× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি

২৭ বছর কেটে গেল, শান্তির দেখা নেই পাহাড়ে

রিকোর্স চাকমা, রাঙামাটি ও খোকন বিকাশ ত্রিপুরা জ্যাক, খাগড়াছড়ি

প্রকাশ : ০২ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৪:৩০ পিএম

আপডেট : ০২ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৪:৩০ পিএম

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির ২৭ বছর পেরিয়ে গেলেও কাঙ্ক্ষিত শান্তির দেখা নেই পাহাড়ে। মানুষের ভাগ্যের ঘটেনি কোনো পরিবর্তন। চুক্তির বয়স বাড়ছে, কিন্তু এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার যে গতি সেটা মন্থর থেকে মন্থরতর পর্যায়ে গিয়ে থমকে পড়ে আছে। চুক্তির মৌলিক ধারাগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন না হওয়ায় পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান হয়নি। ফলে পাহাড়ে এখনও অশান্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যাকে জাতীয় ও রাজনৈতিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে এর স্থায়ী ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের লক্ষ্যে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। সেই চুক্তির ২৭ বছর পূর্ণ হলেও এর মৌলিক ধারাগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন না হওয়ায় অর্জিত হয়নি কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ সমাধান। এ নিয়ে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে রয়েছে হতাশা। পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার জেরে স্থানীয় পাহাড়ি-বাঙালির মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কাও বেড়েছে। পাহাড়িদের অনেকে মনে করেন চুক্তির পর পাহাড়ের মানুষ সুফল পেতে শুরু করেছিল। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে পাল্টে গেছে পার্বত্য এলাকার দৃশ্যপটও। কিন্তু চুক্তির পূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ কিছু ধারা বাস্তবায়ন না হওয়ায় কাঙ্ক্ষিত শান্তির দেখা পাননি পার্বত্যবাসী। 

চুক্তি ঘিরে বিভাজন

জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (পিসিজেএসএস) সঙ্গে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি’ সই করে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। সে সময়ে জনসংহতি সমিতির একটি পক্ষ এই চুক্তির বিরোধিতা করে। সরকারের সঙ্গে জনসংহতি সমিতির চুক্তি সইয়ের পর ১৯৯৮ সালের ২৬ ডিসেম্বর চুক্তিবিরোধী অবস্থান নিয়েই পাহাড়ে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে প্রসিত খীসার নেতৃত্বে গঠিত হয় ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। ২০১০ সালে আবারও সন্তু লারমার জনসংহতি সমিতি ভেঙে আত্মপ্রকাশ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা)। প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই দুই সংগঠনের রাজনৈতিক বৈরিতা থাকলেও চুক্তির বাস্তবায়নের পক্ষে কথা বলেছে নতুন দলটি।

এরপর ২০১৭ সালের ১৫ নভেম্বর খাগড়াছড়িতে আত্মপ্রকাশ করে ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক)। মূলত প্রসিত খীসার নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে সাবেক ইউপিডিএফ নেতা তপন জ্যোতি চাকমা ওরফে বর্মার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠা হয় এটি। শান্তি চুক্তির বিরোধিতা করে ইউপিডিএফ প্রতিষ্ঠিত হলেও ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) চুক্তি বাস্তবায়নের পক্ষে। পার্বত্য চুক্তি নিয়ে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতি ভেঙে চার টুকরো হয়েও শেষাবধি সব সংগঠনই এখন চুক্তির পক্ষে কথা বলছে।

