× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

গৃহবধূ থেকে সফল কৃষি উদ্যোক্তা মর্জিনা

রায়হানুল ইসলাম আকন্দ, শ্রীপুর (গাজীপুর)

প্রকাশ : ০৭ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৭:২১ পিএম

শ্রীপুর উপজেলার তেলিহাটি ইউনিয়নের টেংরা গ্রামে নিজের লাউক্ষেতে সফল উদ্যোক্তা মর্জিনা বেগম।

শ্রীপুর উপজেলার তেলিহাটি ইউনিয়নের টেংরা গ্রামে নিজের লাউক্ষেতে সফল উদ্যোক্তা মর্জিনা বেগম।

বসতবাড়ির পাশে ৫ বিঘা জমির ওপর খনন করা অন্যের পুকুর। পুকুরের পানিতে মাছের সমারোহ। পুকুরের চারপাশে সারি সারি মাচায় ঝুলছে শীতকালীন নানান সবজি ও লাউ। মাছ-সবজি ও লাউ বিক্রি করে চলতি মৌসুমে তার আয় হবে প্রায় বিশ লাখ টাকা। বলছি শ্রীপুরের গৃহবধূ সফল কৃষি উদ্যোক্তা মর্জিনা বেগমের কথা। স্বামী-সন্তানদের নিয়ে একটা সময় কঠিন সময় পার করলেও আজ তিনি স্বাবলম্বী এবং সফল এক নারী। 

স্বামী, চার মেয়ে, এক ছেলে ও শাশুড়িকে নিয়ে আট সদস্যের সংসার। সব কাজ এক হাতে সামলাচ্ছেন গৃহবধূ মর্জিনা বেগম। পাশাপাশি নিজের পুকুর ও সবজি বাগানেও সময় দিচ্ছেন। ৩৫ বছর বয়সি এই গৃহবধূ কীভাবে হলেন কৃষি উদ্যোক্তাÑ সম্প্রতি গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার তেলিহাটি ইউনিয়নের টেংরা (উত্তরপাড়া) গ্রামে তার ৬ বিঘা বাগানে যাওয়া হয় সাফল্যের গল্প শুনতে।

মর্জিনা জানান, ২০০৪ সালে এসএসসি পরীক্ষার ফরম ফিলাপের আগের দিন পাশের টেংরা গ্রামের প্লাম্বার মিস্ত্রি আকতারুজ্জামানের সঙ্গে বিয়ে হয় তার। ২০০৫ সালে স্থানীয় উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন তিনি। বর্তমানে তাদের সংসারে চার মেয়ে এবং এক ছেলে। এর মধ্যে বড় মেয়ে সুমাইয়া এইচএসএসসি প্রথম বর্ষে, সিনথিয়া নবম শ্রেণিতে, সুরাইয়া ক্লাশ থ্রিতে এবং সামিয়া প্রথম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত। সংসারের সব সামলেও নিজের কিছু করার ইচ্ছা ছিল মর্জিনা বেগমের। সেই ইচ্ছা থেকেই তিনি আজ সফল উদ্যোক্তা। 

মর্জিনা বেগম বলেন, দুই বছর আগে বাড়ির পাশে খোলা জায়গায় খাওয়ার জন্য ডায়না জাতের লাউ বীজ বপন করি। ওই বছরে ভালো ফলন হওয়ায় পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে প্রতিবেশীদের বিলিয়ে স্থানীয় টেংরা বাজারেও বিক্রি করি। তখন চিন্তা আসল লাউ লাভজনক সবজি। তখন স্বামীর সঙ্গে পরামর্শ করি বড় পরিসরে লাউ চাষ করার। তিনি সম্মতি দিলে ২০২৩ সালে দেড় বিঘা জমিতে লাউ চাষ করি। চলতি বছর অন্যের ৫ বিঘা জমির ওপর খনন করা পুকুর স্বামীর কাছ থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা ও নিজের নাকফুল, কানের দুল, গলার চেইন বিক্রি করে পাই ৫০ হাজার টাকা। মোট ২ লাখ টাকায় ভাড়া নিয়ে পুকুরের চারপাশে ১৩০টি থলায় লাউয়ের চারা রোপণ করি। বাড়ির উত্তর-পশ্চিম পাশে নিজের দেড় বিঘা জমিতেও ১০৮টি থলায় লাউয়ের চারা রোপণ করি। মোট সাড়ে ৬ বিঘা জমিতে মেটাল, লাল তীর ডায়না এবং পল্লবী তিন জাতের ২৩৬টি লাউয়ের থলায় প্রচুর পরিমাণে লাউ আসছে।

তিনি আরও জানান, পুকুরপাড়ে ২০০টি লাল তীর বীজ বপন করি। এর মধ্যে ১৮০ গাছে ফলন ভালো হয়। এখন তার বাগানে প্রায় ছয় হাজার লাউ আছে। পাইকাররা তার ক্ষেত থেকে লাউ নিজ হাতে কেটে নেন। প্রতি লাউ প্রকারভেদে ৫০ থেকে ৭০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করেন।

