ইউসুফ আহমেদ, লালমোহন (ভোলা)
প্রকাশ : ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৩:৩৭ পিএম
প্রবা ফটো
জনবল সংকটসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত ভোলার লালমোহন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। এতে স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হচ্ছে উপজেলাবাসীরÑ একমাত্র ভরসাস্থল এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটির।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ৫০ শয্যাবিশিষ্ট লালমোহন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ইউএইচএফপিও, আরএমও, কনসালটেন্ট ও চিকিৎসা কর্মকর্তাসহ ২১ জন চিকিৎসকের পদ থাকলেও বর্তমানে সেখানে চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র ১০ জন। তাদের মধ্যে দুজনকে অ্যাটাচমেন্টে অন্য স্থানে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া এখানে এক্স-রে, ইসিজি ও আল্ট্রাসনোগ্রাফির মতো গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় যন্ত্রপাতি থাকলেও সেসব সেবাও বন্ধ। বন্ধ রয়েছে অপারেশন থিয়েটারটিও।
সম্প্রতি সরেজমিনে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যান এ প্রতিবেদক। এ সময় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, এখানে চিকিৎসকের সংকট। অথচ দুই চিকিৎসককে অ্যাটাচমেন্টে দায়িত্ব দিয়ে রেখেছেন ইউএইচএফপিও। এজন্য যে কয়জন চিকিৎসক রয়েছেন তারা রোগীদের আন্তরিকতার সঙ্গে সেবা দিতে গিয়ে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন। তাই দ্রুত অ্যাটাচমেন্টে থাকা ওই দুই চিকিৎসককে ফিরিয়ে আনা হলে সেবার মান আরও বাড়বে।
এদিকে, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার-পরিকল্পনা কর্মকর্তার (ইউএইচএফপিও) বিরুদ্ধেও অভিযোগ তুলেছেন কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী। তাদের অভিযোগ, বিভিন্ন প্রশিক্ষণের অজুহাতে কর্মস্থলে প্রায়ই অনুপস্থিত থাকছেন ইউএইচএফপিও ডা. মো. তৈয়বুর রহমান। যেদিন অফিসে আসেন, সেদিন আবার দুপুর দেড়টার মধ্যেই কর্মস্থল ত্যাগ করেন তিনি। ভোলা শহরে নিজের ব্যক্তিগত চেম্বারে রোগী দেখার কাজেই তিনি ব্যস্ত থাকেন বলে জানা গেছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তার জন্য যে নির্ধারিত সরকারি বাসভবন রয়েছে সেখানে থাকেন তার গাড়িচালক।
উপজেলার কালমা ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের দোপাদার বাড়ির বাসিন্দা দিনমজুর মো. শাহিন বলেন, আমার স্কুলপড়ুয়া ছেলের হাত ভেঙে গেলে ডাক্তার দেখাতে আসি লালমোহন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। ডাক্তার ছেলের হাতের এক্স-রে করাতে বলেন। তখন আমি উপজেলার একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গিয়ে ৫০০ টাকায় এক্স-রে করাই। এ সময় তার স্ত্রী নিরু বেগম বলেন, আমরা গরিব মানুষ। পরীক্ষাগুলো অতিরিক্ত টাকায় বাইরে থেকে করাতে অনেক কষ্ট হয়।
এ ছাড়া শরীর ব্যথা নিয়ে চিকিৎসা নিতে আসেন বদরপুর থেকে জেলে মো. তাজল ইসলাম (৬৫), চরভুতা ৮ নম্বর ওয়ার্ড থেকে কোমর ব্যথা নিয়ে আসে বিলকিস বেগম (৪৫) এবং চর কচ্ছপিয়া থেকে আসেন হাঁটুর ব্যথা নিয়ে মালেকা বেগম (৬০) নামের এক নারী। তাদের সবাই বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক থেকে এক্স-রে ও অন্যান্য পরীক্ষা করতে হয়েছে। তারা বলেন, আমরা দরিদ্র মানুষ হওয়ায় সরকারি হাসপাতালে ডাক্তার দেখাতে আসি। সরকারিভাবে ডাক্তার দেখালেও অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে পরীক্ষা করাতে হয়েছে বাইরের ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। কর্তৃপক্ষ অতি দ্রুত আমাদের হাসপাতালের এক্স-রে, ইসিজি ও আল্ট্রাসনোগ্রাফি মেশিন চালু করার দাবি জানান তিনি।
অপরদিকে, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন কর্মচারীর দাবি, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এলাকাটি চরম অনিরাপদ। এর সীমানা প্রাচীরে বেশিরভাগ স্থানই ভেঙে রয়েছে। রাতের অন্ধকারে এসব স্থান দিয়ে জুয়াড়ি ও মাদকসেবীরা ভেতরে প্রবেশ করে আড্ডা জমায়। এতে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সরকারি কোয়ার্টারে বাস করা চিকিৎসক, নার্স এবং কর্মচারীরা। তারা জানান, সম্প্রতি সরেজমিনে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স প্রাঙ্গণ পরিদর্শন করে দেখা গেছে, দীর্ঘদিন ধরেই নোংরা, অপরিচ্ছন্ন ও জলাবদ্ধতায় হাসপাতালটি বেহাল। ফলে খুব সহজেই ডেঙ্গু মশার উৎপত্তি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এদিকেও ইউএইচএফপির কোনো নজর নেই বলে পরিদর্শনকালে এই প্রতিবেদকের কাছে দাবি করেন তারা।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স প্রাঙ্গণে জলাবদ্ধতার ব্যাপারে লালমোহন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার-পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও) ডা. মো. তৈয়বুর রহমান বলেন, ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় বিভিন্ন স্থানে গর্তে পানি জমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। শিগগিরই ড্রেনেজ ব্যবস্থা সংস্কার করে সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নেওয়া হবে।
দুই চিকিৎসককে অ্যাটাচমেন্টে দায়িত্ব দেওয়ার ব্যাপারে তিনি বলেন, এটি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায় দেওয়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মানতে আমরা বাধ্য। আর জনবল সংকটের কারণেই মূলত এক্স-রে, ইসিজি, আল্ট্রাসনোগ্রাফি এবং অপারেশন থিয়েটার বন্ধ রয়েছে। জনবল পদায়নের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তারা জনবল পদায়ন করলেই এসব সেবা পুনরায় চালু করা সম্ভব হবে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সীমানা প্রাচীর সংস্কারের বিষয়ে ডা. তৈয়বুর বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সীমানা প্রাচীর মেরামতে বরাদ্দের জন্য আবেদন পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পেলে তা মেরামতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।
কর্মস্থলে চিকিৎসকের অনুপস্থিতি এবং নিজের সরকারি বাসভবনে গাড়িচালককে থাকার ব্যাপারে এই কর্মকর্তা বলেন, ইউএইচএফপিওদের সরকারি বাসভবনে থাকার বাধ্যবাধকতা নেই। এ ছাড়া এখানে যে বাসভবনটি রয়েছে তা বাসযোগ্যও নয়। তবে অনুপস্থিতি বা তড়িঘড়ি করে কর্মস্থল ত্যাগের যে বিষয়টি বলা হচ্ছে তা মোটেও সঠিক নয়। আমি সরকারি নিয়ম অনুযায়ী সকাল ৮টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত অফিসেই থাকি। এরপর স্টেশন ত্যাগ করি। তবে সরকারি কোনো প্রশিক্ষণ বা কাজ থাকলে তখন আসা হয় না।