সুফল চাকমা, বান্দরবান
প্রকাশ : ০১ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৯:০৮ পিএম
শিক্ষার্থী শৈ ম্রা খেয়াং।
‘মেয়েকে এত লেখাপড়া করিয়ে কী লাভ বলো? বিয়ে দিলেই তো শ্বশুরবাড়ি চলে যাবে। ওর কাছ থেকে বেশি কিছু আশা করো না। তার চেয়ে ছেলে দুইটাকে লেখাপড়া করাও। ভবিষ্যতে কাজে লাগবে।’ ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েটিকেও নিয়মিত স্কুলে পাঠাতে দেখে প্রতিবেশীরা এ রকম পরামর্শই দিতেন ক্য থুই অং খেয়াংকে। কিন্তু গুংগুরু পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দপ্তরি কাম নাইট গার্ড ক্য থুই অং খেয়াং ছিলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞÑ দুই ছেলে আর এক মেয়ের সবাইকেই উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করবেন। যে মেয়েটিকে বিদ্যালয়ে পাঠানোর কারণে তাকে এত কথাবার্তা শুনতে হতো, পাহাড়ের খেয়াং ক্ষুদ্র জাতিসত্তার নারী শিক্ষার্থী শৈ ম্রা খেয়াং চলতি বছর চট্টগ্রামের এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে ৭৫ হাজার ডলারের সমপরিমাণ উচ্চ শিক্ষা বৃত্তি পেয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন।
অন্তত ১১টি ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষের বাস বান্দরবান জেলাতে। যেমন তাদের জীবনধারা, তেমনি সংস্কৃতিও বৈচিত্র্যময় এবং সমৃদ্ধ করে তুলেছে এ দেশটিকে। তবে এসব জাতিসত্তার জন্য এখনও রাষ্ট্রীয়ভাবে ভাষাভিত্তিক ন্যূনতম প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি। এ কারণে এসব জাতিসত্তার মানুষ, বিশেষত নারীরা শিক্ষাদীক্ষায় এখনও অনেক পিছিয়ে আছে। কোনো কোনো ক্ষুদ্র জাতিসত্তার জনসংখ্যাও একেবারে তলানিতে। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, বান্দরবান ও রাঙামাটি দুই জেলা মিলিয়ে খেয়াং ক্ষুদ্র জাতিসত্তার জনসংখ্যা মাত্র পাঁচ হাজার। যার মধ্যে বান্দরবানেই রয়েছে সাড়ে তিন হাজার। এমন একটি বড় বৃত্তি পেয়ে পাঁচ হাজার জনঅধ্যুষিত খেয়াং জনগোষ্ঠীকে অনন্য এক উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছেন শৈ ম্রা খেয়াং।
বান্দরবান জেলা শহর থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে সদর উপজেলার কুহালং ইউনিয়নের গুংগুরু পাড়ায় শৈ ম্রা খেয়াংয়ের বাড়ি। ওই গ্রামেরই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে খুবই অল্প বেতনে দপ্তরি কাম নাইট গার্ড পদে কাজ করেন তার বাবা।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে গুংগুরু পাড়া ও শৈ ম্রা খেয়াংয়ের সেখানকার বাড়ি ঘুরে দেখে প্রতিদিনের বাংলাদেশ। শৈ ম্রা খেয়াং তখন জানান, গুংগুরু পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাট চুকিয়ে বান্দরবান সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি ও ঢাকা হলিক্রস কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক অতিক্রমের পর এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে আবেদন করেছিলেন শৈ ম্রা। এ ব্যাপারে তাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন জনি খেয়াং। গত বুধবার বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ তাকে চিঠি দিয়ে আগামী পাঁচ বছরের জন্য পঁচাত্তর হাজার ডলার শিক্ষাবৃত্তি প্রদানের পাশাপাশি আবাসিক শিক্ষার্থী হিসেবে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে ভর্তি হওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছে।
