ের আর্তনাদ
মিঠাপুকুর (রংপুর) প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৬ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৮:৩৮ পিএম
আপডেট : ২৬ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৮:৩৮ পিএম
ছেলেকে হারিয়ে শোকে কাতর নিহত ফায়ার ফাইটার সোহানুর জামান নয়নের মা বুকফাটা আর্তনাদ আর আহাজারি করে বারবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলছেন। সচিবালয়ের আগুন নেভাতে গিয়ে ট্রাকের নিচে পিষ্ট হয়ে নিহত ২৩ বছর বয়সী তরুণ এই ফায়ার ফাইটারের মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে পুরো এলাকায়।
বৃহস্পতিবার (২৬ ডিসেম্বর) দুপুরে রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার বড়বালা ইউনিয়নের আটকুনিয়া গ্রামে নিহত ফায়ার ফাইটার সোহানুরের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় মা নার্গিস বেগমের অনবরত আর্তনাদ। একমাত্র ভাইকে হারিয়ে আর্তনাদ করছেন বোন সীমা আক্তার।
আর্তনাদ করতে করতে সোহানুরের মা নার্গিস বেগম বলছিলেন, ‘গতকাইল রাইত ১০টার সময় ছাওয়ার সঙ্গে কথা হইছে। ছাওয়া কয় ভালোভাবে থাকেন মা। আমি টাকা দিব। ভালোভাবে খান মা, বাবাক খিলান। শরীর স্বাস্থ্য ঠিক রাখেন মা। বইনের অসুখ, তার বাচ্চা দুইটার অসুখ। বইনের বাচ্চা দুইটাক দেখেন মা।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার মায়ের সম্পদ, বাপের সম্পদ সৌগ শেষ করছি ছইলের ভবিষ্যতের জন্য। বাবা মায়ের যতদিন মৃত্যু হয় নাই ততদিন ছইল হামাক দেখপে, সেই সম্পদটা আমি হারাইয়া ফেললাম। এখন মা কে দেখপে। ছাওয়া মোর ঢাকাত যায়া কয় মা দোয়া করেন। আমি আরো উপরত যামো। সেই ছাওয়াক মোর আল্লায় উপরত নেইল।’
জানা যায়, মিঠাপুকুর উপজেলার আটকুনিয়া গ্রামের আক্তারুজ্জামান দুদুর দ্বিতীয় সন্তান সোহানুর জামান নয়ন। দুই ভাইবোনের মধ্যে কৃষক বাবার একমাত্র ছেলে সন্তান ছিলেন নিহত এই ফায়ার ফাইটার। ২০১৬ সালে স্থানীয় ছড়ান দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ও ২০১৮ সালে ছড়ান ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসিতে উত্তীর্ণ হয়ে একই কলেজে ডিগ্রি তৃতীয় বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষা দিয়েছেন ফায়ার ফাইটার নয়ন। ২০২২ সালের ২ অক্টোবর সিলেটের বিশ্বনাথ ফায়ার স্টেশনে যোগদানের মধ্য দিয়ে কর্মজীবনের শুরু করেন। দুই মাস আগে ঢাকার তেজগাঁও ফায়ার স্টেশন টিমের স্পেশাল ব্রাঞ্চের সদস্য হিসেবে যোগদান করেন।
বাবা আক্তারুজ্জামান দুদু জানান, ‘ভোর ৫টার দিকে জানতে পারি আমার ছেলে আগুন নেভাইতে গিয়ে ট্রাক চাপায় মারা গেছে। ছেলের স্বপ্ন ছিল বড় অফিসার হবে। দুই বছরের মধ্যে ছেলে আমার প্রমোশন পাইছিল। দেশের জন্য আমার ছেলে জীবন দিছে। ওরা যদি বেরিগেড দিয়ে কাজ করতো তাহলে তো আমার ছেলেটাক ট্রাক চাপা দিয়ে মারতে পারত নাহ। আমি ট্রাকচালকের বিচার চাই। যে প্রশাসনের লোকের অবহেলার জন্য আমার ছেলের জীবন গেল। তার বিচার চাই।’
কান্নারত বড় বোন সীমা আক্তার জানান, ‘সবার ভাই আছে। আমার ভাই নাই। আমি আর কাকে ভাই বলব। ভাইয়ের অনেক স্বপ্ন ছিল, আশা ছিল- সে অনেক বড় অফিসার হবে। জানুয়ারি মাসে ভাই আসিয়া আমাক ভালো ডাক্তারকে দেখায়া চিকিৎসা করাবে। আমার বাচ্চা দুইটার অসুখ, তার ডাক্তার দেখাবে। সেই ভাই আইজ লাশ হয়া বাড়িত আসতোছে।’
মিঠাপুকুর ফায়ার স্টেশনের ওয়্যারহাউজ ইন্সপেক্টর ও ইনচার্জ মশিউর রহমান জানান, ‘আমরা প্রতিনিয়ত অনেক ঝুঁকি নিয়ে কাজ করি। আমরা চাই এভাবে আর যেন কোনো মায়ের কোল খালি না হয়। আমাদের সহকর্মীকে হারিয়ে আমরা ব্যথিত। আমরা এসেছি শোক সন্তপ্ত পরিবারকে সান্ত্বনা দিতে।’
বুধবার দিবাগত রাত ১টা ৫২ মিনিটে সচিবালয়ের ৭ নম্বর ভবনে আগুন লাগার খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের প্রথম ইউনিটটি কাজ শুরু করে। আগুনের তীব্রতা বাড়ার কারণে আরও ১৮টি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণের কাজে যোগ দেয়। একই সময়ে তাদের সঙ্গে যোগ দেয় সেনা ও পুলিশ সদস্যরা। এ সময় দিবাগত রাত ৩টা ৪০ মিনিটের দিকে সচিবালয়ের দক্ষিণ দিকের ১ নম্বর ফটকের সামনে পানির পাইপ কাঁধে নিয়ে রাস্তা পার হওয়ার সময় ফায়ার ফাইটার সোহানুর জামান নয়নকে একটি দ্রুতগতির ট্রাক ধাক্কা দিয়ে পালিয়ে যায়। এ সময় রাস্তায় পড়ে যান নয়ন। মাথায় পরা হেলমেটটি সঙ্গে সঙ্গে খুলে যায়। পরে ট্রাক ও ট্রাকের চালককে ধাওয়া করে আটক করে ঘটনাস্থলে থাকা লোকজন। আহত ফায়ার ফাইটারকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করার কয়েক ঘন্টা পর মারা যান তিনি।