মেরিনা লাভলী, রংপুর
প্রকাশ : ০৮ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৭:২৮ পিএম
আপডেট : ০৮ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৭:৩১ পিএম
রংপুরের ঐতিহ্যবাহী শ্যামাসুন্দরী খালের প্রাণ ফেরাতে তিন ধাপ উদ্যোগ পাঁচ বছরেও বাস্তবায়িত হয়নি। বিভিন্ন সময় খালের অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ, ময়লা-আবর্জনা অপসারণ কার্যক্রম বাস্তবায়িত হয়েছে। কিন্তু পরিকল্পিতভাবে স্থায়ী প্রকল্প গ্রহণ না করায় ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে খালটি। এতে খালের পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে বর্ষা মৌসুমে নগরীতে জলাবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে।
জানা গেছে, রংপুর নগরীর বুক চিরে বয়ে যাওয়া প্রায় ১৩৪ বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী শ্যামাসুন্দরী খাল। নগরবাসীকে ম্যালেরিয়া ও জলাবদ্ধতা থেকে রক্ষায় ১৮৯০ সালে তৎকালীন পৌরসভার চেয়ারম্যান ও ডিমলার রাজা জানকি বল্লভ সেন তার মা শ্যামাসুন্দরীর স্মরণে এ খাল পুনঃখনন করেন। খালটি রংপুর সিটি করপোরেশন এলাকার মধ্যে ১৫ দশমিক ৮০ কিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত। এলাকাভেদে এর প্রস্থ ২৩ থেকে ৯০ ফুট। খালটি উত্তর পশ্চিমে কেল্লাবন্দ ঘাঘট নদী থেকে শুরু হয়ে নগরীর বিভিন্ন এলাকার বুক চিরে মাহিগঞ্জ সাতমাথা রেলগেট এলাকায় কেডি ক্যানেল স্পর্শ করে মিশেছে খোকসা ঘাঘট নদীতে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, রংপুর সিটি করপোরেশন ও বিভাগ হওয়ার পর থেকে নগরীতে জনসংখ্যা বেড়েছে। শ্যামাসুন্দরী খাল ঘেঁষে গড়ে উঠেছে বড় বড় অট্টালিকা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, রেস্টুরেন্ট ও আবাসিক ভবন। সেখানকার আবর্জনা ফেলা হচ্ছে খালে। এতে খাল ভরাট হয়ে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দুর্গন্ধ ছড়ানোসহ নগরীতে মশা-মাছির উপদ্রব বেড়েছে। এ ছাড়া অনেকে পয়ঃনিষ্কাশনের সংযোগ এ খালের সঙ্গে দেওয়ায় এর পানি দূষিত হচ্ছে।
এদিকে, শ্যামাসুন্দরী খালের পুরোনো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে ২০১৯ সালের ২৬ আগস্ট জেলা প্রশাসক সম্মেলন কক্ষে প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, সেনাবাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, নদী বিশেষজ্ঞ, প্রকৌশলী, শিক্ষক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও সাংবাদিকদের সমন্বয়ে আলোচনাসভা হয়। খালটি পুনরুজ্জীবিত করতে তিনটি ধাপে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। সীমানা নির্ধারণ, পুনরুদ্ধার ও পুনরুজ্জীবিত কর্মসূচির আওতায় ওই বছর ২৩ অক্টোবর নগরীর চেকপোস্ট এলাকায় সীমানা নির্ধারণ কাজ উদ্বোধন করা হয়। পরে স্থানীয় অধিবাসীদের সঙ্গে আলোচনাসভাও হয়। এরপর সীমানা নির্ধারণ ও অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। তবে ২০২০ সালে করোনার প্রকোপ বেড়ে গেলে থমকে যায় শ্যামাসুন্দরীর প্রাণ ফেরানোর কাজ। ওই বছর ২৭ সেপ্টেম্বর ১১ ঘণ্টায় ৪৩৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতে রংপুর