আশুলিয়া (ঢাকা) প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১২ ডিসেম্বর ২০২৪ ২১:২৬ পিএম
ফাইল ফটো
ঢাকার শিল্পাঞ্চল আশুলিয়ায় সরকার ঘোষিত তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের বার্ষিক মজুরি ৯ শতাংশ বাড়ানোর ঘোষণা প্রত্যাখ্যান করে ১৫ শতাংশ ও ন্যূনতম মজুরি ২৫ হাজার টাকা করার দাবিতে কর্মবিরতি পালন করছেন শ্রমিকরা। বৃহস্পতিবার (১২ ডিসেম্বর) শ্রমিকদের আন্দোলন ও কর্মবিরতির কারণে আশুলিয়ার অন্তত ২৯টি কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এ ছাড়া শ্রমিক অসন্তোষের কারণে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে আরও ৮টি কারখানা।
শিল্প পুলিশ বলছে, শ্রমিকরা ইনক্রিমেন্ট বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন করলেও, কর্মবিরতি পালন ছাড়া কোনো বিশৃঙ্খলা করছেন না। সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে পুলিশ সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।
কারখানা ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বাৎসরিক ইনক্রিমেন্ট ১৫ থেকে ২০ শতাংশ করার দাবিতে চলমান আন্দোলনের জেরে আশুলিয়ার ওই ২৯টি কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ শ্রম আইনের ১৩(১) ধারায় 'নো ওয়ার্ক, নো পে'র ভিত্তিতে বন্ধ রয়েছে ৮টি কারখানা, স্ববেতনে ছুটি রয়েছে ৮টিতে এবং কাজ না করে শ্রমিকরা চলে গেছেন বা কাজ বন্ধ করে বসে আছেন- এমন কারখানার সংখ্যা ১৩টি।
জানা যায়, বাংলাদেশ শ্রম আইনের ১৩(১) ধারায় বন্ধ থাকা কারখানাগুলোর মধ্যে রয়েছে নাসা গ্রুপ, ট্রাউজার লাইন ও আল মুসলিম। এ ছাড়া সাধারণ ছুটিতে থাকা কারখানাগুলোর মধ্যে রয়েছে- নিউ এইজ গার্মেন্টস, নিউ এইজ অ্যাপারেলস, মেডলার অ্যাপারেল, ব্যান্ডো ডিজাইন। এগুলোর বাইরে শ্রমিকরা এসে কাজ না করে বেরিয়ে গেছেন এমন কারখানার মধ্যে রয়েছে- নিট এশিয়া লিমিটেড, নেক্সট কালেকশন লিমিটেড, ডেকো ডিজাইন লিমিটেড, শারমিন ফ্যাশন, শারমিন অ্যাপারেলস, ইথিকাল গার্মেন্টস, আগামী ফ্যাশন, ক্রসওয়্যার, ফ্যাশন ফোরাম, মুন রেডিওয়্যার লিমিটেডসহ অন্যান্য বিভিন্ন কারখানা।
বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতাকর্মী ও একাধিক কারখানার শ্রমিকেরা জানান, আশুলিয়ার বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকেরা কয়েক দিন ধরে শ্রমিকদের বার্ষিক মজুরি বা ইনক্রিমেন্ট ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বৃদ্ধি, ন্যূনতম মজুরি ২৫ হাজার টাকা, বার্ষিক অর্জিত ছুটির বকেয়া পুরো টাকা প্রতিবছর পরিশোধের দাবি জানিয়েছেন। এ সব দাবিতে কয়েক দিনের মতো আজও আশুলিয়ার বেশ কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা যথাসময়ে কারখানায় যান। কিন্তু তারা কাজে যোগ না দিয়ে কারখানার ভেতরে কর্মবিরতি পালন শুরু করেন। এর আগে কয়েকটি কারখানায় কাজ শুরু হলেও কিছুক্ষণ পর কাজ বন্ধ করে দেন শ্রমিকেরা।
নিউএইজ গ্রুপের একটি কারখানার নারী শ্রমিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গত শনিবার থেকেই সমস্যা হচ্ছিল। ওই দিন বেলা তিনটা পর্যন্ত কাজ করেছিলেন তারা। এই কয়েক দিন কারখানায় অল্প সময় কাজ হলেও পরে আবার কাজ বন্ধ করে দেন। আজ মুঠোফোনে বার্তা পেয়েছেন- কারখানা সাময়িক সময়ের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে। তিনি দাবি জানান, তাদের ইনক্রিমেন্ট ও বেতন বাড়াতে হবে। অর্জিত ছুটির টাকা পুরোটাই পরিশোধ করতে হবে।
