আবু রায়হান তানিন, চট্টগ্রাম ও মনিরুজ্জামান বাবলু, চাঁদপুর
প্রকাশ : ২৫ ডিসেম্বর ২০২৪ ০৯:১৭ এএম
আপডেট : ২৫ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৫:২৯ পিএম
মাজেদুল
মাগুরার পলাশবাড়িয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্র মাজেদুর। বার্ষিক পরীক্ষা শেষে অবসর সময়ে কিছু অর্থ উপার্জনের জন্য দুই সপ্তাহ আগে মালবাহী জাহাজ আল বাখেরায় লস্কর হিসেবে যোগ দেয়। কিছুদিন কাজ করে আবার ক্লাসে ফেরার পরিকল্পনা ছিল তার। অভাবের সংসারে দায়িত্ব নেওয়ার স্বপ্ন নিয়ে আসা ১৬ বছর বয়সি এই কিশোর মায়ের কাছে ফিরে যাচ্ছে ক্ষতবিক্ষত লাশ হয়ে।
গত সোমবার আল বাখেরা থেকে উদ্ধার হওয়া সাত নৌযান শ্রমিকের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠজন হলো মাজেদুর। তার লাশও পড়েছিল জাহাজের কক্ষে। মাথায় কোপানো হয়েছে তাকে। মাগুরা জেলার মোহাম্মদপুর থানার আনিস মিয়ার ছেলে মাজেদুল। তিন ভাইয়ের মধ্যে মাজেদুল সবার ছোট। তার ছোট একটা বোনও আছে। তার লাশ গ্রহণ করে মামাতো ভাই শুভ শিকদার। তিনি নিজেও জাহাজশ্রমিক। প্রতিদিনের বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘ও পড়াশোনা করে। বার্ষিক পরীক্ষা দিয়ে অবসর সময়টা পরিবারের সহযোগিতার জন্য কাজ করার ভাবনা থেকে আসে। মাত্র দুই সপ্তাহ আগে সে কাজে আসে। আমাদের ওদিকে বেশিরভাগ লোক জাহাজে চাকরি করে। পরিবারে অভাব-অনটন ছিল। সেজন্য ভেবেছে কিছুটা সহযোগিতা যদি করা যায়। রেজাল্ট দিলে আবার স্কুলে যাওয়ার কথা ছিল তার। আজ তার লাশ নিতে এলাম। আমার ফুফু বাড়িতে মূর্ছা যাচ্ছে। বারবার ফোন দিয়ে বলছিলেন যেন তার ছেলের লাশ কাটাছেঁড়া করা না হয়। এমনিতেই তাকে মাথায় কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। জানি না তার মাকে বাড়িতে গিয়ে কীভাবে ভাইয়ের লাশ বুঝিয়ে দেব।’ বলতে বলতে যেন গলা ধরে আসে শুভ শিকদারের।
জাহাজের মাস্টার গোলাম কিবরিয়া (৫৫)। তার ভাগিনা শেখ সবুজ (২৮)। চাকরি ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে ভাবছিলেন তিনি। এর মধ্যে উড়নচণ্ডী ভাগনেকে কাজ শিখিয়ে জাহাজের হাল ধরিয়ে দেবেন বলে বোনকে কথা দেন তিনি। দেড় মাস আগে সবুজ তার মামার সঙ্গে কাজে যোগ দেয় জাহাজের শ্রমিক হিসেবে। দুইজনেই এখন মৃত। পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
নতুন বছরের ৩ জানুয়ারি বাড়িতে যাওয়ার কথা ছিল গোলাম কিবরিয়ার। ১০ জানুয়ারি ছোট মেয়ের বিয়ে। মামা-ভাগিনা ছুটি নিয়ে বিয়ের আনন্দে মেতে উঠবেনÑ এমনটাই ছিল প্রস্তুতি। নিয়তি সেই আনন্দকে নিরানন্দ করে এনে দিয়েছে বিষাদের ছায়া।
চাঁদপুরের মেঘনা নদীতে মালবাহী জাহাজ আল বাখেরায় কুপিয়ে হত্যা করা ৭ জনের মধ্যে এই মামা-ভাগিনারাও আছেন। সোমবার রাতে খবর পেয়ে একে একে চাঁদপুর সদর জেনারেল হাসপাতালে আসেন নিহতের স্বজনরা। তাদের মধ্যে কথা হয় নিহত শেখ সবুজের ভাই ফারুক হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, এই ঘটনায় তার মামা গোলাম কিবরিয়া ও ভাই শেখ সবুজ নিহত হন। মামা ৩০ বছর ধরে জাহাজের চাকরি করলেও ভাই সবুজ মাত্র দেড় মাস আগে যোগ দেয়। মেয়ের বিয়ে নিয়ে রবিবার রাতে মামার সঙ্গে শেষ কথা হয়েছিল। তাদের বাড়ি ফরিদপুর জেলার কোতোয়ালি থানার ভাগন্ডা গ্রামে। তিনি বলেন, ‘আমার ভাইটা তেমন কোনো কাজ করত না। এক ধরনের উড়নচণ্ডী ছিল। এটা নিয়ে আমার মায়ের চিন্তার শেষ ছিল না। মামা বলেছিলেন তাকে কাজ শিখিয়ে জাহাজের হাল ধরিয়ে দেবেন। আজ দুজনের লাশ নিতে এলাম।’
নিহত শ্রমিকদের লাশ হস্তান্তর ঘিরে গতকাল মঙ্গলবার দিনভর স্বজনদের আর্তনাদ, হাহাকারে যেন ভারী হয়েছিল চাঁদপুরের বাতাস। জাহাজশ্রমিক ফেডারেশনের নেতা ইঞ্জিনিয়ার কবির হোসেন বলেন, এটি ডাকাতির ঘটনা। নৌপথের নিরাপত্তা চান তিনি। তিন দিনের শোক পালন করবেন তারা। আহত জুয়েলের অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে। সে সুস্থ হলেই ঘটনার কারণ জানা সম্ভব হবে।
সোমবার দুপুরে ৯৯৯-এর মধ্যমে খবর পেয়ে চাঁদপুরের মেঘনা নদীর হাইমচর উপজেলার ঈশানবালা এলাকায় এমভি আল বাখেরা জাহাজ থেকে রক্তাক্ত আটজনকে উদ্ধার করে। এদের মধ্যে ৫ জন ঘটনাস্থলে দুজন হাসপাতালে মারা যায়। জাহাজটি চট্টগ্রাম থেকে সিরাজগঞ্জের উদ্দেশে যাওয়ার কথা। এটিতে ইউরিয়া সার বোঝাই ছিল।
চাঁদপুরে নৌ-পুলিশের পুলিশ সুপার (এসপি) সৈয়দ মুশফিকুর রহমান জানান, চাঁদপুর নৌ সীমানায় এলে ডাকাতদল জাহাজ ঢুকে অতর্কিত হামলা চালায়। এতে পৃথক স্টাফরুমে ধারালো অস্ত্র দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করে হত্যা করে। অথবা পারিবারিক বা ব্যবসায়িক কোনো শত্রুতা থাকতে পারে। ঘটনাটি কখন এবং কোথায় ঘটেছে তা অনুমান করা যাচ্ছে না। প্রত্যেকটি মরদেহ ভিন্ন ভিন্ন রুমে ছিল।