মর্জিনা বেগম আরও জানান, স্বামী কাজে বেরিয়ে গেলে অলসভাবে বসে থাকা ভালো লাগত না। ইচ্ছে জাগে বসতবাড়ির আশপাশে শাকসবজি ও ফলমূলের বাগান গড়ে তোলার। সে চিন্তা থেকে বাড়ির আঙিনা ও খোলা জায়গায় চাষ শুরু করি। লাউ বিক্রি করে বাড়তি আয় হতে থাকে। সংসার খরচের বোঝা কমে যাওয়ায় প্রথম থেকেই স্বামী কোনো আপত্তি করেননি। বৃষ্টির কারণে কিছুটা ক্ষতি হলেও মাত্র ৪৫ দিনের মাথায় প্রচুর পরিমাণে লাউ ধরে গাছগুলোতে। সাড়ে ৬ বিঘা জমিতে লাউ গাছের মাচা তৈরিতে বাঁশ, খোটা, থলা তৈরি করা সব মিলিয়ে তার খরচ হয়েছে এক লাখ টাকা। এ পর্যন্ত ৩ থেকে ৪ লাখ টাকার লাউ বিক্রি করেছেন। চলতি মৌসুমে তিনি ১৫ লাখ টাকার লাউ বিক্রি করবেন বলে আশা করছেন। 

লাউক্ষেতে গিয়ে দেখা যায়, তার সঙ্গে স্বামী আকতারুজ্জামান, দুই মেয়ে সুমাইয়া জীম ও সিনথিয়া আক্তার লাউ-বাগানে কাজ করছে। কীটনাশকের ব্যবহার এড়াতে আক্রান্ত লাউ এবং মরে যাওয়া লাউপাতা কেটে ফেলে দিতে দেখা যাচ্ছে। কোনো রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার না করে শুধু জৈবসার দেন লাউগাছে। বিষমুক্ত লাউ চাষ করেন। স্থানীয় গরুর খামার থেকে গোবরের সার সংগ্রহ করে ব্যবহার করেন লাউগাছে।

বর্গা নেওয়া পুকুরে মর্জিনা মাছও চাষ শুরু করেছেন। মাছ বিক্রি করে আয়েরও পরিকল্পনা রয়েছে মর্জিনার। স্থানীয় কৃষি অফিস থেকে মর্জিনাকে ভালো পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সার-ওষুধ কীভাবে প্রয়োগ করতে হবেÑ সে বিষয়ে স্থানীয় উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সব সময় যোগাযোগ করেন। পুকুরের মাছ এবং লাউ বিক্রির লভ্যাংশ দিয়ে আরও ভালো কিছু করার পরিকল্পনা আছে।

মর্জিনার স্বামী আকতারুজ্জামান বলেন, আমি ইলেক্ট্রিক ও প্লাম্বার মিস্ত্রি। গত দুই বছর আগে কালিয়াকৈরের ফুলবাড়িয়া এলাকা থেকে লাউয়ের চারা সংগ্রহের জন্য যাই। সেখান থেকে নার্সারির মালিক আমাকে ২০টি চারা দিলে নিজে খাওয়ার জন্য বাড়ির চারপাশে রোপণ করি। আমার স্ত্রী গাছগুলো খুব যত্ন করে বড় করে। গাছগুলোতে অনেক লাউ আসে। নিজে খেয়ে প্রতিবেশীদের দিয়ে বাজারে বিক্রিও করেছি। তখন থেকেই মনে হয়েছে লাউ চাষ লাভজনক সবজি। গত বছর তিন বিঘা জমিতে লাউ চাষ করে সকল খরচ বাদ দিয়ে ১০ লাখ টাকা ক্যাশ থাকে। মর্জিনার পরিশ্রমই আমার সংসারের ভাগ্য বদলেছে। চলতি বছরে প্রথম ধাপেই ৪ লাখ টাকার লাউ বিক্রি করেছি। আরও তিন থেকে চারবার লাউ নামাতে পারব। সে থেকে ১৫ লাখ টাকার লাউ বিক্রির আশা করেন তিনি।

মর্জিনা বলেন, বাড়ির আঙিনা ও আশপাশের পতিত জমিতে লাউ চাষ করেন। লাউ চাষ খুব লাভজনক সবজি। এতে বেশি খরচ হয় না। জৈব সার দিয়ে লাউ চাষ করা যায়। রাসায়নিক সার ব্যবহার না করলেও চলে। নিজের পুষ্টি ও চাহিদা মিটিয়ে বাজারে বিক্রি করে লাভবান হতে পারবেন।

শ্রীপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুমাইয়া সুলতানা বন্যা বলেন, শীতকালে লাউ জনপ্রিয় একটি সবজি। চলতি মৌসুমে উপজেলায় ১৭৫ হেক্টর জমিতে লাউ আবাদ হয়েছে। লাউশাক আবাদ হয়েছে ৫৫ হেক্টর জমিতে। কৃষকদের ওইসব জমির উৎপাদিত লাউ প্রায় ৮ কোটি টাকা বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে। আমাদের পক্ষ থেকে কৃষকদের লাউ চাষে বিভিন্নভাবে পরামর্শ ও উৎসাহ দিয়ে লাউ চাষে উদ্বুদ্ধ করা হয়। 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা