হুমায়ুন মাসুদ, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ২১ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৩:৩৫ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
এক মাস আগে গত ২৫ নভেম্বর চট্টগ্রাম নগরীর পশ্চিম খুলশী এলাকার একটি বাড়ি থেকে নিশান সাফারি ব্র্যান্ডের একটি বিলাসবহুল গাড়ি জব্দ করে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। গাড়িটি জব্দের পর সংস্থাটি জানায়, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস এবং বিআরটিএর কাছে তথ্য চেয়ে এটি আমদানির কোনো দলিলাদি তারা পায়নি। চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস জানিয়েছে, গাড়িটির ইঞ্জিন ও চেসিস নম্বরের বিপরীতে কাস্টম হাউসে কোনো বিল অব এন্ট্রি দাখিল করা হয়নি। বিআরটিএতে রেজিস্ট্রেশন করা হলেও তাদের কাছে গাড়িটি আমদানির কোনো দলিলপত্র নেই।
এ ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে বিলাসবহুল এই গাড়ি তাহলে কীভাবে বাংলাদেশে আনা হয়েছে। আমদানির দলিলপত্র ছাড়াই এটি কীভাবে বিআরটিএ থেকে রেজিস্ট্রেশন নিয়েছে। গাড়িটি জব্দ করার পর এক মাস পার হতে চললেও এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর।
এ সম্পর্কে জানতে চাইলে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মিনহাজ উদ্দিন বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে আমাদের কাছে যে তথ্য আছে সেটি হলো শুল্ক ফাঁকি দিয়ে গাড়িটি আনা হয়েছে। আমরা গাড়ির মালিকের কাছে আমদানির তথ্য চেয়েছি, তারা প্রথমে গাড়িটি আমদানির কোনো তথ্যই দিতে পারেনি। এখন বলছে, এটি মোংলা বন্দর দিয়ে আনা হয়েছে। মোংলা কাস্টম হাউসের কাছে গাড়িটির খালাসের তথ্য চেয়ে চিঠি দিয়েছি। এখনও কোনো তথ্য পাইনি।
শুধু চট্টগ্রামের খুলশী থেকে জব্দ নিশান সাফারি গাড়িটি নয়, এর ১২ দিন আগে রাজধানী ঢাকার তেজগাঁও শিল্প এলাকা থেকে বিএমডব্লিউ সেভেন সিরিজের একটি গাড়ি জব্দ করে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। ওই গাড়িও মিথ্যা ঘোষণায় জালিয়াতির মাধ্যমে আমদানি করা হয়। পরপর দুটি গাড়ি জব্দের ঘটনায় বিলাসবহুল গাড়ি আমদানিতে জালিয়াতির বিষয়টি উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বিলাসবহুল গাড়ি আমদানিতে প্রায় ৮২৭ শতাংশ শুল্ককর পরিশোধ করতে হয়। বিশাল অঙ্কের এই শুল্ককর ফাঁকি দিতে বিলাসবহুল গাড়ি আমদানিতে নানা ধরনের জালিয়াতির আশ্রয় নিচ্ছেন আমদানিকারকরা। শুল্ক ফাঁকি দিতে গাড়ির ম্যানুফ্যাকচারিং ইয়ার থেকে মডেল নম্বর পরিবর্তন করে গাড়ি খালাস করেছে একটি অসাধু চক্র। আবার গাড়ির যন্ত্রাংশ ঘোষণা দিয়েও নিয়ে আসছে বিলাসবহুল গাড়ি। আলাদাভাবে পাটর্স এনে, এরপর অ্যাসেম্বলিং করে সড়কে নামানো হচ্ছে এসব গাড়ি।
