আলাউদ্দিন মিয়া, হোমনা (কুমিল্লা)
প্রকাশ : ২০ ডিসেম্বর ২০২৪ ১০:৪৭ এএম
তৈরির পর বাঁশি বাজিয়ে দেখছেন কুমিল্লার হোমনা উপজেলার শ্রীমদ্দি গ্রামের প্রবীণ কারিগর অঙ্গদ চন্দ্র সরকার। প্রবা ফটো
শুধু বাঁশের বাঁশি তৈরি করেই এ গ্রামের অনেকেই হয়েছেন স্বাবলম্বী। বলছি কুমিল্লা জেলার হোমনা উপজেলার শ্রীমদ্দি গ্রামের কথা। গ্রামটিতে আগুনে পুড়িয়ে তৈরি হয় বাঁশি। যা কি না এশিয়া মাহাদেশের মধ্যে বাঁশের বাঁশি তৈরির সবচেয়ে বড় অঞ্চল হিসেবে গণ্য করা হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য মতে, এখানে আজ থেকে প্রায় দুইশ থেকে আড়াইশ বছর আগ থেকে বাঁশি তৈরি হয়। যা বংশপরম্পরায় ধরে রেখেছেন বর্তমানের কারিগররা।
বৈশাখ মাস এলেই বাঁশি তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন এ গ্রামের কারিগররা। গ্রামের অর্ধশতাধিকেরও বেশি পরিবার বাঁশি শিল্পের সঙ্গে জড়িত। তারাই পাল্টে দিয়েছে গ্রামের দৃশ্যপট। একমাত্র বাঁশি তৈরি করেই এই গ্রামের অনেকেই এখন স্বাবলম্বী। কুমিল্লা জেলার হোমনা উপজেলা সদরে থেকে দুই কিলোমিটার দূরে শ্রীমদ্দি গ্রামটি অবস্থিত।
বাঁশি তৈরির মাধ্যমে সচ্ছলতা ফিরেছে এ গ্রামে। দেশের বিভিন্ন জেলায় বিক্রির পাশাপাশি শ্রীমদ্দির বাঁশি রপ্তানি হয় বিদেশেও। বছরে প্রায় কোটি টাকার বাঁশি বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে বলে জানান বাঁশি তৈরির কারিগর ও এ ব্যবসায় জড়িতরা।
শ্রীমদ্দি গ্রামে কোনো বেকার যুবক নেই। সবাই কর্মজীবী। গ্রামের প্রায় সব বাড়ি দোচালা ঘরের। গ্রামের অধিকাংশ অধিবাসী হিন্দু। প্রতিটি বাড়ির আঙ্গিনা ও অলিগলিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বিভিন্ন ডিজাইনের বাঁশি। নারী-পুরুষ শিশুসহ সব বয়সের মানুষই বাঁশিশিল্পের বিভিন্ন ডিজাইন তৈরি করতে নিয়োজিত। পিছিয়ে নেই গৃহকর্তা-গৃহকর্ত্রীর পাশাপাশি তাদের সন্তানেরাও । প্রত্যেকে নিজ কাজের ফাঁকে ফাঁকে সময় অনুযায়ী তৈরি করছেন বাঁশি। এভাবে কাটছে শ্রীমদ্দি গ্রামের অধিকাংশ পরিবারের জীবনধারা। এখান থেকেই বিভিন্ন ডিজাইনের বাঁশি চলে যায় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বড় বড় মার্কেটগুলোতে।
হোমনা উপজেলার শ্রীমদ্দি গ্রামের অঙ্গদ চন্দ্র সরকার জানালেন এখানকার বাঁশি শিল্পের কথা। তিনি বলেন, গ্রামের বাঁশি তৈরির সঙ্গে জড়িত ছিলেন আমাদের পূর্বপুরুষরা। সেটাও বহু বছর আগেকার কথা। বংশপরম্পরায় এখন আমরা নিজেরাও করি। এ কাজ খুব কঠিন নয়, বেশ সহজও। ফাল্গুন মাস থেকে বৈশাখ মাস পর্যন্ত বেশি বাঁশি তৈরি ও বিক্রি হলেও গ্রামের শিল্পীরা সারা বছরই বাঁশি তৈরি করে থাকে।
শ্রীমদ্দি গ্রামের আরেক বাঁশি প্রস্তুতকারক যতীন্দ্র বিকাশ জানালেন, আমরা চট্টগ্রাম, ফটিকছড়ি, সীতাকুণ্ড, মিরসরাই থেকে মুলি বাঁশ কিনে ট্রাকযোগে নিয়ে আসি। পরে মাপ অনুযায়ী বাঁশ কেটে টুকরো করা হয়। এরপর টুকরোগুলো রোদে শুকিয়ে ফিনিশিং দিয়ে লোহা কয়লা ধারা গরম করে মাপ অনুযায়ী বাঁশে ছিদ্র করা হয়। পরবর্তীতে মান্দাল কাঠ দিয়ে কডি তৈরি করে বাঁশের মাথায় আটকে দেওয়া হয়। বাঁশের কভারে রঙ দ্বারা বিভিন্ন ডিজাইন করে বাজারজাত করা হয়।
এখানে তৈরি প্রতিটি মোহন বাঁশি ১৫ টাকা, আড় বাঁশি ২০ টাকা, মুখবাঁশি ৮ টাকা, নাগিনী বাঁশি ১০ টাকা, ক্যালেনের বাঁশি ১২ টাকা, পাখি বাঁশি ২০ টাকা, সোহন বাঁশি ১৫ টাকা পাইকারি দামে বিক্রি হয়ে থাকে। তবে লম্বা, মোটা নিখুঁত কাজের ওপর বাঁশির দাম নির্ভর করে। কিন্তু বাচ্চাদের মুখবাঁশি তৈরি ও বিক্রি হয় বেশি।
পহেলা বৈশাখের বৈশাখী মেলা ছাড়াও হোমনার মিরাশের মেলা, শ্রীমদ্দি কালীবাড়ীর মেলা, কচুয়ার সাচারের রথমেলা, ধামরাইয়ের রথমেলা, মতলবের বেলতুলীর লেংটার মেলা, ব্রাক্ষণবাড়িয়ার খরমপুরের মেলা, চট্টগ্রামের জব্বারের বলীখেলা, নাঙ্গলবন্দের অষ্টমী, সাতক্ষীরার পূজার মেলা, কুষ্টিয়া, গাজীপুরের মৌসুমী মেলায় বাঁশি বিক্রি ছাড়াও প্রায় সাড়া বছরই দেশের শহর, বন্দর, হাটবাজারে তারা তাদের বাঁশি বিক্রয় করে থাকে।
বাঁশিশিল্পী আবদুল খালেক জানান, আগে ১ হাজার ২৮০ কাউন বাঁশের দাম ছিল দেড় হাজার টাকা। যা গত দুই বছর ধরে দুই হাজার টাকারও বেশি দামে বিক্রি হয়ে থাকে। এ ছাড়াও রঙ, কয়লাসহ বাঁশি তৈরির অন্যান্য উপকরণের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু বাঁশি তৈরিতে বাড়তি খরচ হলেও দাম রাখতে হচ্ছে আগের মতোই।
বর্তমানে শ্রীমদ্দি গ্রামের বাঁশির কারিগররা বেশ ব্যস্ত সময় পার করছেন। কয়েক মাস পরেই যে পহেলা বৈশাখ। এ ছাড়াও শীতকালীন বিভিন্ন মেলার জন্যও বাঁশির চাহিদা তৈরি হয়েছে।