চৌগাছা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
মহসিন আলী, বেনাপোল (যশোর)
প্রকাশ : ২৫ নভেম্বর ২০২৪ ১২:৫১ পিএম
চিকিৎসাসেবায় ১৬ বার দেশসেরা পুরস্কার পেয়েছে যশোরের চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। তবে বর্তমানে অর্ধেকেরও কম জনবল দিয়ে চলছে ৫০ শয্যাবিশিষ্ট এ মডেল হাসপাতালের কার্যক্রম। এতে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে রোগীরা।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মোট চিকিৎসকের পদ রয়েছে ৩২টি। খাতাকলমে কর্মরত দেখানো হচ্ছে ১৬ জন চিকিৎসককে। কিন্তু এর মধ্যেও তিনজন দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত। সংযুক্তিতে রয়েছেন আরও ছয়জন চিকিৎসক। বাকি সাতজনের দুজন প্রশাসনিক পদে কর্মরত। বর্তমানে মাত্র পাঁচজন চিকিৎসক দিয়ে চলছে দেশসেরা এই মডেল হাসপাতালের চিকিৎসা কার্যক্রম।
সূত্র জানায়, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা লুৎফুন নাহার লাকি গত ৩০ অক্টোবর বদলি হয়ে গেছেন গোপালগঞ্জের কাশিয়ানিতে। ওই পদে গত ২৯ অক্টোবর যোগ দেন ডা. আহাসানুল মিজান রুমি। আর চিকিৎসা কর্মকর্তা মৃদুল কান্তি ২০১৪ সাল থেকে কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন। এ ছাড়া ২০২২ সাল থেকে আরেক চিকিৎসা কর্মকর্তা সায়মা নাহিদ শান্তা ও হাসপাতালে অর্থোপেডিক বিভাগের চিকিৎসক গোলাম রসুল কর্মস্থলে অনুপস্থিত। যেসব চিকিৎসক অনুপস্থিত রয়েছেন তারা দেশের বাইরে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে। ফলে তারা আর দেশে ফিরবেন কি না, তারও নিশ্চয়তা নেই।
এদিকে, চিকিৎসা কর্মকর্তা (সার্জারি) মির্জা বনি আমিন গত ১৫ অক্টোবর প্রেষণে যোগ দেন যশোর জেনারেল হাসপাতালে। ২৫ অক্টোবর আরেক চিকিৎসা কর্মকর্তা সানজানা রহমান প্রেষণে যোগদান করেন ঢাকা মেডিকেল কলেজে। আর শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. আব্দুস সামাদ, রবিউল ইসলাম, তানভির হাসান, ইয়াছির আরাফাত আগে থেকেই যশোর জেনারেল হাসপাতালে প্রেষণে রয়েছেন। নতুন দুজন যোগদান করেই ক্ষমতাবলে তারা প্রেষণে অন্য হাসপাতালে চলে যাওয়ায় নতুন করে সংকট সৃষ্টি হয়।
পক্ষান্তরে হাসপাতালে খাতা-কলমে অত্যন্ত জরুরি অ্যানেসথেশিয়া শিশু বিশেষজ্ঞ থাকলেও বাস্তবে তারা নেই। এ ছাড়া গাইনিসহ ১৬ চিকিৎসা কর্মকর্তার পদ শূন্য রয়েছে। প্রধান সহকারী, ক্যাশিয়ার, অফিস সহকারী, এমএলএসএস, ওয়ার্ডবয় এবং আয়াসহ তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির পদগুলোর মধ্যে ৬৩টি রয়েছে শূন্য। এ কারণে বর্তমানে জোড়াতালি দিয়ে চলছে হাসপাতালের সেবা কার্যক্রম।
হাসপাতাল সূত্র আরও জানায়, বিগত দিনে চৌগাছা মডেল হাসপাতালের গাইনি বিভাগের সাবেক চিকিৎসক ইমদাদুল হকের চেষ্টায় অন্তঃসত্ত্বাদের উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করেন। মা ও প্রসূতি সেবায় অবদান রাখায় ২০০৪ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত এটি উপজেলা পর্যায়ে টানা দেশসেরা হাসপাতাল হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ২০১৮ সালেও হাসপাতালটি অর্জন করে জাতীয় পুরস্কার। বিশেষ স্বাস্থ্যসেবায় সারা দেশে প্রথম স্থান অর্জন করে পেয়েছে ‘হেলথ মিনিস্টার ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড ২০২০’। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পুরস্কার নেন সদ্যবিদায়ি প্রতিষ্ঠান প্রধান লুৎফুন নাহার লাকী। বর্তমানে হাসপাতালে অ্যানেসথেশিয়া ও গাইনি বিশেষজ্ঞ না থাকায় দেশসেরা এই মডেল হাসপাতালে বন্ধ রয়েছে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার।
চৌগাছা উপজেলার কয়ারপাড়ার আবু কালাম, বুড়িন্দিয়া এলাকার সখি খাতুনসহ অনেকের অভিযোগ, হাসপাতালটিতে জরুরি মুহূর্তে সেবা পাওয়া কষ্টের ব্যাপার। দুপুর আড়াইটার পর অনেককেই খুঁজে পাওয়া যায় না হাসপাতালে। ফলে সামান্য সমস্যায় রোগীদের ছুটতে হচ্ছে যশোর জেনারেল হাসপাতালসহ বেসরকারি বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। দেশসেরা হাসপাতালে আগের মতো চিকিৎসাসেবা নেই বলে মন্তব্য করেন তারা।
হাসপাতালের সাবেক স্বাস্থ্য পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা লুৎফুন নাহার লাকি বলেন, ‘লোকবলের শূন্যতা পূরণের জন্য অনলাইনে সফট কপি ও হার্ডকপি উভয় প্রক্রিয়ায় আবেদন করা হয়েছে।’
হাসপাতালে যোগদানকারী স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আহসানুল মিজান রুমি বলেন, ‘মাত্র দুই দিন হয়েছে এই হাসপাতালে যোগ দিয়েছি। অর্ধেক ফিজিশিয়ান নিয়েই আমাদের কাজ করতে হবে। মোট লোকবল ২১০ জন। এর মধ্যে কর্মরত রয়েছেন ১২০ জন। বাকি ৯০ পদই ফাঁকা।’
এ ব্যাপারে যশোরের সিভিল সার্জন ডা. মাহমুদুল হাসান বলেন, চৌগাছা হাসপাতালের বিষয়টি আমার নজরে আছে। চেষ্টা চলছে লোকবল বাড়ানোর। তারপরও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শতভাগ পদ পূরণ করা সম্ভব হবে না।