ইউপিডিএফের মুখপাত্র অংগ্য মারমা বলেন, পার্বত্য শান্তি চুক্তিতে অনেক ত্রুটি রয়েছে। আমাদের পার্টি শুরু থেকেই এই চুক্তির বিরোধিতা করে আসছে। চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকার যেমনি আন্তরিকতা দেখায়নি, তেমনি জনসংহতি সমিতিও (সন্তু লারমা) তেমন জোরালো কোনো আন্দোলন-সংগ্রাম করেনি। কিন্তু পাহাড়ের বর্তমান পরিস্থিতি ও বৃহত্তর ঐক্যের স্বার্থে আমরা পার্বত্য চুক্তির বাস্তবায়ন চাইছি। জনসংহতি সমিতি যদি জোরালোভাবে আন্দোলন করে, তাহলে আমরা তাদের সঙ্গে আছি। তবে এক্ষেত্রে অবশ্যই জনসংহতি সমিতিকে আগে পাহাড়ের চলমান ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত বন্ধ করতে হবে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (এমএন লারমা) কেন্দ্রীয় কমিটির তথ্য ও প্রচার বিভাগের প্রধান জুপিটার চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি সম্পাদনের ২৭ বছর অতিক্রান্ত হচ্ছে। তারপরও চুক্তি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন না হওয়ায় পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান হয়নি। ফলে পাহাড়ে এখনও অশান্ত পরিবেশ পরিস্থিতি বিরাজ করছে। তিনি আরও বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ২৫টি বাস্তবায়িত হয়েছে, ১৮টি ধারা আংশিক, ২৯টি ধারা সম্পূর্ণ অবাস্তবায়িত অবস্থায় রয়েছে। আমরা বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে চুক্তির আংশিক ও অবাস্তবায়িত ধারাগুলোর সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন দাবি করছি। সংবিধান সংস্কার কমিশনের কাছে আমরা দাবি করছি, পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সমতলে যে আদিবাসী জাতিসমূহ রয়েছে তাদের প্রত্যেকের নাম যাতে সংবিধানে লিপিবদ্ধ করে জাতি হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। 

ইউপিডিএফ-গণতান্ত্রিক-এর কেন্দ্রীয় সভাপতি শ্যামল চাকমা বলেন, আমরা মনে করি, অন্তর্বর্তী সরকার যেহেতু দেশকে নতুন করে সাজাচ্ছে, সংস্কার করছে; তারা অবশ্যই চুক্তি বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নেবে। 

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (পিসিজেএসএস) কেন্দ্রীয় সহসাধারণ সম্পাদক ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ সদস্য কে এস মং বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি অনুযায়ী পার্বত্য জেলা পরিষদ গঠন করল। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ কমিটি এবং ভূমি কমিশন পুনর্গঠনের কথা শুনতে পাচ্ছি। এটা ইতিবাচক দিক। আমরা মনে করি, এ সরকার পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নেবে।

ইউপিডিএফের ‘চুক্তি সমর্থন’ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তারা চুক্তির বিরোধিতা করেই আসছে। যারা চুক্তি বাস্তবায়নের বিরুদ্ধে ভূমিকা রাখছে, তাদের সঙ্গেই ইউপিডিএফের সখ্য। এখন তারা যদি চুক্তি সমর্থন করে, আমাদের আন্দোলনের সঙ্গে থাকে, তাহলে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতের কথা আসে না। তারা আসলে কী ভাবছে, সেটা তারাই ভালো জানে।

লেখক ও গবেষক মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা বলেন, আমরা মনে করি, চুক্তিটি সবার উপকারের উদ্দেশ্যে করা হয়েছে। চুক্তির কোন ক্ষেত্রে কীভাবে কী করা যায়, কোথাও কোনো ঘাটতি থাকলে সেটা কীভাবে পূরণ করা যেতে পারেÑ উভয়পক্ষ মিলে যদি দেখত, তাহলে হয়তো সেটা সহজেই বাস্তবায়ন করা যেত। 

সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সদস্য অংসুই মারমা বলেন, আমরা স্পষ্ট দেখতে পারছি, বিগত ২৬-২৭ বছরে চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলো বাস্তবায়ন হয়নি, ফলে জনমনে হতাশার বিরাজ করছে। এসব কারণে সাম্প্রতিক যে জাতিগত দাঙ্গা হয়ে গেল খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি জেলায়, এটা খুবই দুঃখজনক। ভারত প্রত্যাগত জুম্ম শরণার্থী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক সন্তোষিত চাকমা বকুল বলেন, গুরুত্বপূর্ণ ধারাগুলো বাস্তবায়ন না করায় জুম্ম জনগণ মানবেতর জীবনযাপন করছে। এজন্য জুম্ম জনগণের মধ্যে ক্ষোভ ও দুঃখ বিরাজ করছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদ খাগড়াছড়ি জেলার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মজিদ বলেন, পার্বত্য চুক্তির মাধ্যমে পার্বত্য বাঙালিদের তৃতীয় শ্রেণির নাগরিক করা হয়েছে। 

পাহাড়ি-বাঙালি সম্পর্কে বৈরিতা

গত ২০ সেপ্টেম্বর রাঙামাটিতে বাঙালি-পাহাড়িদের মধ্যে সংঘাতের ঘটনায় পাহাড়ি-বাঙালি সম্পর্কে বৈরিতা আরও তীব্র হয়েছে। এই ঘটনারও সূত্রপাত খাগড়াছড়িতে চোর সন্দেহে এক বাঙালি যুবককে ‘পিটিয়ে হত্যার’ অভিযোগকে কেন্দ্র করে। গত ১৮ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ি শহরের পানখাইয়া পাড়ায় মোটরসাইকেল চুরির অভিযোগে এক বাঙালি যুবককে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগের পর জেলা শহর ও দীঘিনালায় সংঘর্ষ বেধেছিল। সহিংসতার মধ্যে পরদিন তিনজন নিহতের খবর আসে। এরপর ২০ সেপ্টেম্বর রাঙামাটি জেলা শহরে পাহাড়ি-বাঙালিদের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। দোকানপাট, ঘরবাড়ি, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ কার্যালয়ে আগুন ও ভাঙচুর করা হয়। শহরের কালিন্দীপুর এলাকায় এক পাহাড়ি শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় নিহত হন চার পাহাড়ি। সহিংসতার ঘটনার তদন্তের মধ্যেই ১ অক্টোবর খাগড়াছড়ি সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের এক বাঙালি শিক্ষককে পাহাড়ি শিক্ষার্থীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। 

জানতে চাইলে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ সদস্য কে এস মং বলেন, সাম্প্রতিক সহিংসতার ঘটনার দুই মাসের বেশি সময় কেটে গেল। তদন্ত কমিটি হলো, তদন্ত কমিটি সরেজমিন পরিদর্শন করল। কিন্তু এই ঘটনার আইনগত কোনো অগ্রগতির খবর আমরা পাইনি।

জনসংহতি সমিতির মূল্যায়ন

পিসিজেএসএসের পক্ষ থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ২৭ বছর পূর্তির ক্রোড়পত্রে বলা হয়েছে, পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা একটি রাজনৈতিক ও জাতীয় সমস্যা। এই সমস্যাকে রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের লক্ষ্যে এরশাদ সরকারের সঙ্গে ৬ বার, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের সঙ্গে ১৩ বার এবং শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে ৭ বার অর্থাৎ পরপর তিনটি সরকারের সঙ্গে মোট ২৬ বার আনুষ্ঠানিক বৈঠকের ধারাবাহিকতায় ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। 

এতে আরও বলা হয়, ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের পর পাঁচটি রাজনৈতিক সরকার এবং দুটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকলেও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে কোনো সরকারই রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিয়ে এগিয়ে আসেনি। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর প্রায় চার মাস অতিক্রান্ত হলেও চুক্তি বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগ এখনও গ্রহণ করেনি। ফলে চুক্তি স্বাক্ষরের পর ২৭ বছর অতিক্রান্ত হলেও চুক্তির মৌলিক বিষয়সহ দুই-তৃতীয়াংশ ধারা অবাস্তবায়িত অবস্থায় রয়েছে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা