বিহঙ্গ
এসকে সুজয়, নড়াইল
প্রকাশ : ০৮ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৫:৪১ পিএম
নড়াইলের কালিয়া উপজেলার পানিপাড়া গ্রামের ইকো পার্কে আসা অতিথি পাখি। প্রবা ফটো
মৌসুমের শুরুতেই ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি আসতে শুরু করেছে নড়াইলের কালিয়া উপজেলার নড়াগাতি থানার পানিপাড়া গ্রামের ‘কৃষি পর্যটনকেন্দ্র অরুনিমা ইকো পার্কে’। বর্তমানে অতিথি পাখি আর দেশি পাখি মিলে নড়াইলের অরুনিমা রিসোর্ট গলফ ক্লাব এখন পাখিদের রাজ্যে পরিণত হয়েছে। আর পাখির এ রাজ্যে লাখো লাখো পরিযায়ী ও দেশি পাখির কলতানে মুখরিত হচ্ছে পুরো এলাকা।
২০০৪ সাল থেকে প্রতি বছরই শীত মৌসুমসহ বছরের ৮ মাস বিভিন্ন প্রজাতির পাখির কলতানে মুখরিত থাকে এলাকাটি। পাখি সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করায় এক যুগ আগে থেকেই এলাকাটির পরিচিতি ‘পাখি গ্রাম’ নামে। আর প্রতি বছরই এর ব্যাপ্তি বাড়ছে।
নড়াইল শহর থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরে নড়াগাতি থানার পানিপাড়া গ্রামে মধুমতী নদী থেকে সামান্য দূরে পিচ ঢালাই রাস্তার পাশে ‘কৃষি পর্যটনকেন্দ্র অরুনিমা ইকো পার্কের’ অবস্থান। প্রায় দুইশ বিঘা জমিজুড়ে বিভিন্ন গাছের ডালে গড়ে উঠেছে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রজাতির পাখির কয়েক হাজার বাসস্থান। ইতোমধ্যে হাজার হাজার অতিথি পাখির কলতান দেশি-বিদেশি ভ্রমণপিয়াসীদের মনে জায়গা করে নিয়েছে। দেশি-বিদেশি পর্যটক আসায় কয়েকশ বেকার যুবকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে ।
বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা এসব পাখি প্রতিদিন বিকালে গাছের ডালে এসে বসে। রাত যত গভীর হয় পাখিদের আগমন তত বাড়তে থাকে। সারারাত পাখির কলতানে মুখরিত থাকে পুরো এলাকা। ভোর হলেই বেশিরভাগ পাখি উড়ে চলে যায়। আবার বিকাল হলে চলে আসে এখানে।
পানিপাড়া গ্রামে গেলে এলাকাজুড়ে চোখে পড়বে বক, হাঁসপাখি, পানকৌড়ী, শালিখ, টিয়া, দোয়েল, ময়না, মাছরাঙা, ঘুঘু, শ্যামা, কোকিল, টুনটুনি, চড়ুইসহ নাম না জানা দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রজাতির পাখি। এখানে প্রতিদিন হাজার হাজার পাখির প্রজনন ঘটছে। ডিম থেকে ফুটছে বাচ্চাও। বর্তমানে দেশের একমাত্র এই কৃষি পর্যটনকেন্দ্রটি পরিণত হয়েছে পাখির অভয়ারণ্যে।
আর এই নয়নাভিরাম সৌন্দর্য দেখতে প্রতিনিয়ত দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসছে অসংখ্য পাখিপ্রেমী ও বিনোদনপ্রিয় মানুষ। তবে এখানে পাখি শিকার নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। তাই পাখিদের অন্ততপক্ষে মারা পড়ার ভয় নেই। আর এই ভরসাই এখানে দিনের পর দিন বেড়েছে পাখির আনাগোনা। এ অভয়ারণ্যে যারা আসছেন তারা সবাই যেন পাখি সংরক্ষণের নিশ্চয়তা দিচ্ছেন। এখানে এসে যেন নতুনভাবে শপথ নেন পাখি নিধন না করার।