শ্রমিকরা জানান, দাবি একাধিক হলেও তাদের মূল দাবি, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট ১৫ শতাংশ করা।
কাজ না করলে কেন শ্রমিকরা কারখানায় আসছেন এবং এলেও কাজ না করে কেন চলে যাচ্ছেন, এমন প্রশ্নের জবাবে একজন শ্রমিক বলেন, কারখানায় আসার আগ পর্যন্ত শ্রমিকরা জানেন না কাজ হবে কি না। এটা নির্ভর করে কারখানায় আসার পরে কি পরিস্থিতি তৈরি হয় তার ওপর।
তিনি আরও বলেন, এ ক্ষেত্রে আশেপাশের কারখানাগুলোতে কি হচ্ছে সেটিও বোঝা হয়। যখন খবর আসে অন্য কারখানাগুলোও কাজ বন্ধ করে দিচ্ছে, তখন এখানেও একে একে সব ফ্লোরে কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়। অনেকেই আছেন যারা কাজ করতে চান। কিন্তু যখন একটি বড় অংশ কাজ বন্ধ করে দেয়, তখন তার পাশে বসে থেকে তো আর আপনি একা কাজ করতে পারবেন না বা করেও লাভ নেই।
ইনক্রিমেন্ট বৃদ্ধির দাবিতে চলমান আন্দোলনকে সমর্থন করেন না এমন একজন শ্রমিক বলেন, একটি কারখানায় হাজার শ্রমিক কাজ করলেও কিংবা একেকটি ফ্লোরে শত শত শ্রমিক কাজ করলেও, এর অধিকাংশই নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকেন। হাতে দুই তিনজন থাকে যারা আন্দোলন তৈরি করে। কিন্তু সাধারণ শ্রমিকরা যখন দেখেন যেসব দাবি তোলা হচ্ছে তা সকল শ্রমিকের স্বার্থ, তখন তারা এতে সমর্থন দেন।
তিনি বলেন, একইভাবে তারা নির্ভর করে থাকেন তাদের ওপরেই, যাদের হাত দিয়ে আন্দোলনটা শুরু হয়। আবার যারা আন্দোলন সমর্থন করে না, তাদেরও কিছু করার থাকে না। আপনি একা কাজ করতে চাইলে তো আর পারবেন না। আবার অন্যদের রোষানলে পড়ার ঝুঁকিও থাকে।
ওই শ্রমিক আরও বলেন, ‘আমার মনে হয় না দেশের এই পরিস্থিতিতে ৯ শতাংশ ইনক্রিমেন্টের সিদ্ধান্তের পর আর এই আন্দোলনের কোনো যৌক্তিকতা আছে। আপনার প্রয়োজন অনেক থাকবে, তাই বলে সবটাই যে আপনি পাবেন সেটাও তো না। এখন যা হচ্ছে তা শিল্পের ক্ষতি হচ্ছে। আমি তো আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়েই চিন্তায় আছি।’
এ বিষয়ে বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড সোয়েটার শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইন বিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু বলেন, শ্রমিকদের বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট বাড়ানোর দাবি যৌক্তিক। সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবসম্মত নয়। শ্রমিকরা কিছু কিছু কারখানায় এমনিতে ১০ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট পায়। মজুরি বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের সঙ্গে কমপক্ষে ১০ শতাংশ বাড়ালে বাস্তবসম্মত হবে। সরকারকে এই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
কারখানা বন্ধের বিষয়ে আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল পুলিশ-১ এর পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ মমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, আজ শিল্পাঞ্চলে ১৩টি কারখানার শ্রমিকরা কাজ বন্ধ রেখেছেন। এর মধ্যে ১০টি কারখানা কর্তৃপক্ষ আজকের জন্য সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে। এ ছাড়া গতকাল বন্ধ ঘোষণা করা কারখানার সংখ্যা ১১টি।