শৈ ম্রা খেয়াংয়ের ইচ্ছা সেখান থেকে স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করে বিদেশে গিয়ে উচ্চতর শিক্ষা নিয়ে দেশে ফিরে নিজের জাতিসত্তা খেয়াংসহ বিভিন্ন সংখ্যালঘু ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর নারীদের জন্য কাজ করবেন তিনি। উচ্চ শিক্ষায় বৃত্তিসহ ভর্তির জন্য আমন্ত্রণ জানানোয় এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের কর্তৃপক্ষ এবং সার্বিক সহযোগিতার জন্য মং সার্কেলের রাজা-রানী ও সার্কেল চিফের প্রতি তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বাড়ি থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরের শহরে এসে বান্দরবান সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তার দাদি গত পাঁচ বছর ধরে তার দেখভাল করেছেন, তাকে রান্না করে খাইয়েছেন। তাই মা-বাবার পাশাপাশি তার কাছেও ঋণী তিনি।
শৈ ম্রা খেয়াংয়ের মা কোমা খেয়াং বলেন, ‘আমরা তো বেশি লেখাপড়া করতে পারিনি। মেয়ে যেন মানুষের মতো মানুষ হয়, যে যেন জীবনে বাবা-মায়ের মতো কষ্ট না পায়, সেজন্যই তাকে লেখাপড়া করাচ্ছি। রাজা-রানী ও সার্কেল চিফ থেকে শুরু করে অনেকেই আমাদের সহযোগিতা করেছেন। আমাদের একটি মহিলা সমিতি আছে। মেয়ের লেখাপড়া চালিয়ে নিতে সেখান থেকেও সহযোগিতা পেয়েছি।
গুংগুরু পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক চিং সাউ খেয়াং তার প্রাক্তন শিক্ষার্থী শৈ ম্রা খেয়াং সম্পর্কে জানান, ছোটবেলা থেকেই শৈ ম্রা মেধাবী। পূর্ণ বৃত্তিসহ সে উচ্চ শিক্ষার সুযোগ পেয়েছে জেনে তিনি খুবই আনন্দিত। তার উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করেন তিনি।
শৈ ম্রা খেয়াংয়ের বাবা ক্য থুই অং খেয়াং বলেন, ‘২০১৩ সাল থেকে স্কুলে দপ্তরি কাম নাইট গার্ডের কাজ করি। প্রতিবেশীরা বলত, মেয়েকে উচ্চ শিক্ষিত করে কী লাভ? তারা যে ব্যাপারটা পছন্দ না করার কারণে বলত, তা কিন্তু না। আমার পরিবারের আর্থিক দুরবস্থার হাল দেখেই তারা ওটা বলত। কিন্তু মেয়ে পূর্ণ বৃত্তি পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করার সুযোগ পেয়েছে জেনে তারাও এখন উল্লসিত।’
খেয়াং সম্প্রদায়ে নারী জাগরণের অগ্রদূত, গুংগুরু পাড়া উপজাতীয় মহিলা উন্নয়ন সমিতির উপদেষ্টা, শিক্ষিকা হ্লা ক্রয় প্রু খেয়াং বলেন, ‘খেয়াং জনগোষ্ঠী সব দিক দিয়েই পিছিয়ে আছে। নারীদের উচ্চ শিক্ষার হার সেখানে ভয়ানক কম। সেখানে শৈ ম্রা খেয়াংয়ের এই সাফল্য আমাদের জন্য যেমন আনন্দের, তেমনি অনুপ্রেরণার। মেয়েকে লেখাপড়া করানোর জন্য ওর বাবা-মা অনেক কষ্ট করেছেন। খেয়াং উপজাতি মহিলা সমিতি থেকেও ওর স্কুল-কলেজে ভর্তি, বই কেনা আর ফরম ফিলাপের সময় বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করা হয়েছে। শৈ ম্রা খেয়াং উচ্চ শিক্ষার সুযোগ পাওয়ায় খেয়াং জনগোষ্ঠীর অন্য মেয়েরা লেখাপড়ার অনুপ্রেরণা পাবে।’
চলতি বছর এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে পূর্ণ বৃত্তি নিয়ে বান্দরবান শৈ ম্রা খেয়াং ছাড়াও জেলার বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মোট ছয় ছাত্রী পড়াশুনার সুযোগ পেয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেÑনাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার দুর্গম এলাকা ক্রোক্ষ্যং চাকপাড়ার ম্যাচাইনু চাক; রোয়াংছড়ি উপজেলার জেনিফার বম, জিনিয়া তঞ্চঙ্গ্যা এবং রেনি খুমি; আলিকদম উপজেলার কারসিং ম্রো; লামা উপজেলার সরই ইউনিয়নের তাই পাও ম্রো।