নভেম্বর মাসে যে দুটি গাড়ি জব্দ করা হয়েছে এর মধ্যে বিএমডব্লিউ সেভেন সিরিজের গাড়িটি আমদানি করে চট্টগ্রামের টোকিও এন্টারপ্রাইজ। প্রতিষ্ঠানটি বিএমডব্লিউর সেভেন সিরিজের গাড়িকে ফাইভ সিরিজ হিসেবে ঘোষণা দিয়ে খালাস করে। সেই হিসেবে গাড়িটির মূল্য ঘোষণা করে ৪০ হাজার ডলার। কিন্তু অনুসন্ধানে উঠে আসে গাড়িটি সেভেন সিরিজের। যার বাজারমূল্য ছিল প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার ডলার। আর গাড়িটি নন-হাইব্রিড হলেও হাইব্রিড হিসেবে শুল্কায়ন করা হয়। অন্যদিকে খুলশী থেকে জব্দ করা গাড়িটির গায়ে নিশান প্যাট্রল লেখা থাকলেও কাস্টমস গোয়েন্দারা গাড়িটির চেসিস নম্বর যাচাই করে নিশ্চিত হয়েছেন এটি নিশান সাফারি। ২০১৫ সালের মডেলের গাড়িটি ঢাকা মেট্রো-ঘ-১৫-২৩২৪ সিরিয়ালে বিআরটিএ থেকে রেজিস্ট্রেশন নেয়। বিআরটিএ থেকে রেজিস্ট্রেশন নিলেও কাস্টমস গোয়েন্দারা তদন্তে নেমে জানতে পারে গাড়িটির ইঞ্জিন ও চেসিস নম্বরের বিপরীতে কাস্টম হাউসে কোনো বিল অব এন্ট্রি দাখিল করা হয়নি। একই সঙ্গে কোন কোন আমদানি দলিলাদির ভিত্তিতে গাড়িটির রেজিস্ট্রেশন করা হয়েছে তা জানতে চেয়ে বিআরটিএ বরাবর চিঠি পাঠোনো হলেও বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ তা জানাতে পারেনি।
গত মাসে দুটি গাড়ি জব্দের পর এ ধরনের আরও ১০ থেকে ১২টি গাড়ির সন্ধান পেয়েছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। গাড়ির মধ্যে রয়েছে বিএমডব্লিউ, মার্সিডিজ বেঞ্জ, সাফারির মতো বিলাসবহুল গাড়ি। গাড়িগুলো কীভাবে আমদানি করা হয়েছে সেটি খতিয়ে দেখছে সংস্থাটি। এসব গাড়ির তথ্য চেয়ে ইতোমধ্যে কাস্টম হাউসকে চিঠি দিয়েছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর।
কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মিনহাজ উদ্দিন বলেন, শুল্ক ফাঁকি দিয়ে গাড়ি আমদানি নিয়ে আমরা দীর্ঘদিন কাজ করে যাচ্ছি। সম্প্রতি আমরা দুটি গাড়ি জব্দ করেছি। এ দুটি গাড়ি আমদানির বিপরীতে প্রায় ২০ কোটি টাকার মতো শুল্ক ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। এই ধরনের আরও ১০ থেকে ১২টি বিলাসবহুল গাড়ির সন্ধান আমরা পেয়েছি। গাড়িগুলো আমদানির তথ্য চেয়ে আমরা কাস্টম হাউসকে চিঠি দিয়েছি। আমাদের কাছে যেসব কাগজপত্র আছে, আমরা সেগুলো যাছাই-বাছাই করছি।
তিনি আরও বলেন, গাড়ির সন্ধান পেলেই আমরা সঙ্গে সঙ্গে জব্দ করতে পারি না। গাড়িগুলোর কাগজপত্রও বের করতে একটু সময় লাগে। তথ্য পাওয়ার পর সেগুলো কাস্টম হাউস এবং বিআরটিএতে পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন হয়। এরপর শুল্ক ফাঁকির বিষয়টি নিশ্চিত হলে গাড়িগুলো জব্দ করি। পরে যারা মিথ্যা ঘোষণায় গাড়ি আমদানি করে শুল্ক ফাঁকি দিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে তাদের শুল্ক পরিশোধ করতে চিঠি দেওয়া হয়। জব্দ গাড়িগুলোর ক্ষেত্রেও আমরা একই ব্যবস্থা নিচ্ছি।