শাহিনুর সুজন, চারঘাট
প্রকাশ : ২২ ডিসেম্বর ২০২৪ ২১:৫৭ পিএম
রাজশাহীর চারঘাটে ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি) সার সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। আবার উপজেলার অনেক এলাকায় বাড়তি দামেও পাওয়া যাচ্ছে না টিএসপি। সারের এই সংকটে উপজেলায় বিভিন্ন রবি ফসলের চাষাবাদ নিয়ে শঙ্কায় পড়েছেন কৃষকরা।
কৃষকদের অভিযোগ, রবি মৌসুমের শুরুতে সারের চাহিদা বেশি থাকায় ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা বাজারে এই কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অধিক লাভ করেছে। তাদের কাছ থেকে সারের দাম বেশি নেওয়া হলেও ডিলাররা কোনো রসিদ দিচ্ছেন না। কেউ কেউ রসিদ দিলেও তাতে সরকার নির্ধারিত দাম দেখাচ্ছেন। প্রতিবাদ করলে সার বিক্রি করবেন না জানিয়ে দিচ্ছেন। ডিলারদের কাছে একরকম জিম্মি হয়ে পড়েছেন তারা।
ডিলারদের দাবি, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম পাওয়ার কারণে বাজারে সারের সংকট তৈরি হয়েছে। এজন্য অনেক ডিলার পার্শ্ববর্তী উপজেলা থেকে সার কিনে এখানে বিক্রি করছেন। এতে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে কিছুটা বেশি দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।
কৃষি কর্মকর্তাদের দাবি, এবার রসুন ও পেঁয়াজের আবাদ বেশি করছেন কৃষকেরা। অন্য আবাদের তুলনায় এ আবাদে টিএসপি সার দ্বিগুণের বেশি ব্যবহার হচ্ছে। চাহিদা বেশি ও সরবরাহ কিছুটা কম থাকায় কিছু ডিলার ঘাটতি দেখিয়ে অতিরিক্ত দাম নেওয়ার চেষ্টা করছেন। মাঠপর্যায়ে কৃষকদের টিএসপি সার ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করে ডিএপি ব্যবহারে উৎসাহী করা হচ্ছে। কারণ টিএসপির তুলনায় ডিএপি বেশি কার্যকরী। আবার ডিএপি সারের বরাদ্দের পরিমাণ টিএসপির দ্বিগুণ।
চারঘাট উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, রবি মৌসুমে উপজেলায় ৫ হাজার ৫৩০ হেক্টর জমিতে গম, ৭০০ হেক্টর আখ, ৬৫০ হেক্টর ভুট্টা, আলু ২২৫ হেক্টর, সরিষা ৭৯০ হেক্টর, পেঁয়াজ ৯১০ হেক্টর, রসুন ৫৫০ হেক্টর, মসুর ৬৮৫ হেক্টরসহ প্রায় ১৫ হাজার হেক্টর জমিতে বিভিন্ন আবাদ করা হচ্ছে। এই জমি আবাদ করতে চলতি ডিসেম্বর মাসে ১৯২ মেট্রিক টন টিএসপি, ২১৫ মেট্রিক টন এমওপি, ৪২০ মেট্রিক টন ডিএপি এবং ৬৬৮ মেট্রিক টন ইউরিয়া সারের চাহিদা রয়েছে। সারের চাহিদা অনুযায়ী পরিমাণমতো বরাদ্দ রয়েছেÑ বলছে উপজেলা কৃষি বিভাগ।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর আরও জানায়, বরাদ্দকৃত সার বিসিআইসির সাতজন এবং বিএডিসির ১৫ জন ডিলারের মাধ্যমে উপজেলার কৃষকদের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে। সরকার প্রতি বস্তা (৫০ কেজির বস্তা) টিএসপি ও ইউরিয়া সারের খুচরা মূল্য ১ হাজার ৩৫০ টাকা (২৭ টাকা কেজি), মিউরেট অব পটাশ প্রতি বস্তা ১০০০ টাকা (২০ টাকা কেজি), ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) প্রতি বস্তা ১ হাজার ৫০ টাকা (২১ টাকা কেজি) নির্ধারণ করে দিয়েছে।
সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে, সরকার নির্ধারিত মূল্য প্রতি কেজি টিএসপি ২৭ টাকা, কিন্তু অধিকাংশ সারের ডিলার ও খুচরা বিক্রেতা টিএসপি সার ৩২-৩৬ টাকা দরে বিক্রি করছেন। বেশি দাম নিতে পারবে না এমন কেউ সার কিনতে গেলে সরবরাহ নেই বলে ফেরত পাঠাচ্ছেন।
উপজেলার সরদহ এলাকার সুলেখা খাতুন বলেন, টিএসপি সার কিনতে তিন দিন ডিলারের কাছে গিয়েও পাইনি। শুনেছি বেশি দাম দিলে ডিলাররা গোডাউন থেকে এনে দিচ্ছে। অন্যসব সার পাওয়া গেলেও সেগুলো সরকারি দামের তুলনায় বস্তাপ্রতি ১০০ টাকা হারে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।
উপজেলার পাইটখালী গ্রামের কৃষক রায়হান আলী বলেন, পেয়ারা বাগান, রসুন ও পেঁয়াজের জন্য টিএসপি সার প্রয়োজন। কয়েকজন ডিলারের কাছে গিয়েছি সার সরবরাহ নেই বলে ফেরত পাঠিয়েছে। পরে ৩৬ টাকা কেজি দরে সার কিনেছি। ডিলার রসিদ দেয়নি। কেজিতে ৯ টাকা বেশি দিয়ে সার কিনলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। সে অনুযায়ী ফসলের দাম পাওয়া কঠিন হবে।
উপজেলার নন্দনগাছী বাজারে খুচরা সার ব্যবসায়ী ভূগোল আলী বলেন, টিএসপি সার ক্রেতাদের কাছে বিক্রি পরের কথা নিজের জমি আবাদের জন্যও ডিলাররা আমাকে দেয়নি। সরবরাহ না থাকার অজুহাতে কয়েক দিন ধরে ঘুরাচ্ছে। অথচ বাড়িতে গোডাউন বানিয়ে সেখান থেকে বেশি দামে বিক্রি করছে। সার না পাওয়ায় কলা ও পেঁয়াজের আবাদ বন্ধ হয়ে আছে।
উপজেলার নিমপাড়া ইউনিয়নের বিএডিসির নজরুল ইসলাম বলেন, টিএসপি সার সরবরাহের দ্বিগুণ চাহিদা। এজন্য কৃষকদের সঠিকভাবে দিতে পারছি না। বিসিআইসি ডিলারের কাছে থেকে সার কিনে বিক্রি করছি। এ সুযোগে অনেকে বেশি দামে বিক্রি করছে। তবে আমি নায্যমূল্যে বিক্রি করছি।
উপজেলার বিসিআইসি সারের ডিলার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, টিএসপি সারের চাহিদা অনেক বেশি। চাহিদা অনুযায়ী আমাদের কাছে সরবরাহ থাকছে না। সার থাকলে সরকার নির্ধারিত দামেই বিক্রি করা হচ্ছে।
এ ব্যাপারে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আল মামুন হাসান বলেন, টিএসপি সারের তুলনায় ডিএপি সার বেশি কার্যকরী। ডিএপি সারের বরাদ্দও টিএসপির দ্বিগুণ। কিন্তু কৃষকদের মাঠপর্যায়ে গিয়ে পরামর্শ দিলেও তারা ডিএপি ব্যবহারে উৎসাহী হচ্ছে না। রসুন-পেঁয়াজের আবাদ বেশি হওয়ায় টিএসপি সারের চাহিদা বেশি। তবে সারের কোনো ঘাটতি নেই। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা ডিলারদের কাছে নিজে বসে থেকে সঠিক দামে সার বিক্রির বিষয়টি তদারকি করছেন। তারপরও দাম বেশি নেওয়ার সুনির্দিষ্ট তথ্য দিলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।