বাঞ্ছারামপুর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৭ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৫:২১ পিএম
আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৫:২২ পিএম
জন্মের মাত্র পাঁচ বছর পর দৃষ্টিশক্তি হারান মো. ইউনুছ আলী। দৃষ্টিশক্তি হারালেও কখনও মনোবল হারাননি তিনি। সব বাধা জয় করে ছোট্ট একটি মুদি দোকান চালিয়ে আজ তিনি স্বাবলম্বী। হয়েছেন সমাজের কাছে দৃষ্টান্ত।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার রূপসদী গ্রামের মৃত খালেক বেপারীর ছেলে ইউনুছ আলী। তিন ভাই, তিন বোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ব্যবসায়ী বাবা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে ১৯৮৬ সালে ১৭ বছর বয়সে সংসারের দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নেন ইউনুছ আলী। অন্যের কাছ থেকে এক হাজার টাকা ধার নিয়ে এই পুঁজি দিয়ে বাড়ির পাশে একটি মুদি দোকান চালু করেন।
একদিকে বাবার চিকিৎসা অন্যদিকে সংসারের খরচ জোগাতে হিমশিম খান ইউনুছ আলী। তবু কখনও ভেঙে পড়েননি তিনি। নিজ চেষ্টায় দোকানের ব্যাপক উন্নতি করেন। তিন বোনকে বিয়ে দেন বড় ভাইয়ের অকাল মৃত্যুর পর। বড় ভাইয়ের সংসারের দায়িত্বও পালন করেন তিনি। দোকানের সব পণ্য মাপার কাজ তিনি নিজেই করেন। প্রথম দিকে বাকির হিসাব লিখে রাখত প্রতিবেশীদের মাধ্যমে, পরে তার সন্তানরা, এখন নাতি ও ছেলের বউ লিখে রাখেন বাকির হিসাবের খাতা। দোকান থেকে কেউ বাকি নিলে তিনি নাম স্বরণ রেখে বাড়িতে গিয়ে নাতি ও ছেলের বউকে বললে তারা লিখে রাখেন।
১৯৯৮ সালে উপজেলার ছলিমাবাদ গ্রামের ফরিদা আক্তারকে বিয়ে করেন। তাদের সংসারে ২ ছেলে ও ২ মেয়ে। এক মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে, বড় ছেলে বিয়ে করেছেন। তিনি ২০০৭ সালের জানুয়ারি থেকে প্রতিবন্ধী ভাতা পাচ্ছেন।
রূপসদী গ্রামের সৌদি প্রবাসী আল আমিন জানান, আমি ছোটকাল থেকেই ওনার দোকান থেকে মালামাল কিনে আসছি। উনি সমাজের জন্য একটি উদাহরণ। দৃষ্টিহীন হয়েও ভিক্ষাবৃত্তি বা কারো কাছে হাত না পেতে ব্যবসা করছেন।
দোকানের ক্রেতা পিয়ারা বেগম বলেন, সবাই ওনার কাছ থেকে সদাইপাতি নেয়। আমরাও সবসময় ইউনুস আলীর দোকান থেকে সদাইপাতি নেই। ওনার ব্যবহার অনেক ভালো। একবার হাজার টাকার বাকি নিলে ১৫ দিন বা সপ্তাহখানেক এর মধ্যে আমরা পরিশোধ করি। উনি দোকান দেওয়ার পর থেকে আমরা বাকি ও নগদ নিয়ে থাকি সবসময়।
রূপসদী মধ্য সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক কবির হোসেন বলেন, ইউনুছ আলী আমাদের সমাজের জন্য উদাহরণ। আমি ছোটবেলা থেকেই দেখতেছি উনি অন্ধ হয়েও অন্যের দ্বারস্থ না হয়ে নিজের স্বাবলম্বী হতে ছোট টং দোকান নিয়ে মুদি দোকানদারি করে জীবনযাপন করছেন। আমি ওনার মঙ্গল কামনা করি।
স্থানীয় বাসিন্দা নেপাল দেবনাথ বলেন, প্রায় ৩৮ বছর ধরে ইউনুস আলী দোকানে মালামাল বিক্রি করেন। আমাদের পাইকারি দোকান থেকেও মাল ক্রয় করে খোঁচা বিক্রি করতেন তিনি। উনি কারো কাছে হাত না পেতে দোকান দিয়ে বাঁচতেছেন- এতে আমরা অনেক খুশি।
মুদি ব্যবসায়ী ইউনুস আলী বলেন, জন্মের ৫ বছরের সময়, টাইফয়েড জ্বরের পর চোখ অন্ধ হয়ে যায়। ১৭ বছর বয়সে বড় ভাইয়ের মৃত্যুর পর আমার বাবা অসুস্থ হয়ে পড়লে সংসারের দায়িত্ব আমি নেই। বাড়ির পাশে একটি মুদি দোকান খুলি। এভাবেই ধীরে ধীরে আমার সংসার চালিয়ে নিজে বিয়ে করেছি। সন্তানদের বিয়ে দিয়েছি আমি এখন মোটামুটি স্বাবলম্বী। অনেকেই নিজে কাজ না করে ভিক্ষাবৃত্তিসহ বিভিন্ন পেশায় জড়িয়ে পড়েন। আমি মনে করি চেষ্টায় মানুষের সবকিছু। মনোবল মানুষকে সবকিছু করতে শেখায়।