হবিগঞ্জের ন্যাশনাল টি কোম্পানি
মহিউদ্দিন আহাম্মেদ, মাধবপুর (হবিগঞ্জ)
প্রকাশ : ০৫ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৭:১৯ পিএম
আপডেট : ০৫ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৭:২৪ পিএম
প্রায় তিন মাস ধরে চা-শ্রমিকদের বেতন ও রেশন বন্ধ। শ্রমিকরা অনাহারে-অর্ধাহারে মানবেতর দিনযাপন করেছে। বুধবার (৪ ডিসেম্বর) সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, ন্যাশনাল টি কোম্পানির (এনটিসি) হবিগঞ্জ জেলার চণ্ডিছড়া, পারকূল, তেলিয়াপাড়া ও জগদীশপুর চা বাগানের প্রায় সাড়ে তিন হাজার শ্রমিকের মধ্যে চলছে নীরব দুর্ভিক্ষ। তাদের ঘরে জ্বলছে না রান্নার চুলা। অন্যদিকে নষ্ট নতুন কুঁড়ি, কচি পাতা বুড়িয়ে যাচ্ছে গাছেই। এসব বাগানে ধস নেমেছে চা উৎপাদনে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তীব্র অর্থ সংকটে বর্তমানে বিপর্যস্ত সরকারের ৫১ শতাংশ মালিকানাধীন একসময়ের লাভজনক ন্যাশনাল টি কোম্পানির (এনটিসি) চারটি চা বাগান। চলমান পরিস্থিতিতে চায়ের উৎপাদন বন্ধ থাকায় আগামীতে এ সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করবে বলে আশঙ্কা মালিক-শ্রমিক উভয় পক্ষের।
বাগান সূত্র জানায়, গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এনটিসি চেয়ারম্যান ও সাত পরিচালক একযোগে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান। এতে আটকে যায় ব্যাংকঋণ। ফলে অর্থ সংকটে পড়ে ন্যাশনাল টি কোম্পানি। এতে বন্ধ হয়ে যায় শ্রমিকদের মজুরি ও রেশন। কোম্পানির চেয়ারম্যান সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আত্মীয় শেখ কবির আহমেদ আত্মগোপনে রয়েছেন। পরিষদের সাত পরিচালকও পদত্যাগ করেছেন। আকস্মিক এই পরিস্থিতিতে তীব্র সংকট দেখা দেয়। এতে লস্করপুর ভ্যালির মূল চারটি বাগানসহ সাতটি চা বাগানের শ্রমিকদের মজুরি ও কর্মরতদের বেতন ও রেশন আটকে যায়। একই পরিস্থিতি কোম্পানির অধীনে থাকা অন্য বাগানগুলোতেও। চণ্ডিছড়া, পারকুল, তেলিয়াপাড়া ও জগদীশপুর চা বাগানের সাড়ে তিন হাজার শ্রমিকের সাপ্তাহিক মজুরি বন্ধ থাকে ২২ আগস্ট থেকে। পরে শ্রমিকরা বকেয়া পরিশোধের দাবিতে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। কোনো সমাধান না পেয়ে চলতি বছরের অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে কর্মবিরতিতে যান শ্রমিকরা। এর পরই বন্ধ হয়ে যায় চা উৎপাদন। এর পর থেকেই নষ্ট হতে শুরু করে বাগানে মজুদ থাকা ১০ লাখ কেজি তৈরি চা পাতা। প্রতিটি বাগানে দৈনিক ২০-২২ হাজার কেজি নতুন কুঁড়ি ও কাঁচা পাতা তোলা হয়। শ্রমিক না থাকায় কুঁড়ি ও কচি পাতা নষ্ট হচ্ছে গাছেই। এ কারণে চলমান সংকটের পাশাপাশি উৎপাদনে ধস নামায় আগামীতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেন শ্রমিকরা।
তেলিয়াপাড়া চা বাগানের শ্রমিক বনীতা তাতি, শ্রীমতী অধিকারী, গোপেশ প্রাণ তাতি, গায়েত্রী তাতি জানান, তিন মাস ধরে তাদের বেতন ও রেশন বন্ধ। যারা বাইরে কাজ করতে পারেন, তারা কোনোভাবে সংসার চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু যারা বাইরে কাজ জোগাড় করতে পারেননি, তারা কষ্টে দিনযাপন করছেন। এক কেজি চাল এনে তিন বেলা খেতে হচ্ছে তাদের। কাউকে বলার মতো কেউ নেই, আমাদের কথা কেউ শোনে না।
তেলিয়াপাড়া চা বাগানের পঞ্চায়েত সভাপতি খোকন তাতি বলেন, বেতন ছাড়া প্রায় চার সপ্তাহ কাজ করেছেন শ্রমিকরা। এরপর বেতন না পেয়ে তারা কাজ বন্ধ করে দেন। প্রায় ছয় সপ্তাহ ধরে শ্রমিকরা কর্মবিরতি পালন করছেন। এখন তারা খেয়ে না খেয়ে দিন পার করছেন।
চণ্ডিছড়া চা বাগানের পঞ্চায়েত সভাপতি রঞ্জিত কর্মকার বলেন, গত আগস্টের ১৫-২০ তারিখ থেকে আমাদের বেতন বন্ধ আছে। বেতন না পাওয়ায় অনেক শ্রমিক আছে এক-দুইবেলা খায়। আবার অনেক পরিবার চিড়া-মুড়ি খেয়ে আছে। পাঁচ সপ্তাহ ধরে বেতন না পাওয়ার পরও আমরা কাজ করেছি। পরে ন্যাশনাল টি কোম্পানির (এনটিসি) হবিগঞ্জের চারটিসহ ১২টি বাগানে কর্মবিরতি ঘোষণা করেন শ্রমিকরা। প্রায় ছয় সপ্তাহ ধরে চলছে কর্মবিরতি।
কেন্দ্রীয় চা শ্রমিক ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নৃপেন পাল বলেন, আশা করা যাচ্ছে, শিগগির কর্মচঞ্চল হয়ে উঠবে বাগানগুলো। সে ক্ষেত্রে এতদিনের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে মালিক ও শ্রমিকসহ সংশ্লিষ্ট প্রত্যেক পক্ষকে একযোগে কাজ করতে হবে। তবে মালিকপক্ষ এই সময়ের মধ্যে সমস্যার সমাধান না করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। শ্রমিকদের বকেয়া আদায়ে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
চণ্ডিছড়া চা বাগানের জেনারেল ম্যানেজার সেলিমুর রহমান বলেন, বাগান বন্ধ রয়েছে ৮-১০ সপ্তাহের মতো হবে। শ্রমিকদের ধর্মঘট চলছে এক মাস হবে। এর ফলে চা গাছের পাতাগুলো বড় হয়ে যাচ্ছে। বাগানকে প্রচুর পরিমাণ লোকসানের মুখে পড়তে হয়েছে। গত বছরও রেকর্ড গড়ে চায়ের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গিয়েছিল বাগানগুলো।
তেলিয়াপাড়ায় চা বাগানের ব্যবস্থাপক মো. রাহেল রানা বলেন, এ সপ্তাহে শ্রমিকদের বেতন দেওয়া হবে বলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। আশা করি, খুব শিগগির সব সমস্যার সমাধান হবে।