নগরীর প্রধান সড়ক, পাড়া-মহল্লার অলি-গলিসহ বেশিরভাগ এলাকা তলিয়ে যায়। ঘরবাড়ি, দোকানপাট, মালামাল, খাদ্যশস্যসহ প্রায় অর্ধকোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়। ২০২১ সালের ৩ অক্টোবর ২৪ ঘণ্টায় ২৬৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হলে শ্যামাসুন্দরী খাল দিয়ে পানি নিষ্কাশন না হওয়ায় নগরীতে তীব্র জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। পরপর দুই বছর জলাবদ্ধতা ও করোনার প্রকোপ কমে গেলে ২০২১ সালের শেষ দিকে রংপুর সিটি করপোরেশন শ্যামাসুন্দরী নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার জন্য ৮৬ লাখ টাকা ব্যয়ে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেয়। কথা ছিল ওই প্রতিষ্ঠান প্রশাসন, প্রকৌশলী, সুশীল সমাজসহ স্থানীয়দের নিয়ে আলোচনা করে খালটি সংস্কারে স্থায়ী পরিকল্পনা নেবে। কিন্তু সেই পরামর্শক প্রতিষ্ঠানেরও দৃশ্যমান কোনো কার্যক্রম দেখা যায়নি। চলতি বছরের ১১ মে রংপুর সিটি করপোরেশনের সহযোগিতায় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বিডি ক্লিনের এক হাজার সদস্য খালের পাঁচ কিলোমিটার অংশে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালায়। এতে খালে ফেলা প্লাস্টিক, কাচ, গৃহস্থালির বর্জ্য, লতা-পাতা, কচুরিপানা অপসারণ করে তারা। এ কার্যক্রমের সাত মাস পর শ্যামাসুন্দরী খাল আবারও ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে।
এদিকে, দীর্ঘদিন পর গত বুধবার সকালে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে শ্যামাসুন্দরী খালের ১১৭ জন অবৈধ দখলদারের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে অভিযান শুরু হয়েছে। সেই সঙ্গে খালের সীমানা নির্ধারণের কার্যক্রম চলছে।
নগরীর কেরানীপাড়ার মজিবর মিয়া বলেন, শ্যামাসুন্দরী খালের সংস্কার নিয়ে অনেক রাজনীতি হয়েছে। অনেক অর্থ লোপাটও হয়েছে। কিন্তু খালের কোনো উন্নয়ন হয়নি। আমরা চাই ছোটবেলায় যেমন প্রবহমান খাল দেখেছি, সংস্কারের মাধ্যমে ঠিক তেমনটা যেন ফিরে পেতে।
স্থানীয় বাসিন্দা আক্কাস আলী বলেন, ময়লা, আবর্জনার কারণে খালে পানি আটকে থাকছে এবং দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। মানুষ ইচ্ছা করেই খালে ময়লা ফেলে ভরাট করছে। এ খাল রক্ষায় সবাইকে সচেতন হওয়া উচিত। এর আগেও আমরা উচ্ছেদ অভিযান দেখেছি। কিন্তু খালের কোনো উন্নয়ন হয়নি।
শিক্ষার্থী তানভীর ইসলাম বলেন, মামার কাছে শুনেছি এ খালে মাছ পাওয়া যেত। এখন তো তা চিন্তাই করা যায় না। আমি খালের ধার দিয়ে প্রতিদিন স্কুলে যাতায়াত করি। প্রচুর দুর্গন্ধ ও মশা উৎপত্তি হয় এ খালে। আমরা চাই এ সরকারের আমলে পরিকল্পিতভাবে এ খালের স্থায়ী সংস্কার হোক।
রংপুর জেলা প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ সহকারী কমিশনার মাহমুদ হাসান মৃধা বলেন, অবৈধ স্থাপনার কারণে খালের দুই পাড় বন্ধ হয়ে রয়েছে। তাই প্রথমে ১১৭টি অবৈধ দখলদার চিহ্নিত করে তাদের স্থাপনা উচ্ছেদ করা হচ্ছে। এরপর খালের দুই পাড় পরিদর্শন করে বিভাগীয় প্রশাসন, জেলা প্রশাসন ও সিটি করপোরেশনের যৌথ উদ্যোগে শ্যামাসুন্দরী খালের দখল ও দূষণ রোধে ব্যবস্থা নেব।