পার্ক সূত্রে জানা গেছে, দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আবাসিক সুবিধার জন্য এখানে রয়েছে সুইমিং পুল, এসি, নন-এসি ৩৪টি কটেজ। এক রুমবিশিষ্ট ভাসমান কটেজ রয়েছে দুটি। এখানে আবাসিক বোটসহ প্রতিটি কটেজেই রয়েছে খাবারের সুব্যবস্থা। লেকের মাঝে রয়েছে দ্বীপ রেস্টুরেন্ট, চিত্রা কনভেনশন হল, এস এম সুলতান লাউঞ্জ, দ্বীপ কটেজেস এবং সরকার অনুমোদিত টিপসি বার ও ভাসমান ব্যাংককুয়েট। এসব রেস্টুরেন্টে দেশি-বিদেশি খাবার, ফলের জুস, নিজস্ব খামারে উৎপাদিত সবজি ও মাছের ফ্রাইসহ আরও আছে বারবিকিউ। এখানে আছে চারশজনের সেমিনার বা কনফারেন্সের ব্যবস্থা। এ ছাড়াও রয়েছে প্রায় ১০০ জনের আবাসিক সুবিধা।
অরুনিমা ইকো পার্কের ম্যানেজার মুনিব খন্দকার বলেন, এ বছর সেপ্টেম্বর মাসের শুরুতে পাখির আগমন বেড়েছে। প্রতিনিয়ত ঝাঁকে ঝাঁকে অতিথি পাখিসহ দেশীয় পাখি ডানা মেলে উড়ে যাচ্ছে আবার আসছে। এখানে প্রজননের সুযোগ-সুবিধা থাকায় ক্রমান্বয়ে বাড়ছে পাখির সংখ্যা। সেই সঙ্গে বাড়ছে পাখির কলতান। এই কলতানে মুখরিত হয়ে সৃষ্টি হয়েছে এক অপরূপ পরিবেশের। নয়নাভিরাম এই দৃশ্য দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসছে পাখিপ্রেমী মানুষরা। পাখির এই অভয়ারণ্যের অনুকরণে দেশের অনেক স্থানে কৃষি পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তুলতে অনেকেই আগ্রহী হবেন প্রত্যাশা করছি।
আর এক দর্শনার্থী হাসান রহমান জানান, সময় পেলেই পাখি দেখতে ছুটে আসেন তিনি। একা অথবা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে পাখিদের এই অভয়ারণ্য দেখতে আসেন। মানসিক প্রশান্তি এবং সৌন্দর্য উপভোগ করতে এখানে আসেন।
পাখিপ্রেমী রুনা খানম জানান, ছোটবেলা থেকে তার কাছে পাখি খুব প্রিয়। একসঙ্গে এত পাখি আগে কখনও দেখেননি। এ যেন অবিশ্বাস্য এক গল্প। তবে এখানে পাখিদের কোনো ভয় নেই। খুব কাছ থেকে পাখি দেখা যায়।
নড়াইল সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কেয়া রেনু রায় বলেন, ‘পরিযায়ী পাখি আমাদের প্রকৃতির জন্য খুব উপকারী। পাখিদের বসবাসের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা দরকার। পাখি শিকার বন্ধে যে আইন আছে সেটা যথাযথ প্রয়োগ করতে হবে।’
অরুনিমা ইকো পার্কের চেয়ারম্যান খবির উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘দশ বছর আগেও শীত মৌসুমে জেলার বিভিন্ন এলাকার খালে, বিলে ও জলাশয়ে অতিথি পাখির বিচরণ দেখা যেত। কালক্রমে তা হারিয়ে গেলেও এই পার্কে পাখিদের কোলাহল একটুও কমেনি। বাংলাদেশের একমাত্র কৃষি পর্যটনকেন্দ্র পরিণত হয়েছে পাখিদের অভয়ারণ্যে। এই মৌসুমে এ-রকম লাখো পাখির আগমন এদেশে কল্পনাতীত। এটা যেন পাখির রাজ্য।’