এম পলাশ শরীফ, মোরেলগঞ্জ (বাগেরহাট)
প্রকাশ : ০৯ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৭:৩৯ পিএম
আপডেট : ০৯ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৭:৪৪ পিএম
উপকূলীয় জেলা বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলায় পানগুছি নদীর ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। এতে নতুন করে হুমকির মুখে পড়েছে নদীর তীরবর্তী তিন গ্রামের তিন হাজার পরিবার।
স্থানীয় সূত্র জানায়, মোরেলগঞ্জের হোগলাবুনিয়া ইউনিয়নের তিন গ্রাম বদনিভাঙা, সানকিভাঙা ও পাঠামারা নদীর তীরবর্তী গ্রামগুলোতে তিন হাজার পরিবারের বসবাস। এ উপজোয় গত শতাব্দীর ৮০-এর দশক থেকে নদীর করাল গ্রাসে কেড়ে নিচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম। হাজার হাজার একর ফসলি জমি, বসতবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে শত শত পরিবার। নদীর এ অব্যাহত ভাঙনের কারণে হুমকির মুখে রয়েছে উপজেলা খাদ্যগুদাম, হাসপাতাল, পল্লী বিদ্যুতের পাওয়ার স্টেশন, একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্কুলকাম সাইক্লোন শেল্টার, হাটবাজার, ধর্মীয় উপাসনালয়সহ জনগুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। বর্তমানে হোগলাবুনিয়া ইউনিয়নের তিন গ্রামও ভাঙনের হুমকিতে পড়েছে।
স্থানীয়রা জানায়, বিগত সরকারের আমলে হোগলাবুনিয়া ইউনিয়নের ভাঙনকবলিত গ্রাম রক্ষায় নদীর তীরবর্তী সাড়ে সাত কিলোমিটার দীর্ঘ স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের একটি প্রস্তাবনা পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। তবে এখন পর্যন্ত তা আলোর মুখ দেখেনি।
সম্প্রতি সরেজমিনে সংশ্লিষ্ট এলাকায় গিয়ে জানা গেছে, পানগুছি নদীর তীরবর্তী বাগেরহাট ও পিরোজপুর জেলার সীমান্তবর্তী মোরেলগঞ্জ পৌরসভার একটি অংশের সমন্বয়ে হোগলাবুনিয়া ইউনিয়নের বিষখালী স্লুইস গেট থেকে মরা বলেশ্বর অভিমুখী সাড়ে সাত কিলোমিটার দীর্ঘ এলাকাজুড়ে সানকিভাঙা, বদনিভাঙা ও পাঠামারা গ্রাম। গ্রামগুলোতে প্রায় তিন হাজার পরিবারের বসবাস। জনসংখ্যা রয়েছে ২০ থেকে ২৫ হাজার। আশির দশক থেকে চলছে পানগুছি নদীর ভাঙন। অব্যাহত ভাঙনের কবলে পড়ে সেখানে বসবাস করা পরিবার প্রায় প্রতিবছরই বাড়িঘর, গাছপালা, বসতভিটা হারায়। এ পর্যন্ত তাদের প্রায় দুই হাজার একর ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। শত শত পরিবার উদ্বাস্তু হয়েছে।
এদিকে নদীর এ ভাঙনের কারণে নতুন করে হুমকির মুখে পড়েছে বদনিভাঙার বাটাবাজার হয়ে পাঠামারার হাজীগঞ্জ বাজার পর্যন্ত সাড়ে চার কিলোমিটার মাটির সড়কটি, যার বিভিন্ন স্থান থেকে ভেঙে গেছে। এতে চলাচল করার ক্ষেত্রে দুর্ভোগে পড়েছে এলাকার বাসিন্দারা।
বদনিভাঙা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, হাজীগঞ্জ পাঠামারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ ছয়টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বদনিভাঙা মাধ্যমিক বিদ্যালয়, বিএস রহমাতিয়া দাখিল মাদ্রাসা, হাজীগঞ্জ বাজার, আটটি মসজিদ, উপজেলা খাদ্যগুদাম, হাসপাতাল, বিদ্যুতের সাব-স্টেশনসহ গুরুত্বপূর্ণ একাধিক স্থাপনাও হুমকির মুখে রয়েছে।
স্থানীয় ভুক্তভোগী সানকিভাঙা গ্রামের বাসিন্দা সিদ্দিকুর রহমান, বদনিভাঙা গ্রামের শাহাজাহান আলী শেখ, আবুল হোসেন হাওলাদার, পাঠামারা গ্রামের আবু সালেহ ফরাজী, শাহ আলম ফরাজী, সাত্তার শেখ, আবুল শেখ, দেলায়ার শেখসহ অনেকে জানান, তাদের একেকজনের চার একর থেকে ১৫ একর পর্যন্ত নদীগর্ভে চলে গেছে। তারা জানান, প্রতিবছরই ওইসব এলাকায় নতুন করে ভাঙছে। এ কারণে বাপ-দাদার ভিটেমাটি হারানোর বেদনা নিয়ে অন্য জায়গায় গিয়ে নতুন করে বসতি গড়ে তুলতে হচ্ছে তাদের। তাদের দাবি, নদীভাঙন থেকে গ্রামগুলো রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হোক।
এ ব্যাপারে হোগলাবুনিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আকরামুজ্জামান বলেন, তার ইউনিয়নের তিনটি গ্রামই নদীতীরবর্তী। এ কারণে প্রতিবছর বন্যা, জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে রাস্তাঘাট ভেঙে নদীগর্ভে চলে যাচ্ছে। এ পর্যন্ত ইটের সলিং করা চার-পাঁচটি সড়ক নদীগর্ভে হারিয়ে গেছে। নতুন সড়ক করা হলে কিছু দিন যেতে না যেতেই তার অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, অব্যাহত ভাঙন থেকে এলাকা রক্ষায় সবশেষ গত বছরও বিষখালী স্লুইস গেট থেকে মরা বলেশ্বর পর্যন্ত স্থায়ী বেড়িবাঁধের একটি প্রকল্প প্রস্তাবনা সংসদ সদস্যের মাধ্যমে পাঠানো হয়। কিন্তু তার কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। নদীভাঙন থেকে রক্ষা পাওয়ার একমাত্র পথ স্থায়ী বেড়িবাঁধ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
বাগেরহাট জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু রায়হান মোহাম্মদ আল বিরুনী বলেন, মোরেলগঞ্জ বিষখালী নদী সংরক্ষণ প্রকল্পের আওতায় ইতোমধ্যে সাড়ে ১০ কিলোমিটার স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। মোরেলগঞ্জ শহরসহ ঘষিয়াখালী হয়ে সন্ন্যাসী অভিমুখী চারটি স্থানে নদী সুরক্ষায় জিও ব্যাগ ও ব্লক ফেলার কাজ চলমান রয়েছে। তবে নদীর অপর প্রান্ত হোগলাবুনিয়ায় বেড়িবাঁধ নির্মাণের কোনো প্রকল্প অনুমোদন হয়নি।